মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের অভ্যন্তরে ত্রিমুখী সংঘাতের জেরে সীমান্ত জুড়ে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয়েছে। বোমা, গুলি, স্থলমাইন বিস্ফোরণ এবং রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠির অনুপ্রবেশ এই উদ্বেগকে বহুগুণ বাড়িয়েছে।
এর মধ্যে সীমান্ত দিয়ে আরও ৪ জন রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠির সদস্য পালিয়ে অনুপ্রবেশ করেছে। এ নিয়ে অনুপ্রবেশকারী সশস্ত্র গোষ্ঠির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৭ জন। সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত তারা টেকনাফ থানা পুলিশের হেফাজতে রয়েছে বলে জানিয়েছেন কক্সবাজার জেলা পুলিশের মিডিয়া ফোকাল পয়েন্ট ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অলক বিশ্বাস।
তিনি জানান, রবিবার ৫৩ জন এবং সোমবার সকালে আরও ৪ জন পালিয়ে এসেছে। এদের মধ্যে একজন আহত রয়েছেন এবং তাকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এ ঘটনায় বিজিবির পক্ষে একটি মামলা দায়ের প্রক্রিয়াধীন। মামলা দায়েরের পর ৫৭ জনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
স্থলমাইনে পা হারানো যুবক চমেকে
সোমবার সকাল দশটায় কক্সবাজারের টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্তে মাইন বিস্ফোরণে আবু হানিফ নামের এক যুবকের বাম পা বিচ্ছিন্ন হয়েছে।
ঘটনাস্থল ছিল টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং ইউনিয়নের লম্বাবিল সীমান্তে, নাফ নদীর শাহজাহানের দ্বীপ ও হাঁসের দ্বীপের মাঝামাঝি।
আহত আবু হানিফ (২২) লম্বাবিল এলাকার ফজল করিমের ছেলে। পেশায় সে মৎস্যজীবি।
আহতের বাবা ফজল করিম বলেন, সকালে তার ছেলে নাফ নদীর বাংলাদেশ অংশে ছোট দ্বীপ শাহজাহানের দ্বীপে মাছ ধরতে যায়। এক পর্যায়ে নদীতে নামলে আকস্মিক বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে আবু হানিফ গুরুতর আহত হন। বিস্ফোরণে তার বাম পায়ের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, অন্য পা সামান্য আঘাতপ্রাপ্ত হয়। ধারণা করা হচ্ছে, এটি আরাকান আর্মির পুঁতে রাখা স্থলমাইনের বিস্ফোরণ।
তিনি জানান, স্থানীয়রা আহত আবু হানিফকে উদ্ধার করে উখিয়ার কুতুপালং এমএসএফ হাসপাতালে নিয়ে যান। প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাকে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। সেখান থেকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা শেষে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
গুলিবিদ্ধ শিশু সংকটাপন্ন
হোয়াইক্যং সীমান্ত এলাকায় রবিবার সকালে মিয়ানমার থেকে ছোড়া গুলিতে আহত বাংলাদেশি শিশুটির অবস্থা আশঙ্কাজনক। বর্তমানে সে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)-এ চিকিৎসাধীন।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তসলিম উদ্দিন জানান, শিশুটি লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। সোমবার দুপুর ২টায় তিনি বলেন, “রবিবার রাতে শিশুটির অপারেশন করা হয়েছে। তবে, মাথায় লাগা গুলি বের করা যায়নি। গুলি এমন এক জায়গায় স্থিত যে বের করলে রক্তক্ষরণের কারণে মৃত্যু ঘটতে পারে।”
শিশুটিকে আইসিইউতে ভেন্টিলেশনে রাখা হয়েছে। আশার কথা হলো, গতকাল থেকে আজ তার শারীরিক অবস্থায় কিছুটা উন্নতি হয়েছে।
রোববার (১১ জানুয়ারি) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের তেচ্ছিব্রিজ এলাকায় আফনান আরা (১২) গুলিবিদ্ধ হন। একই ঘটনায় আরও একজন আহত হয়েছেন।
আহত আফনান আরা তেচ্ছিব্রিজ গ্রামের জসিম উদ্দিনের মেয়ে। প্রথমে গুলিতে নিহত হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লেও পরে জানা যায়, সে বেঁচে আছে। বিকেলে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হলে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)-তে রাখা হয়।
সীমান্তবাসির মানববন্ধন
বোমা, গুলি, স্থলমাইন বিস্ফোরণ এবং রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠির অনুপ্রবেশের প্রতিবাদে টেকনাফে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়।
সোমবার বেলা ১১টার দিকে টেকনাফের হোয়াইক্যং তেচ্ছিব্রিজ হাইওয়ে সড়কে আয়োজিত মানববন্ধনে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করেন। মানববন্ধনে অংশগ্রহণকারীরা মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকায় নির্বিচার গুলিবর্ষণের তীব্র নিন্দা জানান এবং অবিলম্বে হামলা বন্ধের দাবি জানান।
মানববন্ধনে মো. আলম বলেন, “একজন নিরীহ শিশুর ওপর সীমান্তের ওপার থেকে গুলি এসে লাগা চরম মানবতাবিরোধী কাজ। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠীর এমন কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।”
আরেক বক্তা আলী হোসেন বলেন, “সীমান্ত এলাকায় বসবাসকারী সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছে। বিশেষ করে শিশু ও নারী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে। দ্রুত কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া জরুরি, যাতে সীমান্তে স্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করা যায়।”
মানববন্ধনে আহত শিক্ষার্থী হুজাইফা সুলতানা আফনানের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা, তার পরিবারের পাশে দাঁড়ানো এবং ভবিষ্যতে নিরীহ মানুষ যেন আর হামলার শিকার না হয়, সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানানো হয়।
উপস্থিত অন্যান্য বক্তারা জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, যাতে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত বাংলাদেশে এসে নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটাতে না পারে।
আহত শিক্ষার্থীর পিতা জসিম উদ্দিন বলেন, “গত রবিবার আমার মেয়ে খেলতে বের হওয়ার সময় মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠীর গুলি এসে মাথায় লাগে। বর্তমানে সে চমেক হাসপাতালে আইসিইউতে ভর্তি। তার সুচিকিৎসা এবং সরকারের সহযোগিতা কামনা করছি।”
সীমান্তে দায়িত্বে থাকা বিজিবির সংশ্লিষ্টদের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তারা সাড়া দেয়নি।
সীমান্তবাসি জানাচ্ছেন, দেশটির বিদ্রোহী গোষ্ঠি আরাকান আর্মির আস্তানা ঘিরে দেশটির সেনা বাহিনী বিমান ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠির সদস্যরা সেনা বাহিনীর পক্ষে স্থলভাগে আরাকান আর্মির সঙ্গে সংঘাত করছে।
এসইউ/আরএন