সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নের ডুমুরিয়া গ্রামে মোসাম্মদ বিলকিস খাতুন (৩৪) দুই ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত জীবিকার লড়াই করেন। স্বামী মাজেদ মিস্তিরি জীবিকার সন্ধানে মাসের পর মাস বাড়ির বাইরে কাজ করেন, কখনো টাকা পাঠাতে পারেন, কখনো না। মিঠা পানির তীব্র সংকট ও লবণাক্ত পানির প্রভাবে জমিতে ফসল হয় না, তাই মাজেদকে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়াতে হয়।
বিলকিস বাড়ির সামনে ছোট পুকুর খনন করে বৃষ্টির মিঠা পানি সংরক্ষণ করে সবজি চাষ করেন, এই সবজিই তার মোটামুটি সারা মাসের খোড়াক যোগায়। এরপর আছে সন্তানের দেখাশোনা, বাড়িতে কিছু মুরগিও পালন করেন তিনি।
বিলকিস বলেন, 'সারাদিন সংসারের যেই কাজ আমি করি তা অন্য কোথাও করলে আমার আয় আরও অনেক বেশি হতো, কিন্তু সন্তানদের রেখে বাইরে কাজ করা সম্ভব হয় না।'
এই গল্প শুধু বিলকিস খাতুনের নয়। বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় অঞ্চল এবং হাওরে শত শত নারী কৃষকের গল্প। এখানে মিঠা পানির স্বল্পতা এতটাই প্রকট যে, মাত্র এক কলস (১৫-১৮ লিটার) পানির জন্য ৪ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয় এবং এটি তাদের প্রতিদিনের কাজ। পরিবারের মিঠা পানির যোগানে তাদের এই শ্রম একেবারেই মুল্লায়িত হয়না।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পুরুষ অভিবাসন বৃদ্ধির ফলে কৃষির মূল দায়িত্ব ক্রমশ নারীদের ওপর চলে আসছে। বিআইডিএসের সাবেক মহাপরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, 'জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পুরুষ অভিবাসন বেড়ে কৃষির দায়িত্ব নারীদের ওপর পড়ছে, যা খাদ্য নিরাপত্তার জন্য একইসঙ্গে ঝুঁকি ও সম্ভাবনা তৈরি করছে। ঝুঁকির দিক হলো নারীদের জমির মালিকানা সীমিত, ঋণ ও প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার কম এবং অতিরিক্ত গৃহস্থালি কাজের কারণে উৎপাদনশীলতা বাধাগ্রস্ত হওয়া। তবে সঠিক নীতি সহায়তা থাকলে এটি বড় সম্ভাবনা।'
সাতক্ষীরার গাবুড়া ইউনিয়নের নাজমা খাতুন (৪০) একজন বিধবা। এখনো স্বামীর ভিটাতেই আছেন, তার জমির মালিকানা নেই বললেই চলে। তিনি বলেন, 'ভেবেছিলাম ব্যাংঙ্ক থেকে কৃষি ঋণ নিয়ে হাঁস-মুরগী পালন করবো, কিন্তু ঋণ পাই নাই, আমাকে বলা হয়েছে কৃষি ঋণের জন্য জমির মালিক হতে হবে।'
পরবর্তী সময়ে তিনি সাতক্ষীরা এলাকার সেবামূলক সংগঠন লোকাল এনভায়রনমেন্ট ডেভলপমেন্ট এন্ড এগ্রিকালচার রিসার্চ সোসাইটি (লিডার্স) থেকে তিনি ঋণ পান। নাজমা বলেন, 'এই ঋণ আমার অনেক কাজে এসেছে, এখন আমি কিছুটা ঘুরে দাঁড়াতে পেরেছি। এই টাকা আমি কৃষিতে বিনিয়োগ করেছি এবং জীবিকা চালানোর মতো রোজগার করতে পারছি।'
বাংলাদেশের কৃষিখাতে নারীদের অবদান বিশাল হলেও তা অদৃশ্য রয়ে গেছে। অবৈতনিক গৃহস্থালি ও পরিচর্যা কাজ জিডিপিতে ২১-৩০ শতাংশ অবদান রাখে (বিবিএস ও ইউএন উইমেন, ২০২৩)। নারীরা পুরুষদের তুলনায় ৫-৭ গুণ বেশি সময় গৃহস্থালি কাজে ব্যয় করেন, যার বড় অংশ যায় পানি ও জ্বালানি সংগ্রহে (টাইম ইউজ সার্ভে ২০২২)।
ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, 'নারীদের অবৈতনিক পরিচর্যা ও কৃষিভিত্তিক শ্রম জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখলেও তা প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে স্বীকৃতি না পাওয়ার মূল কারণ হলো অর্থনীতির বাজার কেন্দ্রিক হিসাব কাঠামো। জিডিপি কেবল বাজার লেনদেনকে মূল্যায়ন করে। এছাড়া সময় ব্যবহার সমীক্ষার ঘাটতি ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এই শ্রমকে ‘পারিবারিক দায়িত্ব’ হিসেবে দেখে।'
