বনের গভীর ছায়াঘেরা বৃক্ষশাখার ফাঁকে হঠাৎ যদি চোখে পড়ে বিশাল আকৃতির কালো রঙের এক কাঠবিড়ালি, মুহূর্তেই যেন বিস্ময়ে থমকে যেতে হয়। কারণ আমাদের চোখ তো অভ্যস্ত ছোট্ট বাদামি বা ধূসর রঙের চঞ্চল কাঠবিড়ালিদের সঙ্গেই।
কিন্তু প্রকৃতির বিস্ময়কর বৈচিত্র্যের ভাণ্ডারে এমন এক প্রজাতির কাঠবিড়ালিও রয়েছে, যার আকার তুলনামূলকভাবে অনেক বড়, গায়ের রং গাঢ় কালো এবং উপস্থিতি যেন বনজঙ্গলের এক রাজসিক প্রাণীর মতো। ঘন বনভূমির উঁচু গাছের ডালে ডালে তার অবাধ বিচরণ, লম্বা ঝাঁকড়া লেজ আর গম্ভীর চেহারা—সব মিলিয়ে তাকে দেখলে মনে হয় যেন বনের নীরব রাজ্যের এক রহস্যময় বাসিন্দা।
এই প্রাণীটির নাম Black giant squirrel, যা Malayan giant squirrel নামেও পরিচিত। বৈজ্ঞানিকভাবে এটি Ratufa bicolor নামে পরিচিত। প্রকৃতির রহস্যময় প্রাণীদের তালিকায় এটির অবস্থান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিস্তীর্ণ অরণ্যে বসবাসকারী এই প্রাণীটি শুধু তার আকার বা রঙের জন্যই নয়, বরং তার আচরণ, বাসস্থান ও জীবনধারার বৈচিত্র্যের জন্যও গবেষক ও প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আগ্রহের বিষয়।
বিশাল আকৃতি, রাজসিক উপস্থিতি:
সাধারণ কাঠবিড়ালির তুলনায় এই প্রজাতির আকার অনেক বড়। পূর্ণবয়স্ক একটি কালো দৈত্য কাঠবিড়ালির দেহের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩৫ থেকে ৪৫ সেন্টিমিটার এবং লেজের দৈর্ঘ্য প্রায় একই রকম বা তার থেকেও বেশি হতে পারে। ফলে পুরো প্রাণীটির দৈর্ঘ্য অনেক সময় প্রায় এক মিটার পর্যন্ত হয়ে যায়।
এদের শরীর সাধারণত গাঢ় কালো বা কালচে বাদামি রঙের। বুকের নিচের অংশে অনেক সময় হালকা বাদামি বা ক্রিম রঙ দেখা যায়। মোটা ও লম্বা লেজটি তাদের ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, বিশেষ করে যখন তারা এক গাছ থেকে অন্য গাছে লাফিয়ে চলে।
বনের উঁচু ডালে বসে থাকা এই প্রাণীকে অনেক সময় দূর থেকে ছোট কোনো বানর বলে ভুল হয়। কিন্তু কাছে থেকে দেখলে বোঝা যায়, এটি প্রকৃতির এক অনন্য কাঠবিড়ালি।
বিস্তৃত বাসস্থান:
এই প্রজাতির কাঠবিড়ালি প্রধানত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দেখা যায়। এদের বিস্তৃতি রয়েছে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায়।
বাংলাদেশে এটি মূলত পার্বত্য বনাঞ্চল এবং চিরসবুজ অরণ্যে বসবাস করে। বিশেষ করে সিলেট অঞ্চলের বনভূমি—যেমন লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ও সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানে—এই প্রাণীর সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত।
এই কাঠবিড়ালিরা সাধারণত মাটিতে খুব কম নামে। জীবনের অধিকাংশ সময়ই তারা গাছের উঁচু ডালে কাটায়। ঘন বন, উঁচু গাছ এবং পর্যাপ্ত খাদ্য—এই তিনটি বিষয় তাদের টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
