আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি ও বিশ্ব অর্থনীতির সমকালীন রূপান্তরে এশিয়ার উদীয়মান অর্থনৈতিক বলয়গুলোর মধ্যে দ্বিপক্ষীয় কৌশলগত অংশীদারত্ব এক নতুন বার্তা বহন করছে। টোকিওর ঐতিহাসিক ‘কান্তেই’—জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত শীর্ষ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকটি কেবল কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতার কোনো ফ্রেমওয়ার্ক ছিল না; বরং তা ছিল একবিংশ শতাব্দীর উদীয়মান অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও ভূকৌশলগত প্রয়োজনের এক দূরদর্শী উত্তর।
২৭ অক্টোবর মঙ্গলবার, স্থানীয় সময় বেলা সাড়ে ১১টায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির মধ্যে অনুষ্ঠিত এই শীর্ষ বৈঠকটি বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের পঞ্চান্ন বছরের দীর্ঘ পথচলাকে এক নজিরবিহীন উচ্চতায় উন্নীত করার স্পষ্ট দিগদর্শন প্রদান করেছে।
স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭১ সালের বিশ্বমঞ্চে জাপানের দূরদর্শী স্বীকৃতি এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশের দীর্ঘতম ও বিশ্বস্ত উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে উত্থান—এই দুইয়ের ভিত্তি ছিল পারস্পরিক গভীর আস্থা, শ্রদ্ধা ও অভিন্ন সমৃদ্ধির অঙ্গীকার। তৎকালীন প্রেক্ষাপট থেকে আজকের রূপান্তরশীল অর্থনীতিতে এসে দুই দেশের এই আত্মিক সম্পর্ক কেবল প্রথাগত সাহায্য ও সহায়তার বৃত্তে আবদ্ধ নেই; তা রূপান্তরিত হয়েছে সমান অংশীদারত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত এক সর্বাত্মক কৌশলগত ঐক্যে।
বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের শিকড় শুধু বৈশ্বিক কূটনীতির মারপ্যাঁচে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি আত্মিক ও ঐতিহাসিক শ্রদ্ধাবোধের ওপর প্রতিষ্ঠিত। ১৯৭১ সালের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর যেসব প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি বাংলাদেশকে প্রথম সারিতে স্বীকৃতি দিয়েছিল, তাদের অন্যতম সূর্যোদয়ের দেশ জাপান।
এই অনন্য ঐতিহাসিক মেলবন্ধন কেবল অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা পরিণত হয়েছিল দুই দেশের মানুষের হৃদস্পন্দনে। এই সম্পর্কের গভীরতার কথা স্মরণ করতে গিয়ে শীর্ষ বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শ্রদ্ধার সঙ্গে তুলে ধরেন এক ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর অবকাঠামোগত পুনর্গঠন ও বন্ধুত্বের দৃঢ় ভিত্তি তৈরিতে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দুইবার জাপান সফর ছিল এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। পরবর্তীতে সেই ভিত্তিকে আরও সুসংহত, বিস্তৃত ও আধুনিকায়নে কার্যকর ভূমিকা রেখেছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।
পিতা ও মাতার এই কূটনৈতিক দূরদর্শিতা ও ঐতিহ্যবাহী সুসম্পর্কের ধারাবাহিকতাকে এগিয়ে নিয়ে বর্তমান সরকার দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দিতে অঙ্গীকারবদ্ধ। পারস্পরিক শ্রদ্ধা, শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং আস্থার এই অক্ষই আজ দুই দেশকে ভবিষ্যতের দিকে একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার আত্মবিশ্বাস জোগাচ্ছে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক গ্রাফ আজ বৈশ্বিক অর্থনীতিবিদদের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু। বৈঠকে উপস্থাপিত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ বর্তমানে কেবল একটি আঞ্চলিক বাজার নয়, বরং বিশ্ব উৎপাদন ও সরবরাহের প্রধান কেন্দ্র বা গ্লোবাল ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যান্ড ইকোনমিক হাবের রূপান্তরিত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে রয়েছে।
এই অভূতপূর্ব প্রবৃদ্ধির সুফল ঘরে তুলতে হলে প্রয়োজন বিশ্বমানের প্রযুক্তি, প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং টেকসই অবকাঠামো। এখানেই জাপানি অভিজ্ঞতা ও অর্থায়নের সংযোগ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
বাংলাদেশ কেবল আমদানিনির্ভর বাজার হিসেবে নয়, বরং আন্তর্জাতিক সাপ্লাই চেইনের একটি নির্ভরযোগ্য উৎপাদক ও রপ্তানিকারক কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এই বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বাস্তবায়নে জাপান সরকার এবং দেশটির গতিশীল বেসরকারি খাতকে আরও বেশি সক্রিয় ও বৃহৎ পরিসরে সম্পৃক্ত হওয়ার আহ্বান আজ সময়েরই দাবি।
২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তা অর্থনীতিতে পরিণত হতে পারে এবং ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কায়িক শ্রমনির্ভর প্রথাগত অর্থনীতির যুগ অতিক্রম করে বাংলাদেশ আজ পা রাখছে জ্ঞানভিত্তিক ও প্রযুক্তিচালিত এক নতুন যুগে। এই নতুন যাত্রার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও দূরদর্শী প্রস্তাবনা হলো বাংলাদেশ-জাপান টেক পার্ক প্রতিষ্ঠা।
এই প্রস্তাবিত টেক পার্ক কেবল কয়েকটি ভবনের সমষ্টি নয়; এটি হবে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে বাংলাদেশের তরুণ মেধাবী সমাজ, স্টার্টআপ উদ্যোক্তা এবং দক্ষ আইটি জনশক্তিকে জাপানি বিনিয়োগকারী, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত করার প্রধানতম সেতু।
প্রস্তাবিত এই টেক পার্কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনের মতো খাতগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা তুলে ধরা হয়েছে।
