এবারের নির্বাচনে খুলনার ছয়টি সংসদীয় আসনে জয়-পরাজয় নির্ধারণে নারী ভোটাররা বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠলেও পুরুষ প্রার্থীদের বিরুদ্ধে একমাত্র নারী প্রার্থী শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলতে পারেননি। ভোট নিয়ে নারীরা মুখ না খুললেও বিএনপির ‘ফ্যামিলি’, স্বাস্থ্য ও কৃষি কার্ড’ প্রদান প্রতিশ্রুতি তাদের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
বিশেষ করে বিএনপির প্রতিশ্রুতি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রদান নারী ভোটারদের ভাবনায় এসেছে। এ নিয়ে প্রায় প্রতিটি পরিবারে আলাপ-আলোচনা হচ্ছে। খুলনার ছয়টি আসনে ৩৭ জন পুরুষ প্রার্থীর পাশাপাশি একমাত্র নারী প্রার্থী হচ্ছেন জাতীয় পার্টির শামিম আরা পারভীন। তিনি খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) আসন থেকে প্রার্থী হয়েছেন।
নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, খুলনার ছয়টি সংসদীয় আসনে মোট ভোটার ২১ লাখ এক হাজার ৩৩৫ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ১০ লাখ ৫৪ হাজার ৮৭৪ জন এবং পুরুষ ভোটার ১০ লাখ ৪৬ হাজার ৪৩২ জন। অর্থাৎ পুরুষ ভোটারের তুলনায় নারী ভোটারের সংখ্যা আট হাজার ৪৪২ জন বেশি।
# পুরুষ তুলনায় নারী ভোটার ৮ হাজার ৪৪২ বেশি।
# একমাত্র নারী প্রার্থী শামিম আরা আলোচনায় এলেও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসতে পারেননি।
এর আগে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনার ছয়টি আসনে ১০টি দলের ও স্বতন্ত্রসহ ৩৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। যার মধ্যে নারী প্রার্থী ছিলেন মাত্র দু'জন।
নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, খুলনার ছয়টি আসনে বিএনপির ছয় জন, জামায়াতে ইসলামীর পাঁচ জন এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পাঁচ জন প্রার্থী রয়েছেন। খেলাফতে মজলিস একটি আসনে, জাতীয় পার্টি চারটি আসনে এবং সিপিবি তিনটি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। ইসলামী ফ্রন্ট, জেএসডি, বাসদ, বাংলাদেশ মাইনরিটি জাতীয় পার্টি, গণঅধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ সমঅধিকার পরিষদ ও এনডিএম একটি করে আসনে প্রার্থী দিয়েছে। অন্যরা স্বতন্ত্র প্রার্থী। এসব প্রার্থীর মধ্যে জাতীয় পার্টির একজন নারী প্রার্থী ভোটের মাঠে রয়েছেন। তিনি খুলনা-৫ আসনে জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী শামিম আরা পারভীন। যাচাই-বাছাইয়ে তাঁর মনোনয়নপত্র বাতিল হলেও পরে আদালতের মাধ্যমে প্রার্থিতা ফিরে পান তিনি।
খুলনা-৫ জেলার সবচেয়ে বড় সংসদীয় আসন। এই আসনে মোট ভোটার চার লাখ দুই হাজার ৭৯৮ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার দুই লাখ তিন হাজার ৪৪৩ জন এবং পুরুষ ভোটার এক লাখ ৯৯ হাজার ৩৫৪ জন। এই আসনেও পুরুষের চেয়ে নারী ভোটারের সংখ্যা চার হাজার ৮৯ জন বেশি।
এ আসনে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার ও ধানের শীষ প্রতীকে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সাবেক সভাপতি মোহাম্মদ আলী আসগার লবীর মধ্যে তুমুল লড়াইয়ের আভাস পাওয়া গেছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতায় উঠে আসতে না পারলেও একমাত্র নারী প্রার্থী হিসেবে শামিম আরা পারভীন বেশ আলোচনায় এসেছেন।
এর আগেও সংসদ নির্বাচন করার অভিজ্ঞতা আছে তাঁর। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নড়াইল-১ (নড়াইল সদর-কালিয়া) আসন থেকে জাতীয় পার্টির (জেপি) প্রার্থী হিসেবে বাইসাইকেল প্রতীকে নির্বাচন করেছিলেন শামিম আরা পারভীন। সে নির্বাচনে তিনি মোট ৫১৫ ভোট পেয়েছিলেন।
