সবুজ ধানের দোল, বাতাসে শীষের মৃদু শব্দ আর সেই মাঠজুড়ে যেন কৃষির এক নতুন সম্ভাবনার গল্প। একই জমিতে একসঙ্গে ৫৮ জাতের ধান। কোথাও উচ্চ ফলনশীল, কোথাও লবণসহিষ্ণু, আবার কোথাও পুষ্টিসমৃদ্ধ বা সুগন্ধি ধানের সারি।
খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার বয়ারভাঙ্গা গ্রামে গড়ে ওঠা এই ব্যতিক্রম ধর্মী প্রযুক্তি গ্রাম এখন দক্ষিণাঞ্চলের কৃষকদের জন্য এক জীবন্ত গবেষণাগার।
বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) এলএসটিডি প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১০০ একর জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে এই প্রযুক্তি গ্রাম। যেখানে কৃষকরা বইয়ের পাতায় নয়, সরাসরি মাঠে দাঁড়িয়েই শিখছেন আধুনিক কৃষির নতুন প্রযুক্তি ও উন্নত ধানের জাত সম্পর্কে।
বোরো মৌসুমে চাষ উপযোগী ৬১টি ধানের জাতের মধ্যে ৫৮টি জাত এখানে প্রদর্শন করা হয়েছে। কৃষকরা একই মাঠে বিভিন্ন জাতের ধানের বৃদ্ধি, ফলন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং পরিবেশ উপযোগিতা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করতে পারছেন।
এলএসটিডি প্রকল্পের পরিচালক কৃষি কর্মকর্তা ড. মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, 'এ ধরনের প্রদর্শনী কৃষকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজ করছে। কোন জমিতে কোন জাত ভালো ফলন দেবে- তা এখন আর অনুমানের ওপর নির্ভর করছে না, বরং মাঠ পর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই কৃষকরা সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন।'
ব্রি স্যাটেলাইট স্টেশন, খুলনার বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাদের পরামর্শে অনেক কৃষক ব্রি হাইব্রিড ধান-৮ চাষ করে লাভবান হয়েছেন। এই জাতের ধানে রোগবালাই তুলনামূলক কম হওয়ায় কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের ব্যবহারও কম করতে হচ্ছে।
স্থানীয় এক কৃষক জানান, মাত্র পাঁচ কাঠা জমি থেকে তিনি পেয়েছেন ১০ মণ ৫ কেজি ধান। উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় লাভও হয়েছে বেশি। ফলে আগামী মৌসুমে আরও বেশি জমিতে এই জাতের ধান চাষের পরিকল্পনা করছেন তারা।
প্রযুক্তি গ্রামের আরেকটি বড় দিক হলো পরিবেশবান্ধব চাষাবাদ। অনেক কৃষক এখন কীটনাশক ছাড়াই ধান চাষ করে আশানুরূপ ফলন পাচ্ছেন।
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ধান রোপণ ও কর্তনের ফলে শ্রম ও উৎপাদন খরচ অনেকটাই কমেছে। একইসঙ্গে পরিবেশের ক্ষতিও কম হচ্ছে। তিন বিঘা জমিতে কীটনাশক ছাড়াই ধান চাষ করে এক কৃষক প্রায় প্রচলিত ফলনের সমান উৎপাদন পেয়েছে।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষিতে দীর্ঘদিনের বড় চ্যালেঞ্জ লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতা। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এ সমস্যা আরও প্রকট হয়ে উঠছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রযুক্তি গ্রামটিকে ঘিরে নতুন আশার আলো দেখছেন কৃষক ও কৃষি বিশেষজ্ঞরা।
এখানে লবণসহিষ্ণু ও প্রতিকূল পরিবেশ উপযোগী বিভিন্ন ধানের জাত নিয়ে গবেষণা ও মাঠপর্যায়ে পরীক্ষা চালানো হচ্ছে। এলএসটিডি প্রকল্পের মাধ্যমে কৃষকদের সরবরাহ করা হচ্ছে উন্নত বীজ, সার, কৃষিযন্ত্র ও আধুনিক কৃষি সহায়তা।
বৈজ্ঞানিক বিল্লাল হোসাইন বলেন, 'প্রযুক্তি গ্রামের মাধ্যমে কৃষকদের মধ্যে আধুনিক ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থার প্রতি আস্থা তৈরি হচ্ছে। একইসঙ্গে গবেষণার ফল সরাসরি কৃষকের হাতে পৌঁছে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যবস্থায়ও আসছে ইতিবাচক পরিবর্তন।'
খুলনার বটিয়াঘাটার এই প্রযুক্তি গ্রাম এখন শুধু ধান উৎপাদনের ক্ষেত্র নয়; এটি হয়ে উঠেছে ভবিষ্যতের কৃষির এক জীবন্ত প্রদর্শনী। যেখানে একইসঙ্গে চলছে গবেষণা, শিক্ষা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার সমন্বয়।
দক্ষিণাঞ্চলের কৃষির চিত্র বদলে দিতে পারে- এমন প্রত্যাশাই এখন স্থানীয় কৃষক ও সংশ্লিষ্টদের।
এসএম/এমএ