ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
বনে ছেড়ে দেওয়া নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মতবিরোধ
সুন্দরবনের ফাঁদে উদ্ধার সেই বাঘিনী সম্পূর্ণ সুস্থ
✎ সৈকত মোঃ সোহাগ খুলনা
⏲ প্রকাশিত: শুক্রবার, ৫ জুন, ২০২৬, ১০:১৯ এএম আপডেট: ০৫.০৬.২০২৬ ১০:২০ এএম
X

খুলনার বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসনকেন্দ্রে পাঁচ মাস ধরে চিকিৎসাধীন থাকা সেই বাঘিনী সুস্থ হয়ে উঠলেও সুন্দরবনে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে একমত হতে পারেননি বিশেষজ্ঞরা। ফলে বাঘিনীকে সুন্দরবনের গহীনে ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়ায় ধীরগতি হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিশেষজ্ঞদের মধ্যে একটি অংশ মনে করেন- যেহেতু বাঘিনীটি বয়স্ক, সেহেতু তার গতিবিধি পর্যবেক্ষণ দরকার। সে কারণে বাঘিনীকে নজরদারীর মধ্যে রাখতে প্রয়োজন স্যাটেলাইট কলার কিংবা মাইক্রোচিপের মতো কোনো কিছু। কিন্তু এই মুহুর্তে আমেরিকা থেকে ‘স্যাটেলাইট কলার’ প্রযুক্তি আনতে সময় লাগবে। এছাড়া এটি ব্যয়বহুলও।

এদিকে, বাঘিনীর প্রতিদিনের খাবার ও ওষুধের পেছন বন বিভাগকে প্রতি মাসে ব্যয় করতে হচ্ছে দুই লাখ টাকার ওপরে।

# গতিবিধি পর্যবেক্ষণে বাঘিনীর শরীরে স্যাটেলাইট কলার কিংবা মাইক্রোচিপের মতো প্রযুক্তি দেওয়ার পক্ষে মত।

# প্রতিদিন ৪-৫ কেজি ফ্রেস মাংস খেতে দিতে হচ্ছে, খাদ্য ও চিকিৎসার পেছনে মাসে ব্যয় ২ লাখ টাকার উপরে।

জানতে চাইলে খুলনা বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুর্নবাসন কেন্দ্রের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) নির্মল কুমার পাল বলেন, 'বাঘিনীকে প্রতিদিন ৪-৫ কেজি ফ্রেস মাংস খেতে দিতে হচ্ছে। এছাড়া নিয়মিত ওষুধ সেবনে বাম পায়ের ক্ষত সম্পূর্ণ ঠিক হয়ে গেছে।'

তিনি বলেন, 'ক্ষতস্থানে নতুন চামড়া হয়েছে। বাঘিনী এখন ক্ষিপ্র গতিতে হাঁটতে পারছে। বনে ছেড়ে দেওয়ার মতো উপযোগী হয়েছে। চলতি মাসে আরও একটি মিটিং আছে। সেখানে বাঘিনীকে বনে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।'

এর আগে গত ২১ মে বাঘটিকে সুন্দরবনে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়ে বন বিভাগের উর্দ্ধতন কর্মকর্তা ও প্রাণী বিষেষজ্ঞদের সমন্বয়ে জুম মিটিং হয়েছিল। উপ-প্রধান বন সংরক্ষক (শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ) মো. জাহিদুল কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই সভায় খুলনা বিভাগীয় বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ, জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণী বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল আজিজ ও অধ্যাপক মনিরুল হুদা খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণী বিভাগের অধ্যাপক মো. আনোয়র ইসলাম, সুন্দরবন পূর্ব ও পশ্চিম বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ও বাঘ বিশেষজ্ঞ উপস্থিত ছিলেন।

জুম মিটিংয়ে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ বাঘটিকে পর্যবেক্ষণে রাখতে স্যাটেলাইট কলার কিংবা মাইক্রোচিপ প্রযুক্তি ব্যবহারের পরামর্শ দেন। ফলে কোনো সিদ্ধান্ত ছাড়াই জুম মিটিং শেষ হয়।

জানতে চাইলে খুলনা বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুর্নবাসন কেন্দ্রের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) নির্মল কুমার পাল বলেন, 'ওই প্রযুক্তি আমেরিকা থেকে আনতে হলে আরও দুই-তিন মাস লাগতে পারে। তাছাড়া এটি ব্যয়বহুলও। এই বাজেট বন বিভাগের কাছে বর্তমানে নেই।'

তিনি বলেন, 'চলতি মাসে মিটিং রয়েছে। যদি ওই প্রযুক্তি বাঘিনীর শরীরে স্থাপন করার সিদ্ধান্ত না হয়, তাহলে চলতি মাসের শেষের দিকে অথবা আগামী জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে বাঘিনীকে বনে ছেড়ে দিতে পারবো।'