খুলনা-৫ আসনে প্রার্থী হলেও শামিম আরা পারভীন খুলনা নগরীর সোনাডাঙ্গা থানার বাসিন্দা। এ কারণে ওই আসনের ভোটারদের কাছে তিনি তেমন পরিচিত নন। তিনি ডেইলি অবজারভারকে বলেন, 'আমি খুলনা-২ আসন থেকে নির্বাচন করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পরে দলের সিদ্ধান্তে খুলনা-৫ আসন থেকে প্রার্থী হয়েছি। তিনি জাতীয় শ্রমিক পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির মহিলাবিষয়ক সম্পাদক, খুলনা মহানগর শ্রমিক পার্টির আহ্বায়ক এবং খুলনা জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি।'
শামিম আরা পারভীন বলেন, 'ডুমুরিয়া এলাকার মানুষের প্রধান সমস্যা নদীভাঙন, কৃষি ও মৎস্য খাতের বিপর্যয়। এসব সমস্যা নিরসনের পাশাপাশি আমি নির্বাচিত হলে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা মানুষের দোরগোঁড়ায় পৌঁছে দিতে কাজ করব। নারীদের উন্নয়ন ও সবার কর্মসংস্থানের বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছি। আমার দল ক্ষমতায় এলে মসজিদের ইমামদের বেতনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।এলাকায় নতুন প্রার্থী হিসেবে ভোটারদের মধ্যে বেশ সাড়া পাচ্ছি। আমার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা শক্তিশালী হলেও জয়ের জন্য আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাব।'
এদিকে, গত দুই দিন ধরে গ্রামাঞ্চলের নারী ভোটারদের মাঝে বিএনপির চেয়ারপার্সনের দেওয়া ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রতিশ্রুতি বেশ সাড়া ফেলেছে। অনেক নারী ভোটার এটিকে পজেটিভ হিসেবে নিয়েছেন। ফলে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রতিশ্রুতি ভোটের হিসাব নিকাশ বদলে দিতে পারে।
বটিয়াঘাটার সবুজ পল্লীর বিধাবা সালেহা বেগম ডেইলি অবজারভারকে বলেন, 'আমি বয়স্ক ভাতা পাচ্ছি। ফ্যামিলি কার্ড পেলে বড় উপকার হয়।'
ক্যান্সারে আক্রান্ত এই নারী ভোটার বলেন, 'ফ্যামিলি কার্ড পাওয়ার জন্য আমি ভোট দিতে যাব।'
এই এলাকার অবসরপ্রাপ্ত বিজিবির কর্মকর্তা আবুর রাজ্জাকের স্ত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডেইলি অবজারভারকে বলেন, 'খুলনা-১ আসনে বসবাস করলেও তিনি ২ আসনের ভোটার।' ভোট দেব, কিন্তু ভোটের পর ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পাব তো, প্রশ্ন রাখেন তিনি।
খুলনা-৩ আসনের ভোটার রিকশাচালক আনসার আলী খলিশপুর জুট মিলে চাকরি করতেন। এই শ্রমিক বলেন, 'মিল বন্ধ হওয়ার পর পরিবার-পরিজন নিয়ে কষ্টে আছি। এখন মিল চালু করার প্রতিশ্রুতি পাচ্ছি, ফ্যামিলি কার্ডও দেবে। এ কারণেই ভোট কেন্দ্রে যাব।'
এছাড়াও খুলনা-২, ৪ ও ৫ আসনের অনেক নারী ভোটারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিষয়টি মাথায় রাখছেন। তবে তারা কোন প্রার্থীকে ভোট দেবেন তা সরাসরি বলেননি।
খুলনা-২ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি খুলনা মহানগরের সাবেক সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, 'দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান নারীদের কর্মসংস্থানের বিষয়টি নির্বাচনী প্রচারণায় প্রাধান্য দিয়েছেন। ‘শুধু ফ্যামিলি কার্ডই নয়; নারীর কর্মসংস্থান, নারীর মর্যাদা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি সেক্টরগুলোতেও উন্নত করার উপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এ কারণেই নারী ভোটাররা বিএনপির দিকেই ঝুঁকছে।'
নারী সমাজের বড় অংশই ‘ধানের শীষে’ ভোট দেবে বলে তিনি মনে করেন।
এমএ