ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩ তথ্য অধিদফতর নিবন্ধন নম্বর ০৬
শিরোনাম
Advertisement
ধানের শীষের প্রতিপক্ষ বিদ্রোহীর ঘোড়া, নির্ভার দাঁড়িপাল্লা
✎ অবজারভার সংবাদদাতা
⏲ প্রকাশিত: সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ২:১৭ পিএম
X
Advertisement

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি  চলনবিল বিধৌত কৃষি, মৎস্য ভান্ডারখ্যাত এবং দুধ, ডিম, ঘি প্রসিদ্ধ পাবনা-৩ (চাটমোহর-ভাঙ্গুড়া-ফরিদপুর) আসনেও শুরু হয়েছে নির্বাচনী আমেজ। প্রচার-প্রচারণায় শুরু হয়েছে উৎসব। 

চা স্টল থেকে শুরু করে কৃষকের মাঠ, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে অফিস পাড়া পর্যন্ত চলছে নানা বিশ্লেষণ। সরগরম খানকা ঘর থেকে হাট-বাজার। কে জিতবে আর কে হারবে সেই সমিকরণ। 

স্থানীয় বিএনপিতে অভ্যন্তরীণ সংকট রয়েছে। তবে শেষ মুহুর্তে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে ধানের শীষের প্রার্থীকে জয়ী করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। নির্বাচনী প্রচারণায় এক পক্ষ আরেক পক্ষের বিরুদ্ধে বিষোধাগার করে ভোট টানার চেষ্টা করছেন। বিএনপির ধানের শীষের প্রতিপক্ষ হয়েছে বিএনপির বহিস্কৃত নেতার ঘোড়া। আর নির্ভার রয়েছে জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা। ফলে ‘কেহ কারে নাহি ছাড়ে সমানে সমান’ অবস্থা বিরাজ করছে এই সংসদীয় আসনে। 

এই মাঘের শীতে প্রার্থী আর তাদের কর্মী সমর্থকদের ঘাম ছুটছে ভোটের পাল্লা ভারি করতে। শেষ হাসি কে হাসবে তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছে লাখ লাখ মানুষ। তবে নির্বাচন ঘিরে পাবনা-৩ এলাকায় কোনো সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। মাঠ পর্যায়ের প্রশাসন রয়েছে কঠোর অবস্থানে। ইতিমধ্যে ভোট কেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তায় সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। বিরাজ করছে চির চেনা সেই ভোট উৎসবের আমেজ।

পাবনা-৩ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন কৃষক দলের কেন্দ্রীয় সভাপতি কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিন (ধানের শীষ)। তিনি দলীয় মনোনয়ন নিয়ে এলাকায় এলেই তৃণমূল পর্যায়ে নানা অসন্তোষ দেখা দেয়। বিএনপির একটি পক্ষ সাবেক এমপি কে এম আনোয়ারুল ইসলাম ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান হাসাদুল ইসলাম হীরা তুহিনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে বিরোধিতায় নামে। স্থানীয় প্রার্থীর দাবি তুলে শুরু হয় মশাল মিছিলসহ নানা আন্দোলন সংগ্রাম।

যখন তুহিনের দলীয় মনোনয়ন চূড়ান্ত হয়। তখন কেন্দ্রীয় বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য সাবেক এমপি আলহাজ্ব কে এম আনোয়ারুল ইসলাম বিদ্রোহী প্রার্থী হন (ঘোড়া)। তার সাথে নির্বাচনী প্রচারণায় যোগ দেন উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব মো. হাসাদুল ইসলাম হীরা, পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. তৌহিদুল ইসলাম তাইজুলসহ বিএনপির অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।

এদিকে, উপজেলা যুবদলের সদস্য সচিব ফারুক হোসেন, পৌর যুবদলের আহ্বায়ক তানভির লিখন জুয়েল, স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব আসাদুজ্জামান লেবু দলীয় প্রার্থী তুহিনের পক্ষে ধানের শীষের ভোট প্রার্থনা শুরু করলেও গত ০২ ফেব্রুয়ারি সংবাদ সম্মেলন করে স্থানীয় প্রার্থী কে এম আনোয়ারুল ইসলামের পক্ষে নির্বাচন করার ঘোষণা দেন এবং ওই সংবাদ সম্মেলন থেকে কেন্দ্রীয় বিএনপির নেতাদের দালাল বলে উল্লেখ করা হয়। পরবর্তীতে দল আনোয়ারুল, হীরা, তাইজুল, লিখন, ফারুক, লেবু,ছাত্রদল নেতা আরিফকে বহিস্কার করে।  