খাদ্যাভ্যাস: বনজ ফলের প্রতি বিশেষ ঝোঁক:
কালো দৈত্য কাঠবিড়ালি মূলত শাকাহারী হলেও কখনও কখনও ছোট পোকামাকড়ও খেয়ে থাকে। তাদের প্রধান খাদ্যের মধ্যে রয়েছে বনের বিভিন্ন ফল, বাদাম, বীজ, ফুল ও কচি পাতা।
বনের গাছে গাছে ঘুরে তারা খাবার সংগ্রহ করে। অনেক সময় একটি ডালে বসে ধীরে ধীরে বাদাম বা ফল খেতে দেখা যায়। খাবার খাওয়ার সময় তাদের দাঁতের ব্যবহার এবং সামনের পায়ের দক্ষতা সত্যিই বিস্ময়কর।
গাছে গাছে উড়ন্ত জীবনের মতো চলাচল:
যদিও এই কাঠবিড়ালিরা উড়তে পারে না, তবে এক গাছ থেকে অন্য গাছে লাফানোর ক্ষমতা এতটাই অসাধারণ যে অনেক সময় মনে হয় তারা যেন আকাশে ভেসে যাচ্ছে।
একটি গাছের ডাল থেকে অন্য গাছের ডালে তারা প্রায় ৬ থেকে ৯ মিটার পর্যন্ত লাফ দিতে পারে। এই ক্ষমতার কারণে তারা সহজেই শিকারিদের হাত থেকে বাঁচতে পারে এবং ঘন বনের মধ্যে দ্রুত চলাচল করতে সক্ষম হয়।
বাসা ও প্রজনন:
এই কাঠবিড়ালিরা সাধারণত গাছের উঁচু ডালে বড় আকারের গোলাকার বাসা তৈরি করে। শুকনো ডাল, পাতা ও ঘাস দিয়ে বানানো এই বাসাগুলো অনেক সময় গাছের মগডালে থাকে।
মাদী কাঠবিড়ালি সাধারণত এক বা দুটি বাচ্চার জন্ম দেয়। মা কাঠবিড়ালি অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে বাচ্চাদের বড় করে তোলে এবং কয়েক মাস পর্যন্ত তাদের বাসার আশপাশেই রাখে।
বন ধ্বংসের হুমকি:
বর্তমানে এই প্রজাতির সবচেয়ে বড় হুমকি হলো বন উজাড় এবং আবাসস্থল ধ্বংস। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক অঞ্চলে বনভূমি কমে যাওয়ায় তাদের স্বাভাবিক আবাসস্থল সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ফলে অনেক জায়গায় এই প্রাণীটি আগের তুলনায় কম দেখা যাচ্ছে।
প্রকৃতি সংরক্ষণবিদদের মতে, যদি বন সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হয়, তবে ভবিষ্যতে এই বিস্ময়কর প্রাণীটি অনেক অঞ্চলে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।
প্রকৃতির নীরব দূত:
কালো দৈত্য কাঠবিড়ালি শুধু একটি প্রাণীই নয়; এটি বনজ পরিবেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তারা বনের ফল ও বীজ ছড়িয়ে দিয়ে নতুন গাছ জন্মাতে সহায়তা করে। অর্থাৎ বনজ বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
বনের উঁচু ডালে বসে থাকা সেই কালো দৈত্য কাঠবিড়ালিকে দেখলে মনে হয়, প্রকৃতি তার নিজস্ব সৌন্দর্য ও রহস্য নিয়ে এখনও বেঁচে আছে। আর সেই সৌন্দর্য রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালে হবিগঞ্জের কালেঙ্গা বন থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই কাঠবিড়ালিটির একটি দুর্লভ ছবি তুলেছিলেন বার্ড ফটোগ্রাফার ও পরিবেশকর্মী খোকন থৌনাওজাম। সেই ছবির মাধ্যমে আবারও আলোচনায় আসে বনজঙ্গলের এই রহস্যময় বাসিন্দা।
আরএন