পটুয়াখালীর দশমিনার বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব বয়সী বশির আহমেদ ঈদের পর দিন বাড়ি যাচ্ছেন। ঈদের দিন দুটি গরু কোরবানির পর কাটাকুটি করে যে মাংস পেয়েছিলেন তার বস্তা মাথায় নিয়ে তিনি বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। বেসরকারি কোম্পানিতে চাকরি করা জাকির হোসেন ঢাকায় পশু কোরবানি করে আজ মাংস নিয়ে যাচ্ছেন গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরে।
ঈদের দ্বিতীয় দিন শুক্রবার সকালে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী বাসস্ট্যান্ড ও আশপাশের এলাকা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।
মানিকনগর থেকে যাত্রাবাড়ী বাসস্ট্যান্ডে পরিবার নিয়ে এসেছেন আসিয়া বেগম (৪৫)। তিনি জানান, তার নিজের বাপের বাড়ি ও শ্বশুরবাড়ি দুটোই খুলনায়। ঢাকায় ঈদ করে আজ শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছেন। ‘প্রতিবছর ঈদের দিনটা ঢাকায় থাকি। পরে স্বামী-সন্তানসহ শ্বশুরবাড়িতে যাই। বাড়তি মজা হয়’, বলেন তিনি।
ঢাকায় চাকরি করা বরিশালের রিতা বলেন, ঈদের আগে ভিড় ছিল বেশি। তাই একটি রিল্যাক্সে ভ্রমণ করার জন্য ঈদের পরদিন বাড়ি যাচ্ছি। তিনি বাসস্ট্যান্ডে এনা পরিবহনের বাসের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
ঢাকার ভেতরে যানবাহনের চাপ কম থাকলেও ঢাকার বাইরে আজ দূরপাল্লার যানবাহনের চাপ তুলনামূলক অনেক বেশি।
সরেজমিনে দেখা যায়, সকালে যাত্রাবাড়ী মোড় থেকে ধোলাইপাড় পর্যন্ত ছিল যানবাহনের দীর্ঘ সারি। গাড়ির হর্ন, টুংটাং শব্দের সঙ্গে ছিল মানুষের হুড়োহুড়ি। কারও হাতে বা মাথায় ব্যাগ, কারও কাঁধে বস্তা-বালতি, কেউ আবার ছোট শিশু কোলে দাঁড়িয়ে আছেন গাড়ির অপেক্ষায়। তারা সবাই ঈদের পর দিন গ্রামে যাচ্ছেন।
এদিকে, ঈদের পর দিন গ্রামে ফেরার বিভিন্ন পরিবহনের বাসের সেবা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে অনেককে। তাদের অভিযোগ, গত কয়েকদিনের মতো আজও যাত্রীদের কাছ থেকে হাঁকানো হচ্ছে বাড়তি ভাড়া।
সকালে সায়েদাবাদ-যাত্রাবাড়ী, জনপথ মোড়, ধোলাইপাড় ও আশপাশের এলাকায় যাত্রী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঈদের আগের তিন দিনের তুলনায় আজকেও মোটামুটি যাত্রীর চাপ রয়েছে। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করার জন্য ঈদের পর দিন ভোর থেকেই ঢাকা ছাড়ছেন অনেকে।
বিভিন্ন পরিবহনের কাউন্টার থেকে জানানো হয়েছে, আজ ভোর থেকে যাত্রীরা নোয়াখালী, কুমিল্লা, খুলনা, বাগেরহাট, যশোর, সাতক্ষীরা, পটুয়াখালী, বরিশাল, নড়াইল, ঝিনাইদহ, ফরিদপুর, মাদারীপুর ও শরীয়তপুরসহ বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ঢাকা ছাড়ছেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীর চাপও বাড়ছে। ঈদের দিন তেমন যাত্রী ছিল না, সে তুলনায় আজ অনেকে গ্রামে ফিরছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, নির্ধারিত কাউন্টারের পাশাপাশি সড়কের ওপর থেকেও যাত্রী তুলছে অনেক পরিবহন। অগ্রিম টিকিট না পাওয়া যাত্রীরা বাধ্য হয়ে লোকাল বাস কিংবা দাঁড়িয়ে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়েই রওনা হচ্ছেন।
জানতে চাইলে নড়াইল এক্সপ্রেস পরিবহনের সুপারভাইজার জাকির হোসেন বলেন, ঈদের দিন যাত্রী ছিল সবচেয়ে কম। তার আগের দিন প্রচণ্ড চাপ ছিল। ঈদের দিন ১২-১৩টি বাস ছেড়ে গেছে। যেখানে আগের তিন দিন ঢাকা থেকে বিভিন্ন স্থানে গড়ে ৮০-৯০টি করে বাস ছেড়ে গেছে। আজ ভোর থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত ১২-১৩টি বাস ছেড়ে গেছে।
বাড়তি ভাড়ার অভিযোগ বিষয়ে তিনি বলেন, আমরা সরকার নির্ধারিত ভাড়ায় যাত্রী পরিবহন করছি। তখন পাশেই থাকা যাত্রীরা ভাড়া বেশি নেওয়ার অভিযোগ করেন। যাত্রীদের কেউ কেউ বলছেন, নড়াইল এক্সপ্রেস বাসের নিয়মিত ভাড়া ৬০০ টাকা হলেও আজ ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা নিচ্ছে।
সুপার শরীয়তপুর পরিবহনের সুপারভাইজার সুমন মিয়া বলেন, ঈদের আগের ৩-৪ দিন অনেক যাত্রী ছিল। তবে, ঈদের দিন কোরবানির মাংস কাটাকুটি ও গোছগাছ করতেই অনেকের দিন চলে গেছে। তারা আজ গ্রামে যাচ্ছেন। আজ সকাল থেকে ১৪-১৫টি বাস ছেছে গেছে।
বরিশালগামী যাত্রী শফিকুল ইসলাম বলেন, সাধারণ সময়ে সাড়ে চারশো থেকে পাঁচশো টাকা ভাড়া নিলেও আজ সিট ছাড়াই নিচ্ছে ৮০০ টাকা। প্রতিবার ঈদ এলে বাস মালিকরা সুযোগ নেয়।
একই অভিযোগ করেন খুলনা, বরগুনা, বাগেরহাট, পিরোজপুর, ঝালকাঠি ও পটুয়াখালীগামী যাত্রীরাও।