বাংলাদেশে বসবাসরত প্রায় তিন লাখ উর্দুভাষী জনগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানে ১১৬টি ক্যাম্পে মানবেতর জীবনযাপন করছে বলে অভিযোগ করেছে কাউন্সিল অব মাইনোরিটিজ।
রাজধানীর দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে আয়োজিত এক অবহিতকরণ সভায় সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়, দেশভাগের পর অধিগৃহীত প্রায় ৩৪ হাজার একর জমি এবং ২০১৩ সালের নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ায় এই জনগোষ্ঠীর দুর্দশার অবসান হয়নি।
অনুষ্ঠানে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করেন আহমেদ ইব্রাহিম। কাউন্সিল অব মাইনোরিটিজের নির্বাহী পরিচালক খালিদ হোসেনের সঞ্চালনায় সভায় আরও বক্তব্য দেন সাদাকাত খান ফাকুকু, শাহেদ আলী বাবলু, ওসামা রহমান ইয়াসহাব, মাজহারুল ইসলামসহ মোহাম্মদপুর ও মিরপুর থেকে আগত ক্যাম্প প্রতিনিধিরা।
আহমেদ ইব্রাহিম বলেন, গত ৫৪ বছর ধরে ক্যাম্পবাসী উর্দুভাষীরা নানা বঞ্চনার শিকার। ঢাকাসহ দেশের ৯টি জেলায় অবস্থিত ১১৬টি ক্যাম্পে তারা মৌলিক মানবিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত অবস্থায় বসবাস করছে। স্বাধীনতার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও পুনর্বাসন না হওয়ায় তাদের জীবনমানের উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।
তিনি আরও বলেন, ক্যাম্পের আয়তন না বাড়লেও জনসংখ্যা কয়েকগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ছোট কক্ষে একাধিক প্রজন্মকে বসবাস করতে হচ্ছে, যা জীবনমান উন্নয়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাদাকাত খান ফাকুকু বলেন, পুনর্বাসন ছাড়া কোনোভাবেই ক্যাম্প উচ্ছেদ করা উচিত নয়। অন্যদিকে খালিদ হোসেন উর্দুভাষীদের স্থায়ী উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বিশেষ কমিশন গঠন এবং জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ রাখার দাবি জানান। পাশাপাশি মোহাজিরদের জন্য নির্ধারিত প্রায় ৩৪ হাজার একর জমি শনাক্ত, পুনরুদ্ধার ও বিতরণের আহ্বান জানান তিনি।
সভায় জানানো হয়, দেশভাগের পর শরণার্থীদের পুনর্বাসনের জন্য অধিগৃহীত জমির একটি বড় অংশ এখনো অব্যবহৃত রয়েছে। ২০১৩ সালে জমি উদ্ধার ও ব্যবস্থাপনার জন্য নীতিমালা প্রণয়ন করা হলেও তা বাস্তবায়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
কাউন্সিল অব মাইনোরিটিজ জানায়, ‘বিহারী’ নামে পরিচিত এই উর্দুভাষী জনগোষ্ঠী স্বাধীনতার পর নানা ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ক্যাম্পভিত্তিক জীবনে বসবাসে বাধ্য হয় এবং দীর্ঘদিন রাষ্ট্রহীন অবস্থায় ছিল। পরে ২০০৩ ও ২০০৮ সালের হাইকোর্টের রায়ের মাধ্যমে তাদের নাগরিকত্ব ও ভোটাধিকারসহ সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়।
বর্তমানে অধিকাংশ ক্যাম্পে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, বিশুদ্ধ পানির সংকট, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন ও শিক্ষার সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান। অনেক পরিবার ৮ থেকে ১০ ফুটের ছোট কক্ষে একাধিক সদস্য নিয়ে বসবাস করছে, যা শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
সংগঠনটির মতে, সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সমন্বিত পুনর্বাসন পরিকল্পনা জরুরি। তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী, ৬০ শতাংশ উর্দুভাষী এবং ৪০ শতাংশ বাঙালি জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে পুনর্বাসন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হলে সামাজিক সম্প্রীতি বৃদ্ধি পাবে।
এছাড়া ঢাকার আশপাশের সরকারি খাস জমি অথবা কেরানীগঞ্জের আহাদীপুর মৌজায় জমি বরাদ্দের মাধ্যমে মোহাম্মদপুর ও মিরপুর ক্যাম্পের বাসিন্দাদের পুনর্বাসনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি পরিবারকে ৫ শতক করে জমি প্লট আকারে বরাদ্দ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, উর্দুভাষী জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন শুধু মানবিক দায়বদ্ধতার বিষয় নয়, বরং দেশের সামগ্রিক সামাজিক উন্নয়নের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। যথাযথ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে একটি বৈষম্যহীন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।