সুইডেন সরকারের অর্থায়নে মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) কমিউনিটিভিত্তিক জলবায়ু সহনশীলতা ও নারীর ক্ষমতায়ন কর্মসূচি’ বা ‘সিআরইএ’ প্রকল্প নিয়ে কাজ করেছ এবং উপকূলীয় এলাকায় এর দৃশ্যমান অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে।
এমজেএফ-এর নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম বলেন, 'এখনো এখানে নারীর কাজের স্বীকৃতি নাই, তাদের নিজস্ব কোনো ভূমিও নাই। নারীর কাজের স্বীকৃতি না থাকার অন্যতম মূল কারণের একটি হলো তার গৃহস্থালি কাজটি পণ্য আকারে বাজারে বিক্রি হয় না, এই সমাজে সেটাকেই উৎপাদনশীল হিসেবে ধরা হয় যার বাজারে দৃশ্যমান মূল্য আছে।'
তিনি বলেন, 'নারীর কাজের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে হবে, এর জন্য ব্যাপক কাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন এবং ব্যাপক বাজেট বরাদ্দ প্রয়োজন, যা একমাত্র সরকারের পক্ষেই সম্ভব।'
বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রান্তিক পর্যায়ের নারী ভূমিহীন হওয়ায় কৃষি ঋণ, কৃষক কার্ড ও প্রণোদনায় প্রবেশাধিকার অত্যন্ত সীমিত। ড. মুস্তফা কে মুজেরির মতে, নারী কৃষকের প্রণোদনা বঞ্চনার মূল কারণ হলো কৃষক পরিচয় ও জমির মালিকানাভিত্তিক নীতি কাঠামো। এটি সংশোধনে ‘কৃষক’ সংজ্ঞা পুনর্নির্ধারণ, পৃথক নারী কৃষক রেজিস্ট্রি, জেন্ডার সংবেদনশীল কোটা, জামানতবিহীন ক্ষুদ্র ঋণ এবং যৌথ মালিকানা স্বীকৃতি জরুরি।'
লবণাক্ত পানির সাথে দীর্ঘ সময় কাজ করায় নারীরা সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছেন। খুলনা ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের পরিচালক ডা. নাহিদ নজরুল বলেন, 'নারীদের ক্ষেত্রে ইউটিআই, যোনিপথের সংক্রমণ ও পেলভিক প্রদাহ বাড়ছে। গর্ভবতী নারীদের মধ্যে লবণাক্ত পানির কারণে উচ্চ রক্তচাপ ও প্রি-ইক্ল্যাম্পসিয়া মারাত্মক আকার ধারণ করেছে, যা অকাল প্রসব, বাচ্চার স্বল্প জন্ম ওজন ও মাতৃ-শিশু মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।'
তিনি বলেন, 'খুলনা-সাতক্ষীরা উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ত পানির কারণে চর্মরোগ ব্যাপক বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে চর্ম শুষ্কতা, চুলকানি, একজিমা, ফাঙ্গাল ইনফেকশন, খোসপাঁচড়া ও ঘামাচি।'
লিডার্স -এর নির্বাহী পরিচালক মোহন কুমার মণ্ডল বলেন, 'উপকূলের সবচেয়ে বড় সংকট এখন নিরাপদ পানি। অনেক পরিবার খাবার পানি জোগাড় করতে পারলেও রান্না, গোসল ও দৈনন্দিন কাজে পর্যাপ্ত পানি পাচ্ছে না। খরা ও লবণাক্ততায় কৃষি ব্যবস্থা প্রায় সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ছে। জমি পরিশোধন ও টেকসই পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা না হলে খাদ্য উৎপাদন পর্যাপ্ত হবে না, জীবিকার সংকট গভীর হবে এবং আরও মানুষ এলাকা ছাড়তে বাধ্য হবে।'
উপকূলীয় এলাকায় লিডার্স যে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো চালিয়ে যাচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবেলায় উপকূল ও উপকূল সংলগ্ন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সহনশীলতা বৃদ্ধি করাই এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। এ উদ্দেশ্যে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সরকারকে আরও কার্যকর করে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নারী ও কিশোরীদের মানসম্মত সেবায় প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি নারীদের ক্ষমতায়নের মাধ্যমে অসমতা, সামাজিক অবিচার ও সহিংসতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এবং অন্যায়ের প্রতিবাদে