একদিকে নদীতে বিষ ঢেলে মাছ শিকার অন্যদিকে প্লাস্টিক দূষণ, বন্যপ্রাণী পাচার, শিল্পবর্জ্য ও ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা বহুমুখী মানবসৃষ্ট হুমকিতে বিপন্ন হয়ে উঠছে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
পরিবেশবিদ ও গবেষকরা বলছেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার সক্ষমতা সুন্দরবনের থাকলেও মানুষের লাগাতার হস্তক্ষেপে বনটির জীববৈচিত্র্য এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
# ১৭ প্রজাতির মাছে মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক
# ৫৫ শতাংশ এলাকা অভয়ারণ্য
# ২২ বছরে ২৭টি অগ্নিকাণ্ড
# প্রায় ৭০ একর বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত
# বন্যপ্রাণী অপরাধে মাত্র ৩০ শতাংশ আসামি গ্রেপ্তার
# মামলার মাত্র ২০ শতাংশ বিচারিক প্রক্রিয়ায় যায়
# ৪০০ মামলার এক-চতুর্থাংশ নিষ্পত্তিতে সময় লেগেছে ৮ বছর
# উপকূলের প্রাকৃতিক ঢাল রক্ষায় জরুরী পদক্ষেপের আহ্বান
বিভিন্ন গবেষণা, সরকারি তথ্য এবং মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সুন্দরবনের নদী-খালে নিয়মিত বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকার, আন্তর্জাতিক বন্যপ্রাণী পাচার চক্রের সক্রিয়তা, মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ, নৌযানের কারণে নদী ভাঙন এবং শিল্পায়নের চাপ বনের পরিবেশগত ভারসাম্যকে মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। একইসঙ্গে ফারাক্কা বাঁধের কারণে উজান থেকে মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় বাড়ছে লবণাক্ততা, যা সুন্দরবনের উদ্ভিদ ও প্রাণীকূলের জন্য নতুন বিপদ ডেকে এনেছে।
এসব কারণেই জাতিসংঘের ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্রের বিজ্ঞানী ও পরিদর্শক দল সুন্দরবনকে ‘বিপদাপন্ন বিশ্ব ঐতিহ্য’ তালিকাভুক্ত করার সুপারিশ করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
নদীতে বিষ, খাদ্য চক্রে বিষ
সুন্দরবনের অভ্যন্তরের বিভিন্ন নদী ও খালে এক শ্রেণির অসাধু জেলে দ্রুত অধিক মাছ পাওয়ার আশায় বিষ প্রয়োগ করছে। এতে শুধু বড় মাছ নয়, মাছের পোনা, কাঁকড়া, চিংড়ি এবং অসংখ্য জলজ প্রাণী মারা যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিষাক্ত পানি নদী ও খালের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে পুরো খাদ্য শৃঙ্খলকে আক্রান্ত করছে। বিষাক্ত মাছ মানুষের খাদ্য তালিকায় প্রবেশ করায় জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকিও বাড়ছে। একইসঙ্গে বনের বন্যপ্রাণী ও জলজ প্রাণীর প্রজনন চক্র ব্যাহত হচ্ছে।
মাছে মিলছে মাইক্রোপ্লাস্টিক
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় সুন্দরবনসংলগ্ন মোংলা, পশুর ও রূপসা নদীর ১৭ প্রজাতির মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে হরিণা চিংড়িতে সর্বোচ্চ মাত্রায় মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া গেছে।
ব্রাজিলের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়সহ সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ গবেষণায় বলা হয়েছে, এসব মাইক্রোপ্লাস্টিক মানবদেহে প্রবেশ করে ক্যান্সার, লিভারের জটিলতাসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্য ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। পাশাপাশি জলজ পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
পাচার চক্রের নিশানায় বাঘ-হরিণ
সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ, কচ্ছপ ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী পাচারে আন্তর্জাতিক চক্র সক্রিয় রয়েছে।
ওয়ার্ল্ড কনজারভেশন সোসাইটি (ডব্লিউসিএস)'র গবেষণায় দেখা গেছে, বন্যপ্রাণী সংক্রান্ত অপরাধের মাত্র ৩০ শতাংশ ঘটনায় আসামি গ্রেপ্তার হয়। এর মধ্যে মাত্র ২০ শতাংশ ক্ষেত্রে মামলা হয়।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, প্রায় ৪০০ মামলার এক-চতুর্থাংশ নিষ্পত্তি হতে আট বছর সময় লেগেছে। দীর্ঘ বিচার প্রক্রিয়া ও কম সাজা অপরাধীদের উৎসাহিত করছে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
অভয়ারণ্যেও থামছে না শিকার
সুন্দরবনের প্রায় ৫৫ শতাংশ এলাকা অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষিত। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, অসাধু বন কর্মকর্তা-কর্মচারী ও রাজনৈতিক ভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সহায়তায় নিষিদ্ধ এলাকাগুলোতেও মাছ শিকার অব্যাহত রয়েছে।