চলতি বছরের ০৩ জানুয়ারি বাগেরহাটের মোংলা উপজেলার সুন্দরবনের শরকির খাল এলাকায় শিকারীদের পাতা একটি ফঁদে আটকা পড়ে একটি বাঘিনী। খবর পেয়ে বন বিভাগের একটি বিশেষায়িত দল পর দিন ৪ জানুয়ারি প্রাণীটিকে উদ্ধার করে।

পরে খুলনার বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসনকেন্দ্রে বাঘিনীটিকে হস্তান্তর করা হয়। গঠন করা হয় পাঁচ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড। সেখানেই চলে চিকিৎসা। মাস পাঁচেক পরে এখন বাঘিনীটি সুস্থ হয়ে উঠেছে।

প্রাণীটির চিকিৎসায় নিবিড় ভাবে যুক্ত বন অধিদপ্তরের ভেটেরিনারি চিকিৎসক হাতেম সাজ্জাত জুলকারনাইন বলেন, 'বাঘিনীটিকে চ্যালেঞ্জিং পরিস্থিতিতে উদ্ধার করতে হয়েছিল। তখন প্রাণীটি ছিল নিস্তেজ, দুর্বল ও ক্ষীণকায়।'

তিনি বলেন, 'বাঘিনীটির সামনের বাঁ পায়ে ৩ ইঞ্চির মতো জায়গায় চামড়া, মাংশ পেশি ও শিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। ফাঁদের রশিতে টানাটানির কারণে ক্ষত হয়ে পঁচন ধরে গিয়েছিল। অ্যান্টিবায়োটিক ও নিয়মিত ড্রেসিংয়ে মার্চ মাসের দিকে ঘা শুকিয়ে আসে। ক্ষত হওয়া স্থানও ভরাট হয়ে লোম গজিয়েছে এখন।'

বন অধিদপ্তরের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বন সংরক্ষক ছানাউল্যা পাটওয়ারী বলেন, 'বাঘের জীবনকাল সর্বোচ্চ ১৫ বছর পর্যন্ত হয়ে থাকে। এই বাঘিনীর বয়স ১০ থেকে ১১ বছর। দীর্ঘ সময় ধরে চিকিৎসার পর বাঘিনীটি হারানো ক্ষিপ্রতা ও গতি ফিরে পেয়েছে। এখন প্রাণীটির ওজন ৮০ কেজির মতো।'

তিনি বলেন, 'সুন্দরবনে ছেড়ে আসার পরও বাঘিনীটির ওপর কীভাবে নজর রাখা যায় এবং পর্যবেক্ষণ করা যায়, সেসব নিয়ে এখন বন কর্মকর্তারা চিন্তা-ভাবনা করছেন। এছাড়া আহত বাঘিনীটি দীর্ঘদিন শিকার ধরেনি। কাজেই এটির শিকারের সক্ষমতা স্বাভাবিকের তুলনায় কমে এসেছে। সেই সঙ্গে প্রাণীটির জীবনকাল শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে। কাজেই বন্য পরিবেশে অন্যান্য পশুর সঙ্গে লড়াইয়ে এটির পেরে ওঠার সম্ভাবনা বেশ কম।'

এ পরিস্থিতিতে সুস্থ হয়ে ওঠার পর বাঘিনীটিকে বুনো পরিবেশে ছেড়ে দেওয়ার পরিবর্তে যেকোনো সাফারি পার্কে রাখার পরামর্শ দেন এই কর্মকর্তা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও বিশিষ্ট বন্য প্রাণী গবেষক এম এ আজিজ বলেন, 'বাঘিনীটি যদি মুক্ত অবস্থায় একদিনও বাঁচতে পারে, সেটা বড় পাওয়া। বাঘিনীটির নিজের বসতিতে বাঁচার ও মৃত্যুর অধিকার আছে। সাফারি পার্কে বন্দি রাখলে প্রাণীটি প্রাকৃতিক মৃত্যুর অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।'

তবে স্যাটেলাইট কলার লাগিয়ে প্রাণীটিকে পর্যবেক্ষণে রাখার মত দিয়েছেন এ বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, 'ভারতের সুন্দরবন অংশে এমন ছয়টি বাঘকে স্যাটেলাইট কলার দেওয়া হয়েছে। সে ক্ষেত্রে এটিকেও প্রযুক্তির আওতায় আনা যেতে পারে।'

বন অধিদপ্তরের খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক ইমরান আহমদ বলেন, '২০২৪ সালে ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ে বাঘিনীটিকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তিন বার শনাক্ত করা হয়েছিল। সেই হিসাবে লোকালয় থেকে সবচেয়ে দূরের জায়গাটিতে এটিকে অবমুক্ত করার চিন্তা-ভাবনা করা হচ্ছে।'

যেহেতু বাঘিনীটিকে অবমুক্ত করার বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন মতামত উঠে এসেছে, তাই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষটি ধীরে হচ্ছে। তবে চলতি জুনের মধ্যে প্রাণীটিকে অবমুক্ত করার সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে জানান এ কর্মকর্তা। 

এমএ


Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