এদিকে, উপজেলা বিএনপি, পৌর বিএনপি ও এর সকল অঙ্গ সংগঠনের সিংহ ভাগ নেতাকর্মী দলীয় প্রার্থী হাসান জাফির তুহিনের পক্ষে নির্বাচনী মাঠে কাজ করছে।

ফরিদপুরের হাদল গ্রামের চা দোকানী আফজাল হোসেন বলেন, ‘চাটমোহর-ভাঙ্গুড়া উপজেলায় কি হবি জানি ন্যা, তয় আমাগারে এখানে মেল্যা ভোটে ধানের শীষ জিতপি।’

ভাঙ্গুড়ায় বিএলবাড়ী গ্রামের ছকির উদ্দিন বলেন, ‘ভাঙ্গুড়ায় দাঁড়িপাল্লার ভোট বেশী আছে। তবে ধানের শীষের সাথে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবি।’

চাটমোহর উপজেলার নবীন গ্রামের নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘চাটমোহরে পুরান মানুষ হিসেবে আনোয়ারের (ঘোড়া) সাথে ধানের শীষের (হাসান জাফির তুহিন) ফাইট (যুদ্ধ) হবি। চাটমোহরে ১০/১৫ হাজার ভোটের বেশী কেউ জিতপ্যার পারবি নানে।’

এদিকে, অনেকে ‘চাটমোহর ইজম’ কাজে লাগিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী কে এম আনোয়ারুল ইসলামের (ঘোড়া) ভোটের পাল্লা ভারি করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। কারণ তিন উপজেলার মধ্যে চাটমোহরেও ভোটার রয়েছে ২ লাখ ৬০ হাজার ১১৭ জন। সে লক্ষ্যে বিগত দিনের উন্নয়নের কথা বলে তার কর্মীরা দিন-রাত ভোট প্রার্থনা করে যাচ্ছেন। নির্বাচিত হলে পাবনা-৩ এলাকার উন্নয়নের ধারা বজায় রাখবেন বলেও তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আনোয়ারুল ইসলামের নিজস্ব কিছু ভোট ব্যাংক রয়েছে। যদিও সেই ব্যাংক থেকে অনেক ভোটার দলীয় প্রার্থীর বাইরে যাবেনা বলেও আভাস পাওয়া গেছে।

অপরদিকে, বিএনপি'র দলীয় প্রার্থী হাসান জাফির তুহিন (ধানের শীষ) চাটমোহর-ভাঙ্গুড়া-ফরিদপুরে দলের প্রার্থী হিসেবে বাড়তি সুযোগ কাজে লাগাতে পারছেন। দলীয় নারী-পুরুষ নেতাকর্মীরা কাক ডাকা ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিরতিহীন ভাবে চলনবিলের প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে নানা উন্নয়ন আর ওয়াদা দিয়ে দ্বারে দ্বারে ভোট প্রার্থনা করছেন। প্রচারণার প্রথম দিকে দলে বিভক্তি প্রকট থাকলেও শেষ মুহুর্তে বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মী সংগঠিত হয়েছেন। তারা তাদের দলের প্রার্থী তুহিনকে বিজয়ী করতে ঐক্যবদ্ধ ভাবে প্রচার-প্রচারণা অব্যাহত রেখেছেন। 

ভোটের দূর্গ খুঁজে খুঁজে দূর্গম এলাকায় সভা-সমাবেশ করে চলেছেন তারা। নির্বাচিত হলে চলনবিল নিয়ে মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবেন বলেও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। দীর্ঘ ১৭ বছর পরে এ অঞ্চলে নির্বাচন ঘিরে উৎসব আমেজ শুরু হয়েছে। ১৯৭১ সালের পর এই আসনে বিএনপির এবং আওয়ামী লীগের বাহিরে কোনো প্রার্থী এমপি হতে পারেননি। অনেক সচেতন ভোটার মনে করছেন সেই ধারাবাহিকতা এই নির্বাচনেও বজায় থাকবে।

