উন্নত চিকিৎসার অন্যতম ভরসাস্থল খুলনার একমাত্র বিশেষায়িত হাসপাতাল। তবে জনবল সংকট, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা যন্ত্রপাতির ঘাটতির কারণে প্রতিনিয়ত নানা সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে সেবা দিতে হচ্ছে হাসপাতালটিকে। বিশেষ করে ডায়ালাইসিস ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার জন্য রোগীদের মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে বেড না পাওয়ায় রোগীদের বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। ফলে সুচিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শত শত মানুষ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১০ সালে খুলনা নগরীর গোয়ালখালি এলাকায় তিনটি বিভাগ নিয়ে যাত্রা শুরু করে এই হাসপাতালটি। বর্তমানে এখানে ১১টি বিভাগ চালু রয়েছে। ৮৫ জন চিকিৎসক, ২০০ জন নার্স এবং ১০৩ জন সহায়ক কর্মচারী দিয়ে হাসপাতালের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ভাস্কুলার সার্জারি, বার্ন ইউনিট ও নিউরো মেডিসিন বিভাগে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের ঘাটতি রয়েছে। এছাড়া সহায়ক কর্মচারীরও অভাব রয়েছে। তারপরও প্রতিদিন বহিঃবিভাগে ৫০০ থেকে ৬০০ রোগীকে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে।
এক বছর ধরে নষ্ট গুরুত্বপূর্ণ সি-আর্ম মেশিন
হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ একটি সি-আর্ম মেশিন প্রায় এক বছর ধরে নষ্ট অবস্থায় রয়েছে। এই মেশিনের মাধ্যমে বিভিন্ন অপারেশন পরিচালিত হতো। মেশিনটি অচল থাকায় সংশ্লিষ্ট অপারেশন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
জানতে চাইলে হাসপাতালের বায়োমেডিকেল টেকনোলজিস্ট পলক কুমার রায় বলেন, 'সফটওয়্যার সমস্যার কারণে মেশিনটি অচল হয়ে পড়ে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলে একটি প্রতিনিধি দল এসে পরিদর্শন করে। তবে পুরোনো মডেলের হওয়ায় এর সফটওয়্যার সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না।'
ডায়ালাইসিস মেশিনের অভাবে রোগীদের দুর্ভোগ
হাসপাতালে ২৮টি ডায়ালাইসিস মেশিন থাকলেও বর্তমানে সচল রয়েছে মাত্র ১৬টি। বাকি ১২টি মেশিন অচল থাকায় অর্ধেক রোগীকেই সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। ফলে ডায়ালাইসিসের জন্য রোগীদের দুই থেকে তিন মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মতে, এই চাহিদা পূরণে অন্তত আরও ১৫ থেকে ১৬টি মেশিন প্রয়োজন।
জানতে চাইলে হাসপাতালের পরিচালক ডা. শেখ আবু শাহিন বলেন, 'অচল মেশিনগুলো মেরামতের চেষ্টা চলছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে মেরামতের পর আবার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাই নতুন মেশিনের প্রয়োজন রয়েছে। নতুন মেশিন চাওয়া হয়েছে। অনুমোদন পেলে সমস্যা থাকবে না।'
স্টোর রুম না থাকায় নিরাপত্তা ঝুঁকি
হাসপাতালে প্রয়োজনীয় মালামাল সংরক্ষণের জন্য কোনো নির্দিষ্ট স্টোর রুম নেই। ফলে বিভিন্ন কক্ষে যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম রাখতে হচ্ছে, যা নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে।
এ ব্যাপারে পরিচালক বলেন, 'একটি স্টোর বিল্ডিং নির্মাণ করা গেলে এই সমস্যা সমাধান করা সম্ভব হবে।'
২৫০ বেডের বিপরীতে চালু ২১৬টি
২৫০ বেডের হাসপাতাল হলেও বর্তমানে চালু রয়েছে ২১৬টি বেড। বাকি ৩৪টি বেড অকেজো রয়েছে রয়েছে। ফলে রোগীদের চাপ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে।
উন্নয়নে সরকারের হস্তক্ষেপ প্রত্যাশা
খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব এডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, 'দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দাবি- নবনির্বাচিত সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে হাসপাতালের জনবল বৃদ্ধি, আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা আরও কার্যকর করবে।'
রোগীদের সন্তুষ্টি থাকলেও খাবারের মান নিয়ে প্রশ্ন
চিকিৎসা নিতে আসা একাধিক রোগী জানান, হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা ও ডাক্তারদের ব্যবহার অত্যন্ত ভালো। একজন রোগী বলেন, 'আমি আগে এখানে চিকিৎসা নিয়েছিলাম, আবার এসেছি। এখানে চিকিৎসার মান ভালো এবং ডাক্তারদের ব্যবহার অত্যন্ত আন্তরিক।'
আরেক রোগী দ্বীন মোহাম্মদ বলেন, 'চিকিৎসার মান ভালো, ডাক্তারদের আচরণও ভালো। তবে ভর্তি রোগীদের খাবারের মান আরও উন্নত করা দরকার।'
হৃদরোগ বিভাগের ভর্তি রোগী আবুল কালাম বলেন, 'অন্য হাসপাতালের তুলনায় এখানে অনেক ভালো চিকিৎসা পাচ্ছি। খরচ কম, চিকিৎসাও সঠিক ভাবে হচ্ছে। প্রয়োজনীয় ওষুধ ও অক্সিজেন সময়মতো দেওয়া হচ্ছে।'
অন্য এক রোগী বলেন, 'এখানে নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত- সব শ্রেণির রোগীদের সমান ভাবে চিকিৎসা দেওয়া হয়। তবে হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা ও আধুনিক যন্ত্রপাতি বাড়ানো হলে আরও উন্নত সেবা দেওয়া সম্ভব।'
এমএ