ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের স্বার্থসিদ্ধি ও চাপ প্রয়োগের অভিযোগে বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহমুদা সুলতানাকে বদলি করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) সন্ধ্যায় তাঁকে আদমদীঘি থেকে পাবনা জেলার ফরিদপুর উপজেলায় একই পদে বদলি করা হয়।
এই বদলিকে ঘিরে জনমনে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, আইনগত প্রক্রিয়ার আড়ালে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে এই বদলি কার্যকর করা হয়েছে, যা জনস্বার্থবিরোধী। অপ্রত্যাশিত এই বদলির আদেশ প্রত্যাহারের দাবিতে রবিবার বিকেলে সচেতন এলাকাবাসী রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে একটি স্মারকলিপি প্রদান করেছেন। তারা জানান, দ্রুত বদলি আদেশ স্থগিত না করা হলে মানববন্ধন কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।
স্মারকলিপির তথ্য অনুসারে জানা গেছে, আদমদীঘি উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহমুদা সুলতানার যোগদানের পর ভূমি সেবায় স্বচ্ছতা, দালালমুক্ত কার্যক্রম এবং রাজস্ব আদায়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি ঘটে। তিনি অবৈধ মাটি উত্তোলন, খাস সম্পত্তি দখলসহ নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন, যা স্থানীয় জনগণের প্রশংসা অর্জন করে। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের একটি অংশ নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন অনিয়মে জড়িয়ে পড়ছেন। তারা সরকারি পুকুরের বড় অংশ দখলে নেওয়া, ফসলি জমি ও পুকুর অবৈধভাবে খনন করা, এবং এসব কর্মকাণ্ডে বাধা বা সহযোগিতা না পেলে নানা ধরনের অনৈতিক চাপ প্রয়োগ করতেন। বিশেষ করে ছাতিয়ানগ্রাম সহ বিভিন্ন ইউনিয়নে পুকুর ও আবাদি জমি থেকে অবৈধভাবে মাটি উত্তোলন করে তা বিক্রি করছেন। এর ফলে স্থানীয় সড়কগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করছে। উপজেলা প্রশাসন একাধিকবার অভিযান পরিচালনা করে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এতেই তারা ক্ষিপ্ত হয়ে মনে ক্রোধ পুষে রাখেন।
সাম্প্রতিক সময়ে সান্তাহার নতুন বাজার এলাকায় একটি সরকারি পুকুর থেকে অবৈধভাবে মাটি উত্তোলনের ঘটনায় বিরোধের সৃষ্টি হয়। উত্তোলিত মাটি ইটভাটায় নেওয়ায় পুকুরের স্বাভাবিক গঠন নষ্ট হয় এবং পাশের সড়ক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক আজাহারুল ইসলাম সাজ্জাদ পুকুরটিকে মসজিদের সম্পত্তি দাবি করে প্রভাব খাটিয়ে এ কাজ পরিচালনা করছিলেন। ঘটনায় তাকে সহায়তা করেন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। তবে ইউনিয়ন তহসিল অফিসের তথ্য অনুসারে সম্পত্তিটি সান্তাহার বশিপুর মৌজার ১ নম্বর খাস খতিয়ানের অন্তর্ভুক্ত, যেখানে মসজিদ, পুকুর, অজুখানা, মার্কেট ও কিছু পতিত জমিসহ মোট ৩২ শতক ভূমি রয়েছে যার কোনো বৈধ লিজ নেই। এ ঘটনায় ২৪ মার্চ একজন স্থানীয় বাসিন্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগের ভিত্তিতে ৩০ মার্চ ভ্রাম্যমাণ আদালত তদন্ত করে সত্যতা পায় এবং মাটি উত্তোলনের দায়ে ঘটনাস্থলে আশরাফুল ইসলামকে বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইনের অধীনে আড়াই লাখ টাকা জরিমানা করে। পরদিন সকালে ক্ষমতাসীন দলের লোকজন ক্ষিপ্ত হয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে হুমকিস্বরূপ মন্তব্য করেন এবং রাস্তায় নামার হুঁশিয়ারি দেন। বিকেলে মসজিদের জায়গা’ ইস্যুতে প্রতিবাদ জানায় নেতাকর্মীরা। তাদের উদ্দেশ্য ছিল সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহমুদা সুলতানাকে সরিয়ে দেওয়া। সেখানে সরাসরি অপসারণের বক্তব্য দেন সান্তাহার পৌর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মামুনুর রশীদ। ঘটনার পরদিনই তাকে হঠাৎ বদলি করা হয়। এতেই প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও সুশাসন নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
রাজশাহী অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) ড. চিত্রলেখা নাজনীন জানান, স্মারকলিপি গ্রহণ করা হয়েছে এবং বদলি প্রত্যাহারের বিষয়ে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।
এসএইচকেএস/এসআর