পরিবেশবাদীদের মতে, এতে অভয়ারণ্যের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হচ্ছে এবং বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল সংকুচিত হয়ে পড়ছে।
লবণাক্ততার আগ্রাসন
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফারাক্কা বাঁধের কারণে উজান থেকে মিঠা পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় সুন্দরবনে লবণাক্ততা ক্রমাগত বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে।
লবণাক্ততার কারণে অনেক গাছপালা মারা যাচ্ছে, প্রজনন ক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে এবং বনের স্বাভাবিক ভারসাম্য পরিবর্তিত হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি সুন্দরবনের অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন গবেষকরা।
নৌযান ও শিল্প দূষণের চাপ
সুন্দরবনের নদীপথে অতীতে একাধিকবার তেল, কয়লা, সার ও ক্লিংকারবাহী জাহাজ ডুবির ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় নদীর পানি দূষিত হয়ে জীববৈচিত্র্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া, ভারী নৌযানের ঢেউয়ে নদী ভাঙন বৃদ্ধি পাচ্ছে, গাছপালা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে এবং শব্দ দূষণে বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। ডলফিনের অভয়ারণ্যও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
বিপন্ন প্রাণীর সংখ্যা বাড়ছে
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা (আইইউসিএন)'র তথ্যমতে, সুন্দরবনের মহাবিপন্ন প্রাণীর তালিকায় রয়েছে রয়েল- বেঙ্গল টাইগার, ভোঁদড়, শকুন ও কচ্ছপ। বিপন্ন প্রাণীর তালিকায় রয়েছে- বানর, মেছো বিড়াল ও উদবিড়াল।
অন্যদিকে সংকটাপন্ন প্রাণীর তালিকায় রয়েছে- বনবিড়াল, বাগদাশ, ইরাবতী ডলফিন এবং শুশুক।
পরিবেশবিদরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আরও অনেক প্রজাতি প্রাণী বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়বে।
২২ বছরে ২৭ বার আগুন
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ২২ বছরে সুন্দরবনে অন্তত ২৭টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রায় ৭০ একর বনভূমি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।
পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, অসাধু মাছ শিকারি এবং কিছু দুর্নীতিগ্রস্ত বন কর্মকর্তার যোগসাজশে এসব অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
সুন্দরবন ও বাংলাদেশ উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক সাংবাদিক শুভ্রসচিন বলেন, 'সুন্দরবনের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি বিষ দিয়ে মাছ ধরা, বন্যপ্রাণী পাচার, শিল্প দূষণ এবং লবণাক্ততার বিস্তার। বিশ্ব ঐতিহ্য এই বন রক্ষায় ব্যর্থ হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে আমাদের জবাবদিহি করতে হবে।'
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, 'টহল ও ড্রোন নজরদারি বাড়ানোর ফলে বিষ প্রয়োগ ও হরিণ শিকার কমেছে। প্লাস্টিক দূষণও আগের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে।'
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়; এটি বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের কোটি মানুষের প্রাকৃতিক সুরক্ষা বলয়। বিষ দিয়ে মাছ শিকার বন্ধ, বন্যপ্রাণী পাচার রোধ, প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণ, শিল্প বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং মিঠা পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা না গেলে বিশ্বের এই অনন্য বনভূমি ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটে পড়বে। সুন্দরবনকে রক্ষা করা মানে শুধু একটি বনকে রক্ষা করা নয়; বরং বাংলাদেশের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী লায়ন ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, 'নিয়মিত টহল ও ড্রোন নজরদারির কারণে চলতি মৌসুমে সুন্দরবনে কোনো অগ্নিকাণ্ড ঘটেনি। বিষ দিয়ে মাছ শিকারের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট এলাকায় দায়িত্বরত বন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
এমএ