এই প্রযুক্তিবলয়ের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান কাঠামোর সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছাতে বাংলাদেশের নজর এখন মহাকাশ গবেষণা ও প্রযুক্তির দিকে। মহাকাশবিজ্ঞান, স্যাটেলাইট প্রকৌশল এবং উন্নত গবেষণাগার তৈরিতে জাপানের বহু বছরের অর্জিত সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে যৌথ স্যাটেলাইট গবেষণা ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে যাচ্ছে।
একটি দেশের টেকসই প্রবৃদ্ধির গতি নির্ভর করে তার যোগাযোগ ও পরিবহন কাঠামোর সক্ষমতার ওপর। বাংলাদেশ তার সামগ্রিক অর্থনীতিকে আরও গতিশীল ও উৎপাদনশীল করতে দেশের ছয়টি প্রধান বিভাগীয় শহরকে যুক্ত করে দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক এবং দেশব্যাপী উড়ালসড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
এসব বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের পরিকল্পনা প্রণয়ন, কারিগরি সহায়তা, বিনিয়োগ ও অর্থায়নে জাপানের সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে। জাপানের বিশ্বখ্যাত হাই-স্পিড ট্রেন প্রযুক্তি এবং আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থার যুগান্তকারী অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের এই রূপকল্প বাস্তবায়নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করতে পারে।
একই সঙ্গে জ্বালানি, অবকাঠামো এবং তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতে জাপানি বেসরকারি খাত থেকে এক ট্রিলিয়ন জাপানি ইয়েন বিনিয়োগের রূপরেখা ও পরিকল্পনা নিয়ে অত্যন্ত ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।
বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ উন্নয়নে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, করনীতি, শুল্কছাড়করণ এবং অর্থ স্থানান্তর প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, পূর্বানুমানযোগ্যতা ও দক্ষতা বাড়াতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি দ্রুত কার্যকর করার মাধ্যমে এ চুক্তির সুফল দুই দেশের জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে উভয় পক্ষকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
টেকসই শিল্পায়ন এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হলো নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ। বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের এই অস্থির সময়ে বাংলাদেশ তার জ্বালানি খাতকে নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
এশীয় অঞ্চলের জ্বালানি নিরাপত্তা সুসংহত করতে জাপান কর্তৃক গৃহীত ‘পার্টনারশিপ ফর পাওয়ার এশিয়া’ উদ্যোগের আওতায় সাম্প্রতিক ৫০ বিলিয়ন জাপানি ইয়েনের জরুরি সহায়তা ঋণ বাংলাদেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের অবকাঠামো, দক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদন ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ ও অংশগ্রহণ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত কৌশলগত হওয়ায় জাতিসংঘ, ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল এবং আন্তর্জাতিক আইন সমুন্নত রাখার বিষয়ে বাংলাদেশ ও জাপানের অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি আজ স্পষ্ট।
একটি অবাধ, উন্মুক্ত, শান্তিপূর্ণ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পুনর্ব্যক্ত করে আঞ্চলিক যোগাযোগ, অবাধ বাণিজ্যপ্রবাহ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্বার্থে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের নির্বাচনে জাপানের সমর্থনের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়েছে এবং তাঁর সভাপতিত্বে বহুপাক্ষিক সহযোগিতা জোরদার করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করা হয়েছে।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও সহিংসতা এবং এর ফলে সৃষ্ট রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুতি সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সব ধরনের সহিংসতা বন্ধ, নির্বিঘ্নে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সংলাপের আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে যে, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধান মিয়ানমারেই নিহিত এবং রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে দ্রুত নিজ দেশে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য বাংলাদেশের মানবিক প্রচেষ্টায় জাপানের সহযোগিতার প্রশংসা করার পাশাপাশি রাখাইনে শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে জাপানের সক্রিয় সম্পৃক্ততা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।
দুই দেশের অগ্রাধিকারভিত্তিক খাত চিহ্নিত করা, সহযোগিতার বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করা এবং সম্ভাবনাগুলোকে কার্যকর উদ্যোগে রূপ দিতে মন্ত্রী পর্যায়ের একটি যৌথ কমিশন প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করা হয়েছে।
সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আশাপ্রকাশ করেন যে, ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার পাশাপাশি এ শীর্ষ বৈঠক দুই দেশের সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে এবং এ সম্পর্ক আরও গভীর আস্থা, বিস্তৃত অর্থনৈতিক সহযোগিতা, শক্তিশালী বিনিয়োগ সম্পর্ক এবং শান্তি, স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির অভিন্ন অঙ্গীকারের ভিত্তিতে গড়ে উঠবে।
মহান আল্লাহ সুবহানা তায়ালা আমাদের সহায় হোন।
এসএস