পটুয়াখালীর দশমিনার শহীদ বাবলুর স্বপ্ন ছিল দুই ছেলেকে মানুষের মতো মানুষ করবেন। কিন্তু গত বছরের ২০ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে ঘাতকের গুলিতে ৫১ দিন মৃত্যুর সাথে লড়াই করে ০৯ সেপ্টেম্বর সকালে জীবন প্রদীপ নিভে যায় তার। তার মৃত্যু পুরো পরিবারকে শোকের চাদরে ঢেকে দিয়েছে। সন্তানরা শুধু একজন অভিভাবক হারায়নি, হারিয়েছে নির্ভরতার শেষ আশ্রয়। সন্তানদের ভবিষ্যত নিয়ে চরম দুশ্চিন্তায় বাবলুর স্ত্রী সীমা বেগম (৩৬)।
বাবলু উপজেলার ৩ নং বেতাগী সানকিপুর ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ড খারিজা বেতাগি গ্রামের বৃদ্ধ মফিজ আলী মৃধা ও হনুফা বেগম দম্পতির ছেলে। রাজধানীতে রাজমিস্ত্রীর কাজ করে যা বেতন পেতেন তা দিয়েই চালাতেন সংসার ও বড় ছেলের পড়ালেখার খরচ।
দুই ছেলে তার। বড় ছেলে রাজধানীর দনিয়া কলেজে সেই সময় এইচএসসি প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী আবু তালিবকে (১৭) সাথে নিয়ে তিনি শনির আখড়া এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। ছোট ছেলে মাহিমকে (২) নিয়ে গ্রামের বাড়িতে বাবলুর বাবা মায়ের সাথে থাকেন স্ত্রী সীমা বেগম। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের শুরু থেকেই ছেলে তালিবের সাথে রাজপথে সক্রিয় ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন বাবলু।
গত বছরের ২০ জুলাই সন্ধ্যা ৭টার দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে রাজধানীর শনির আখড়া এলাকায় হঠাৎ পিছনের দিক থেকে গুলিবিদ্ধ হন বাবলু। তাৎক্ষণিক তিনি রাস্তায় লুটিয়ে পড়লে কয়েকজন আন্দোলনকারী তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে অপারেশন করে গুলি বের করা হলেও আশংকাজনক অবস্থা ছিলো তার। গত বছরের ০৫ অগাস্ট হাসিনা সরকারের পদত্যাগ পরবর্তী অন্তবর্তীকালীন সরকার গুরুতর আশংকাজনক অবস্থায় উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢামেক থেকে প্রথমে পিলখানায় বিজিবি হাসপাতালে ও পরে অবস্থার অবনতি হলে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত বছরের ০৯ সেপ্টেম্বর সকালে মৃত্যুবরণ করেন বাবলু।
স্বামীকে হারিয়ে ভেঙ্গে পড়েছেন সীমা। সন্তান দুটিকে নিয়ে কেবল অন্ধকার দেখছেন তিনি। পরিবারের উপার্জনের একমাত্র অবলম্বনকে হারিয়ে তিনি এখন দুই সন্তান নিয়ে অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন।
ডেইলি অবজারভারকে তিনি বলেন, 'আমার স্বামী মারা যাওয়ার পরে দুই সন্তান নিয়ে আমি অনেক কষ্টে আছি। গত দু’টি ঈদে সবার বাবা এসেছে কিন্তু আমার সন্তানদের বাবা আসে নাই। গত বছর আমার স্বামীর মৃত্যুর সময় আমার কোলের ছোট ছেলেটি বুঝে উঠতে পারেনি তার বাবা আর ফিরবে না। এখন সে কথা বলতে পারে। সে বলে মা আমার বাবা আসবে না? গত রমজানের ঈদ ও কোরবানির ঈদের আনন্দ আসেনি আমাদের পরিবারে। প্রতি বছরের মতো গত দু’টি ঈদেও আমার, সন্তান ও বৃদ্ধ মা বাবার জন্য নতুন কাপড় চোপর কিনে বাড়ি ফেরার কথা ছিলো তার।'
নিহত বাবলুর বড় ছেলে আবু তালিব (১৭) বলেন, 'আমার বাবা স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আমার সাথে স্বতঃস্ফুর্ত ভাবে অংশগ্রহণ করে জীবন দিয়েছেন। পরিবারের একমাত্র অবলম্বন ছিলেন বাবা। আমার পড়াশোনার খরচসহ সবকিছইু বাবার আয়ে চলতো। বাবার হত্যাকারীদের বিচার চাই।'
শহীদ বাবলুর মৃত্যুতে শুধু স্ত্রী-পুত্র নয়, ভেঙে পড়েছেন বৃদ্ধ মা-বাবাও। ছেলের মৃত্যুর শোকে পাথর হয়ে গেছেন তারা। প্রায়ই নীরবে ছুটে যান কবরের পাশে।
বাবলুর মৃত্যুর পর পরিবারটি যেন থমকে গেছে। চোখে শুধু অজানা ভবিষ্যতের ভয় আর বুক ভরা দীর্ঘশ্বাস।
স্ত্রী সীমা বেগম ডেইলি অবজারভারকে বলেন, 'বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসান মামুন ৪৫ হাজার, সমন্বয়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ ২০ হাজার, সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকে ৩০ হাজার ও জেলা পরিষদ থেকে ২ লাখ টাকা আমার পরিবারকে অর্থ সহায়তা দিয়েছে। এছাড়াও গত ঈদ-উল-ফিতরে উপজেলা প্রশাসন ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষ থেকে খাদ্য সামগ্রী পাঠিয়েছেন।'
এ সময় তিনি সরকারের কাছে বড় ছেলে আবু তালিবের জন্য একটি সরকারি চাকুরির দাবি জানিয়ে বলেন, 'কেবল সহানুভূতি নয়, আমাদের চাওয়া সঠিক বিচার ও সামান্য ভালো থাকার নিশ্চয়তা।'
ভবিষ্যতে যাতে আর কোনো পরিবারকে এভাবে স্বজন হারাতে না হয় রাষ্ট্র ও সরকারের কাছে এমনই প্রত্যাশা সীমা বেগমের।
এসটি/এমএ