বাগেরহাট-১ সংসদীয় আসনে (ফকিরহাট-মোল্লাহাট-চিতলমারী) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। আওয়ামী লীগ প্রার্থী না থাকায় দীর্ঘদিনের একচ্ছত্র রাজনৈতিক প্রভাব ভেঙে এবার নতুন সমীকরণে দাঁড়িয়েছে আসনটি। মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি ও ভোটারদের মতামতে স্পষ্ট হচ্ছে ধানের শীষ, দাঁড়িপাল্লা ও ঘোড়া প্রতীকের মধ্যে ত্রিমুখী লড়াইয়ের দিকেই এগোচ্ছে নির্বাচন। পিছিয়ে নেই ফুটবলও।
এই আসনে মোট আট জন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে মূল আলোচনায় রয়েছেন চার জন।
বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মতুয়া মহাসংঘের নেতা কপিল কৃষ্ণ মন্ডল। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এই আসনে তাকে ঘিরে বিএনপির কৌশলগত হিসাব স্পষ্ট। দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি তিনি হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছেন বলে স্থানীয় পর্যায়ের আলোচনা রয়েছে। তিনি একাধারে মতুয়া বহুজন সমাজ ঐক্যজোটের সাধারণ সম্পাদক, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি) বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের মহাসচিব এবং বাংলাদেশ অশ্বিনী সেবা আশ্রমের সভাপতি।
অন্যদিকে, ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে মাঠে রয়েছেন অধ্যক্ষ মাওলানা মশিউর রহমান খান। ইসলামী মূল্যবোধ, দুর্নীতিমুক্ত এলাকার প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি নিয়মিত গণসংযোগ চালাচ্ছেন। নারী ভোটারদের মধ্যে তার সমর্থন তুলনামূলক বেশি, এমন ধারণাও রয়েছে ভোট বিশ্লেষকদের। অধ্যক্ষ মাওলানা মশিউর রহমান খান বাগেরহাট জেলা জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর ও কেন্দ্রীয় শূরা সদস্য।
স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছেন সাবেক বাগেরহাট জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য এম এ এইচ সেলিম। তিনি সিলভার গ্রুপের চেয়ারম্যান ও একজন শিল্পপতি। ঘোড়া প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে নেমে তিনি উন্নয়ন ও অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরছেন। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে এই হেভিওয়েট নেতাকে বিএনপি থেকে মনোনয়ন না দেয়ায় তিনি বাগেরহাটের তিনটি আসনে স্বতন্ত্রপ্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
পাশাপাশি বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী প্রকৌশলী শেখ মাছুদ রানা ফুটবল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তিনি এর আগে বিএনপির মনোনীতি প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। তাকে বিএনপি থেকে ইতোমধ্যে বহিস্কার করা হয়েছে। বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলন মাছুদ রানাকে নির্বাচনে সমর্থন দিয়েছেন।
এ ছাড়া জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকে স. ম. গোলাম সরোয়ার, বাংলাদেশ মুসলিম লীগের পাঞ্জা প্রতীকে আ. সবুর শেখ, মুসলিম লীগের হারিকেন প্রতীকে এমডি শামসুল হক ও আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) ঈগল প্রতীকে মো. আমিনুল ইসলাম প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
এবি পার্টির প্রার্থী মো. আমিনুল ইসলাম পেশায় চার্টার্ড একাউন্ট্যান্ট। তিনি দলটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। জোটের বাইরে গিয়ে এবি পার্টির প্রার্থী নির্বাচনে থাকায় জামায়াতের ভোটেও কিছুটা বিভাজনের আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকেরা।
ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার ভোটের পরিবেশ ভিন্ন রকম। অনেক ভোটার এটিকে পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, সংখ্যালঘু ভোটারদের বড় অংশ ধানের শীষের দিকে ঝুঁকতে পারে বলে ধারণা করা হলেও নারী ভোটারদের একটি অংশ দাঁড়িপাল্লার প্রতি আগ্রহ দেখাচ্ছেন। তরুণ ভোটাররাও একটা বড় ফ্যাক্টর হতে পারে। অতীতের নির্বাচনে ভোট দিতে না পারার ক্ষোভ থাকলেও এবার শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু ভোট হলে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়ার আগ্রহ রয়েছে বলে জানান তারা। অনেকেই মনে করছেন, এবারের নির্বাচন হবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ।
পরিস্থিতি বিবেচনায় বাগেরহাট-১ আসনে মোট ১৪৭ টি ভোট কেন্দ্রের মধ্যে ৯৬টি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে অতি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র রয়েছে ৪০টি। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের হার শতকরা ৬৫.৩০ ভাগ।
নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বাগেরহাট-১ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৭৫ হাজার ৫৬০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১৯০৮৩৮ জন, নারী ভোটার ১৮৪৭২০ জন ও তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ২ জন। এছাড়া ১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সী তরুণ ভোটার রয়েছেন ১ লাখ ৩ হাজার ৮৮০ জন, যা মোট ভোটারের ২৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ। হিন্দু ভোটারের সংখ্যা প্রায় ৮৭ হাজার।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিতে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, আনসারসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মাঠে সক্রিয় রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে বাড়তি নজরদারী থাকবে। এছাড়া সব কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে।
সব মিলিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী, ভোট বিভাজন এবং আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে বাগেরহাট-১ আসন। শেষ পর্যন্ত কার গলায় উঠবে বিজয়ের মালা সে অপেক্ষায় ভোটাররা।
এএটি/ এসআর