জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে হাওরবেষ্টিত জেলা সুনামগঞ্জের পাঁচটি সংসদীয় আসনে। শেষ মুহূর্তের প্রচার-প্রচারণায় জমে উঠেছে নির্বাচনী মাঠ। শুরুতে এই জেলাটি বিএনপির একচেটিয়া প্রভাববলয়ে থাকলেও সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যপট পাল্টাতে শুরু করেছে। ধানের শীষের প্রার্থীদের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছেন জামায়াতে ইসলামী ও শক্তিশালী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।
স্থানীয় ভোটার ও বিশ্লেষকদের মতে, এবার নির্বাচন কেবল দলীয় লড়াই নয়; বরং ব্যক্তি ইমেজ ও আঞ্চলিকতার হিসাবেও রূপ নিচ্ছে। বিশেষ করে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং বিদ্রোহী প্রার্থীদের উপস্থিতি দলটিকে ভাবিয়ে তুলছে। অন্যদিকে, এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করছে জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।
আসনভিত্তিক নির্বাচনী সমীকরণ:
সুনামগঞ্জ-১ (ধর্মপাশা, জামালগঞ্জ, মধ্যনগর ও তাহিরপুর):
এখানে মূল লড়াই ত্রিমুখী। বিএনপির কামরুজ্জামান কামরুলের বিপক্ষে মাঠে আছেন জামায়াতের তোফায়েল আহমদ এবং নেজামে ইসলাম পার্টির মাওলানা মুজ্জাম্মিল হক তালুকদার। স্থানীয় ভোটাররা বলছেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচনের বাইরে থাকায় ভোটের লড়াই এখন বিএনপি বনাম জামায়াতে রূপ নিয়েছে। জামায়াত প্রার্থী এখানে বিএনপির দীর্ঘদিনের পুরোনো বিতর্কিত ইস্যুগুলো সামনে এনে ফায়দা তোলার চেষ্টা করছেন।
সুনামগঞ্জ-২ (দিরাই-শাল্লা):
ঐতিহ্যবাহী এই আসনে বিএনপির নাছির উদ্দিন চৌধুরীর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতের শিশির মনির। দীর্ঘদিন সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় থাকা শিশির মনির প্রচারণায় বিএনপি প্রার্থীর শারীরিক সক্ষমতাকে ইস্যু করে ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন। এছাড়া আওয়ামী লীগের বিশাল ভোটব্যাংক কোন দিকে যায়, তার ওপর নির্ভর করছে জয়-পরাজয়।
সুনামগঞ্জ-৩ (জগন্নাথপুর-শান্তিগঞ্জ):
জেলায় সবচেয়ে বেশি—৭ জন প্রার্থী এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। বিএনপির কয়ছর আহমেদের পথে কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছেন নিজ দলের বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থী আনোয়ার হোসেন। তিনি আঞ্চলিক কার্ড খেলে ভোট সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। তবে প্রবাসীদের সমর্থনে বিএনপি এখানে এখনো বেশ সংগঠিত। এখানে খেলাফত মজলিস ও এবি পার্টির প্রার্থীরাও সক্রিয় রয়েছেন।
সুনামগঞ্জ-৪ (সদর-বিশ্বম্ভরপুর):
সদর আসনে বিএনপির নূরুল ইসলামের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছেন দলের বিদ্রোহী দেওয়ান জয়নুল জাকেরীন ও জামায়াতের সামছ উদ্দিন। বিএনপির তরুণ কর্মীরা নূরুল ইসলামের পক্ষে থাকলেও বিদ্রোহীদের কারণে ভোট ভাগ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জাতীয় পার্টির নাজমুল হুদাও এখানে লাঙ্গল প্রতীক নিয়ে লড়াইয়ে আছেন।
সুনামগঞ্জ-৫ (ছাতক-দোয়ারাবাজার):
তিনবারের সাবেক এমপি কলিম উদ্দিন আহমেদ মিলন বিএনপির শক্ত প্রার্থী হলেও এখানে জামায়াতের আবু তাহির মুহাম্মদ আব্দুস সালাম তাকে কড়া টক্কর দিচ্ছেন। যদিও প্রচারণার দৌড়ে মিলন এগিয়ে আছেন বলে স্থানীয় সংবাদকর্মীরা মনে করছেন।
নির্বাচন সংশ্লিষ্ট তথ্য ও প্রস্তুতি:
জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, পাঁচটি আসনে এবার মোট প্রার্থী ২৩ জন। ১২টি উপজেলার মধ্যে ৮টিই হাওর এলাকা হওয়ায় ৩২৩টি ভোটকেন্দ্রকে ‘দুর্গম’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০ লাখ ৮০ হাজার ৩৩৫ জন ভোটারের ভোট গ্রহণে ১৪ হাজারের বেশি কর্মকর্তা নিয়োজিত থাকবেন।
জনপ্রতিনিধিদের বক্তব্য:
জামায়াত নেতা অ্যাডভোকেট মহসিন রেজা মানিক জানান, সম্পদ লুট ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় মানুষ তাদের পাশে আছে। অন্যদিকে, জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়ন বিএনপির নেতা জালাল উদ্দীন রুমি বলেন, “সুনামগঞ্জের পাঁচটি আসনেই ধানের শীষের জয় নিশ্চিত, ইনশাআল্লাহ।”
তবে সাবেক সেনাকর্মকর্তা রহিছ উদ্দিন আহমদের মতে, সব আসনেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে এবং ‘নীরব ভোটাররাই’ শেষ পর্যন্ত জয়-পরাজয়ের তুরুপের তাস হয়ে দাঁড়াবেন।
এএস/আরএন