উত্তরাঞ্চলের সীমান্তঘেঁষা জেলা পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ। দেবীগঞ্জের বুক চিরে বহমান করতোয়া নদীর বালু দেশের নির্মাণ শিল্পে এক সুপরিচিত নাম। এ নদীতে পাওয়া যায় উচ্চমানের বালু, যা কংক্রিট, ব্লক, মর্টারসহ বিভিন্ন নির্মাণ কাজে অত্যন্ত উপযোগী। প্রতিদিন এখান থেকে শত শত ট্রাকভর্তি বালু যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
পঞ্চগড় জেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, গত ১১ নভেম্বর করতোয়া নদীর এই বালু জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতির জন্য শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর চিঠি দিয়েছেন জেলা প্রশাসক। চিঠিতে করতোয়া নদীর বালুর বিশেষ গুণাগুণ, সূক্ষ্ম দানার গঠন, উজ্জ্বলতা এবং বিশুদ্ধ সিলিকা উপাদানের বিভিন্ন বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে।
>> শত শত শ্রমিকের জীবিকা নির্ভর এখানে
>> দৈনিক প্রায় অর্ধ কোটি টাকার লেনদেন
>> প্রতিদিন কাজ করছেন প্রায় ১২০০ শ্রমিক
>> এখানকার বালু জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতির জন্য চিঠি দিয়েছে জেলা প্রশাসন
উপজেলা প্রকৌশলী মো. শাহরিয়ার ইসলাম শাকিল বলেন, 'দেবীগঞ্জে যে বালু পাওয়া যায় তা অত্যন্ত ভালো মানের। এখানকার বালু সাধারণত ২.২০ - ২.৫০ এফ.এম (ফাইননেস মডুলাস) আকৃতির। এই বালু যেকোনো কনট্রাকশন এবং হায়ার স্ট্রেন্থ কংক্রিট কাজের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। পাঠ্যপুস্তকে এখানকার বালু 'ডোমার স্যান্ড' নামে প্রসিদ্ধ।'
সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলার করতোয়া নদীর সংলগ্ন দেবীডুবা, দেবীগঞ্জ এবং তেলিপাড়া- এই তিনটি বালু মহাল থেকেই মূলত বালু উত্তোলন ও পরিবহনের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
বালু শ্রমিকরা কোমর সমান পানিতে নেমে টুকরিতে করে বালু নৌকায় তোলেন। নৌকা বোঝাই বালু নিয়ে তুলে দেন নদীর চরে অপেক্ষমাণ ট্রাক্টরে। পরে ট্রাক্টরে নিয়োজিত শ্রমিকরা সেই বালু নিয়ে আসেন ডাম্পিং ইয়ার্ডে। সেখানে অপেক্ষমাণ ট্রাকে বালু লোড করে পাঠানো হয় ঢাকা, ফরিদপুর, বগুড়া, রংপুর, চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে।
প্রতিদিন ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দেবীগঞ্জের বিভিন্ন বালু মহালে চলে বালু উত্তোলন, পরিবহনের এবং লোডের ব্যস্ততা। শ্রমিকদের নদী থেকে বালু তোলা, ট্রাকে লোড, পরিমাপ ও অন্যান্য কার্যক্রমকে ঘিরে পুরো এলাকা থাকে কর্মচাঞ্চল্যে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিদিন প্রায় তিন শতাধিক ট্রাক দেবীগঞ্জ থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বালু পরিবহন করে।
সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, উপজেলার তিনটি বালু মহালে অন্তত দেড় শতাধিক নৌকায় প্রায় ৬০০ শ্রমিক কাজ করেন। প্রতিটি নৌকায় থাকে ৫-৬ জন শ্রমিক।
নৌকায় বালু উত্তোলনের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিক আশরাফুল ইসলাম বলেন, 'ট্রাক্টরপ্রতি তারা পান ৪০০ টাকা। প্রতিদিন ১০-১২ ট্রাক্টর বালু তুলতে পারেন তারা। দিনে তিনি ভাগে পান ১০০০-১২০০ টাকা। নৌকার মোট আয় সমান ভাগে ভাগ করে নেন তারা।'
এদিকে, প্রতিদিন প্রায় ৯০টি ট্রাক্টর ডাম্পিং ইয়ার্ডে বালু পরিবহন কাজে নিয়োজিত থাকে। প্রায় ৩৫০ জন ট্রাক্টর শ্রমিকের নিত্যদিনের কর্মস্থল হলো দেবীগঞ্জের এই তিনটি বালু মহাল। দৈনন্দিন বালু লোড-আনলোডের এই বৃহৎ কর্মকাণ্ড ঘিরে বালুর ডাম্পিং ইয়ার্ডে গড়ে উঠেছে ছোট ছোট বাজার। পাকুরীতলা, ব্রিজপাড়, বটতলা এসব বাজার জমে উঠেছে বালু শ্রমিকদের কেন্দ্র করে। এসব হাটবাজারে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে নিত্যপণ্যের বেচাকেনা হয়।
ডাম্পিং ইয়ার্ডে ট্রাকে বালু লোডের কাজ করেন দুই শতাধিক শ্রমিক। সম্প্রতি এসব কুলি শ্রমিকরা স্কাভেটর দিয়ে বালু লোড করিয়ে নিজেদের মজুরি আদায় করছেন। স্কাভেটরের ভাড়াটাও তারাই পরিশোধ করেন।
কুলি শ্রমিক সাবদার হোসেন বলেন, 'আমরাই ট্রাকে পুরো বালু লোড করি। মাঝে মাঝে ভেকু (স্কাভেটর) দিয়ে কিছুটা লোড করাই, বাকিটা আমরা সুন্দর করে সাজিয়ে দিই, যেন নির্বিঘ্নে বালু গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে। প্রতিদিন আমরা ৮০০-৯০০ টাকা মজুরি পাই।'
ইজারাদার আবুল বাশার বলেন, 'উপজেলার তিনটি বালু মহালে নৌকা শ্রমিক, ট্রাক্টর শ্রমিক, কুলি শ্রমিক, ট্রাক ভাড়া, বালুর দাম সব মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় অর্ধ কোটি টাকার লেনদেন হচ্ছে।'
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) উপজেলার সাধারণ সম্পাদক নাজমুস সাকিব মুন বলেন, 'সঠিক পরিকল্পনা, পরিবেশবান্ধব উত্তোলন পদ্ধতি ও সরকারি তদারকি নিশ্চিত করা গেলে পঞ্চগড়ের বালু শিল্প অঞ্চলটির অর্থনীতিকে আরও সমৃদ্ধ করবে। নদী রক্ষা ও নিরাপদ উত্তোলন নিশ্চিত হলে বালু শিল্প হতে পারে জেলার অন্যতম রাজস্বখাত।'
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদুল হাসান বলেন, 'দেবীগঞ্জের অর্থনীতিতে এখানকার বালু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এটি দেবীগঞ্জের জন্য প্রকৃতির এক বড় আশীর্বাদ। করতোয়া নদীর এই বালু জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেতে আমরা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দিয়েছি। বালুকে কেন্দ্র করে কোনো শিল্প কারখানা স্থাপন করা সম্ভব কি না, সে বিষয়ে গবেষণা ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্যও আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।'
এইচসি/এমএ