অংশগ্রহণের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। কর্মসূচিটি নারীর প্রতি পারিবারিক সহিংসতা ও বাল্যবিবাহের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান গ্রহণে উৎসাহিত করছে এবং জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ নির্বাচিত এলাকায় এসব ঘটনার হার কমাতে কাজ করছে। একইসঙ্গে বিকল্প জীবিকায়নের সুযোগ সৃষ্টি করে পারিবারিক আয় বৃদ্ধি ও দারিদ্র্যের ঝুঁকি হ্রাসের মাধ্যমে টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের শ্যামনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ওয়ালিউল ইসলাম বলেন, 'লবণাক্ততা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা লবণসহিষ্ণু জাত প্রচার করছি, কিন্তু নারী কৃষকদের জন্য আলাদা প্রশিক্ষণ ও ঋণ প্রবাহ খুবই কম।'
প্রযুক্তির এই চরম উৎকর্ষ ও আধুনিক যুগেও বাংলাদেশের নারী কৃষকরা প্রতিকূলতার মধ্যে আছে। এই বৈরী সময়েও নারী কৃষকদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার আলোর দিশা দেখাচ্ছে ‘কমিউনিটিভিত্তিক জলবায়ু সহনশীলতা ও নারীর ক্ষমতায়ন (সিআরইএ)’ কর্মসূচি। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন (এমজেএফ) ও সুইডেন সরকারের আর্থিক সহায়তায় লিডার্স এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। মূল কার্যক্রমগুলো হলো-
নারীর ক্ষমতায়ন: নারীদের অর্থনৈতিক-সামাজিক স্বাবলম্বিতা বৃদ্ধি ও নেতৃত্বের বিকাশ নিশ্চিত করা।
জেন্ডার ভিত্তিক সহিংসতা প্রতিরোধ: পারিবারিক-সামাজিক স্তরে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ এবং বাল্যবিয়ে বন্ধে সচেতনতা তৈরি করা।
প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার: ভূমিহীন দরিদ্র, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী, দলিত, প্রতিবন্ধী ও হিজড়া সম্প্রদায়ের মৌলিক অধিকার ও সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা।
জলবায়ু সহনশীলতা: জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করা।
সুশাসন ও মানবাধিকার: সরকারি সেবা প্রাপ্তিতে প্রান্তিক মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং তথ্য অধিকার আইনসহ বিভিন্ন প্রগতিশীল আইন বাস্তবায়নে সরকারের সাথে অ্যাডভোকেসি করা।
এক কথায়, ‘এমজেএফ’ তৃণমূল পর্যায়ে সুশাসন, জেন্ডার সমতা এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করছে। ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, 'এমজেএফ পরিচালিত সিআরইএ-এর মতো প্রকল্প স্থানীয় পর্যায়ে নারীর সক্ষমতা বাড়ায়। এগুলোকে টেকসই করতে সরকার ও এনজিওর মধ্যে শক্ত নীতিগত সমন্বয় দরকার। সফল মডেলগুলোকে সরকারি কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।'
অ্যাডভোকেসির আহ্বান: নীতিনির্ধারকদের প্রতি- জেন্ডার সংবেদনশীল কৃষিনীতি ও জমি-ঋণে সমান অধিকার নিশ্চিত করুন; অবৈতনিক শ্রমের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন করে জাতীয় হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করন; লবণসহিষ্ণু চাষাবাদ ব্যবস্থা, পানি সংরক্ষণ ও নারী-কেন্দ্রিক ও নারী বান্ধব প্রকল্প বাড়ানো প্রয়োজন।
বাংলাদেশের উপকূলীয় নারী কৃষকরা জলবায়ু পরিবর্তন ও লবণাক্ততার বিরুদ্ধে লড়াই করে প্রতিদিন খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষা করছেন। তবু তাদের শ্রম এখনো যথাযথ স্বীকৃতি পায়নি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নারীর কাজকে দৃশ্যমান করা, জমি ঋণে সমান অধিকার এবং জেন্ডার অন্তর্ভুক্তিমূলক জলবায়ু-সহনশীল কৃষিনীতি প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। নারীদের কেন্দ্রে রেখে উন্নয়নই টেকসই সমাধান।
লেখক ও আলোকচিত্রী।
এমএ