এছাড়া, জামায়াতের প্রার্থী ভাঙ্গুড়া উপজেলার বাসিন্দা মাওলানা আলী আছগার তাদের দলে অভ্যন্তরীণ কোনো সংকট না থাকায় নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তার কর্মী বাহিনী, নারী সদস্যরা দিন-রাত ভোট প্রার্থনায় দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। নির্ভার রয়েছেন জামায়াতের প্রার্থী। বিগত নির্বাচনগুলোতে জামায়াতের ভোটের সংখ্যা কম থাকলেও এই নির্বাচনে জামায়াতের ভোট অনেক বেড়েছে বলে দাবি করেন জামায়াতের স্থানীয় একাধিক নেতা। সে ক্ষেত্রে পাবনা-৩ আসনে ভোটের লড়াই ত্রিমুখীও হতে পারে বলে ওয়াকিবহাল মহল মনে করছেন।

নির্বাচনে জয়ের ব্যাপারে পৃথক পৃথক ভাবে কৃষিবিদ হাসান জাফির তুহিন, কে এম আনোয়ারুল ইসলাম এবং মাওলানা আলী আছগার আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া এবং ফরিদপুর উপজেলায় মোট ৪ লাখ ৮২ হাজার ৮০২ জন ভোটার রয়েছেন। এর মধ্যে চাটমোহর উপজেলায় মোট ভোটারের সংখ্যা ২ লাখ ৫৮ হাজার ৫০০ জন। পুরুষ ১ লাখ ৩০ হাজার ৬৬৯ জন এবং মহিলা ১ লাখ ২৭ হাজার ৪৪৮ জন। ভাঙ্গুড়া উপজেলায় মোট ভোটার ১ লাখ ৮ হাজার ৯৬৮। এর মধ্যে পুরুষ ৫৪ হাজার ২৮৭ জন ও মহিলা ভোটার ৫৪ হাজার ৬৭৯ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গ দু'জন।
ফরিদপুর উপজেলায় মোট ভোটার ১ লাখ ৭৭ হাজার  ৭১৯ জন। পুরুষ ৫৮ হাজার ৯৮০ জন ও মহিলা ৫৮ হাজার ৭৩৫ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গ চার জন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পাবনা-৩ আসনে জয়ের ব্যাপারে মূল ফ্যাক্টর হবে ফরিদপুরের ভোট। কারণে চাটমোহর এবং ভাঙ্গুড়ায় শক্তিশালী প্রার্থী থাকলেও ফরিদপুরে নেই। এই কারণে ফরিদপুরে যে প্রার্থী বেশী ভোট পাবে তারই জয় লাভ করার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশী। তবে সাধারণ মানুষের চাওয়া নির্বাচনে যে দলের প্রার্থীই জয় লাভ করুক না কেন তারা যেন অবহেলিত এই অঞ্চলের দৃশ্যমান উন্নয়ন করে পরিবর্তন নিয়ে আসেন।

পাবনা-৩ আসনের অন্য প্রার্থীরা হলেন- গণ অধিকার পরিষদের হাসানুল ইসলাম (ট্রাক), ইসলামী আন্দোলনের আব্দুল খালেক (হাতপাখা), গণ ফোরামের সরদার আশা পারভেজ (উদিয়মান সূর্য), জাতীয় পার্টির মীর নাদিম ডাবলু (লাঙ্গল), সুপ্রিম পার্টির মাহবুবুর রহমান (একতারা)।

সর্বশেষ ২০০১ সালে চাটমোহর থেকে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কে এম আনোয়ারুল ইসলাম (বিএনপি) সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। এরপর ভাঙ্গুড়া উপজেলার বাসিন্দা আওয়ামী লীগের প্রার্থী মকবুল হোসেন নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হন। সেই নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন ফরিদপুর উপজেলার বাসিন্দা সাবেক এমপি অবসরপ্রাপ্ত গ্রুপ ক্যাপ্টেন সাইফুল আজম সুজা। এরপর বিতর্কিত তিনটি নির্বাচনে মকবুল হোসেন বিজয়ী হন। 

সর্বশেষ ২০২৪ সালে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আব্দুল হামিদ মাস্টার চাটমোহরে প্রায় ১৭ হাজার ভোটে জয় লাভ করলেও অন্য দুই উপজেলায় ৩৫ হাজার ভোটে হেরে মকবুল হোসেন জয় লাভ করেন।

আরআর/এমএ
আরও সংবাদ   বিষয়:  পাবনা  
Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝
Advertisement