প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে খুলনায় ১২ মাসই কৃষিতে ব্যাপক ক্ষতি হয়। গতবারের দাবদাহ ও শৈত্যপ্রবাহে বোরোর বীজতলা ও শাক-সবজির ক্ষেতে সেচ সংকট দেখা দেয়। জেলার ৮ উপজেলায় ফসল, শাক-সবজির ক্ষতি ও জনদুর্ভোগের পেছনে সৃষ্ট জলাবদ্ধতার ১৫টি কারণ পেয়েছে কৃষি দপ্তর। জেলায় ১০ হাজার হেক্টর জমি জলাবদ্ধতায় ১০০ কোটি টাকার ফসলহানি হচ্ছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এবারের বোরো মৌসুমের শুরুতেই শৈত্যপ্রবাহের কারণে ডুমুরিয়া, ফুলতলা ও তেরখাদার বীজতলা শুকিয়ে যায়। এপ্রিলের শেষ এবং মে এর প্রথম দিকে হঠাৎ বৃষ্টিতে বোরো এবং দাকোপের তরমুজ ক্ষেতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়। মাঝারী বৃষ্টিতে অনেক স্থানে বোরো ফসল ক্ষতিগ্রস্থ হয়।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর নগরীর লবনচরাসহ ৮ উপজেলায় গত ফেব্রুয়ারিতে এক জরিপে ১ হাজার ১৭৮ স্থায়ী ও অতিবৃষ্টিতে ৮ হাজার ৫৮৬ হেক্টর জমিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় বলে তথ্য পায়। উপজেলাগুলো হলো- রূপসা, বটিয়াঘাটা, দিঘলিয়া, ফুলতলা, ডুমুরিয়া, তেরখাদা, পাইকগাছা ও কয়রা।
এ দপ্তরের জরিপে জলাবদ্ধতার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, লবনচরার দীঘির পাড় থেকে গল্লামারী ব্লক পর্যন্ত বিশ্বরোডে পানি নিষ্কাশনে বাঁধা, রূপসা উপজেলায় আঠারোবাকী নদীর পানির প্রবাহ কম, নরনিয়া বিলের গভীরতা, অপরিকল্পিত চিংড়ির ঘের, খালে পানির প্রবাহ কম।
এছাড়া, দিঘলিয়া উপজেলায় অতিবৃষ্টি ও জোয়ারের পানি, বটিয়াঘাটা উপজেলায় অতিবৃষ্টির কারণে স্লুইচ গেট দিয়ে দ্রুত পানি নিষ্কাশন না হওয়া, ফুলতলার দক্ষিণ এলাকায় আগাম বৃষ্টিতে পানি নিষ্কাশন সুবিধা না থাকা, ডুমুরিয়া উপজেলায় অতিবৃষ্টি, নিচু জমির পানি দ্রুত নিষ্কাশন না হওয়া, তেরখাদা উপজেলার ভুতিয়ার বিলে দীর্ঘদিন খাল খনন না হওয়া, পাইকগাছা উপজেলায় খাল ভরাট, স্লুইচ গেট অব্যবস্থাপনা, সরকারি খাস খালগুলো উন্মুক্ত না হওয়া, অন্যান্য বছরের তুলনায় বৃষ্টির পরিমাণ বৃদ্ধি এবং কয়রা উপজেলায় ছোট চাঁদখালী খাল ভরাট ও অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন না হওয়া।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের সূত্র মতে, অস্তিত্ব সংকটে জেলায় পড়া ১২ নদীর দৈর্ঘ্য ৩৬৯ কিলোমিটার। নদীগুলো হচ্ছে- শোলমারী, ডুমুরিয়ার হামকুড়া, হরি নদী, ভদ্রা, আপার সালতা, তেরখাদার চিত্রা, পাইকগাছার শিবসা নদীর একাংশ, রূপসার আঠারোবাকী, কয়রার কপোতাক্ষ, শাকবাড়িয়া, কয়রা ও নগরীর ময়ূর। বর্ষায় এসব নদী দিয়ে ঠিকমতো নিষ্কাশিত হতে পারে না আশপাশের এলাকার পানি।
অপর একটি সূত্র জানায়, বটিয়াঘাটা ব্রিজ নির্মাণের ফলে কাজিবাছা নদীর প্রবাহ কমে পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোতে বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়।
জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনার অতিরিক্ত উপ-পরিচালক সুবীর কুমার বিশ্বাস বলেন, 'জলাবদ্ধতার জন্য অপরিকল্পিত ঘর-বাড়ি, চিংড়ির ঘের, নিচু জমি, খাল ভরাটসহ উল্লিখিত কারণ রয়েছে।'
তিনি বলেন, 'ডুমুরিয়া-ফুলতলার অভিশাপ বলে খ্যাত বিল ডাকাতিয়ায় খাল খনন শুরু হয়েছে। জলাবদ্ধতার কারণে ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলায় নিচু জমিতে শাক-সবজির আবাদ হয় না। আগাম বৃষ্টির কারণে দক্ষিণ ডুমুরিয়ায় শাক-সবজি নষ্ট হয়ে যায়।'
সুবীর কুমার বিশ্বাস বলেন, 'প্রাকৃতিক দুর্যোগ, কৃষি উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি ও যথারীতি দাম না পাওয়ায় দাকোপের কৃষক তরমুজ আবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। ২০২৩ সালে শিলাবৃষ্টিতে বানিশান্তার তরমুজ আবাদের ব্যপক ক্ষতি হয়।'
তেরখাদা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শিউলী মজুমদার বলেন, 'সাচিয়াদাহ, ছাগলাদাহ ও তেরখাদা ইউনিয়নের নিচু জমিতে পানি দ্রুত নিষ্কাশন হয় না। ভুতিয়ার বিলের ১০০ হেক্টর জমি স্থায়ী জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে, এলাকাটি প্রাকৃতিক ভাবে নিচু।'
তিনি বলেন, 'খাল পুনঃখনন এবং স্লুইচ গেট দিয়ে স্বাভাবিক পানি নিষ্কাশন হলে স্থায়ী জলাবদ্ধতার অবসান হবে। একইসঙ্গে বাড়বে চাষযোগ্য আবাদী জমির পরিমাণ।'
এসএম/এমএ