ইতিহাস তার আপন গতিতেই বারবার নতুন রূপে আবির্ভূত হয়। নদীর জলধারা যে সীমানাকে একসময় পৃথক করেছিল, ভৌগোলিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই নদীই আবার দুই ভূখণ্ডের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সেতু হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এবং পরবর্তী ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ফলে বঙ্গোপসাগরমুখী যে ঐতিহাসিক জলপথগুলো স্থবির কিংবা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল, দীর্ঘ সাত দশক পর তা আবার পুনরুজ্জীবিত হতে শুরু করেছে।
গত ৫ অক্টোবর (সোমবার) আসামের ডিব্রুগড়ের বগিবিল টার্মিনাল থেকে ৫৪০ টন মিথানল নিয়ে একটি বার্জ ঢাকার পানগাঁও অভ্যন্তরীণ নৌবন্দরের উদ্দেশে রওনা হওয়ার মধ্য দিয়ে ভারত-বাংলাদেশের উপযোগিতা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। এটি কেবল একটি সাধারণ রাসায়নিক পণ্যের চালান নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও পূর্ববঙ্গের ঐতিহাসিক আঞ্চলিক সংযোগের এক রূপান্তর মূলক মাইলফলক।
উত্তর-পূর্ব ভারতের বাণিজ্য ইতিহাসে ব্রহ্মপুত্র নদ কেবল একটি প্রবাহমান জলধারা ছিল না, ছিল প্রধান অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি। উনিশ শতকে পূর্ব ভারতের অন্যতম ব্যস্ত ও সমৃদ্ধ নদীবন্দর ছিল ডিব্রুগড়। ১৮৫৬ সাল থেকেই ব্রিটিশ আমলে কলকাতা ও ডিব্রুগড়ের মধ্যে নিয়মিত স্টিমার সার্ভিসের মাধ্যমে চা, কাঠ এবং যাত্রী পরিবহন চলত। তখনকার সময় থেকেই এটি ছিল ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চল ও বাকি বিশ্বের যোগাযোগের মূল মাধ্যম।
তবে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ এই বহমান ধারায় প্রথম বড় আঘাত হানে, যার ফলে রাজনৈতিক সীমানার টানাপোড়েনে স্বাভাবিক বাণিজ্য যোগাযোগ বাধাগ্রস্ত হয়। এরপর ১৯৫০ সালের আগস্ট মাসে আসামে যে বিধ্বংসী শক্তিশালী ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছিল, তা ব্রহ্মপুত্র নদ ও এর আশপাশের নদীব্যবস্থার তলদেশ সম্পূর্ণ বদলে দেয়। নদীগুলোর গভীরতা হ্রাস পায়, পলি জমে নাব্যতা হারায় এবং জলপথের নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়ে। ফলস্বরূপ, ডিব্রুগড় থেকে বাণিজ্যিক নৌচলাচল ক্রমে থমকে যায় এবং ১৯৫৪ সালে পণ্য বুকিং বন্ধ করার পর অবশেষে ১৯৫৬ সালের ১৫ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ হয়ে যায় ডিব্রুগড়ের ঐতিহাসিক নৌঘাটটি।
পরবর্তী দশকগুলোতে সড়ক ও রেলপরিবহনের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্রহ্মপুত্রের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ব্যবহার কার্যত থমকে যায়। সত্তরের দশক থেকে ভারত-বাংলাদেশ প্রটোকল রুট থাকলেও তা মূলত আসামের নিম্নভাগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এবং সুদূর ঊর্ধ্ব আসামের ডিব্রুগড় পর্যন্ত এই পথ পুনরুজ্জীবিত হতে দীর্ঘ ৭০ বছর সময় লেগে যায়।
দীর্ঘ সাত দশকের স্থবিরতা ভেঙে ৫ অক্টোবর আসামের বগিবিল থেকে যে আন্তর্জাতিক যাত্রার সূচনা হয়েছে, তা কৌশলগত ও অবকাঠামোগতভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতের কেন্দ্রীয় বন্দর, জাহাজ চলাচল ও নৌপথবিষয়ক মন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল বগিবিল থেকে ‘ডিএলবি পাতকাই’ নামের পণ্যবাহী বার্জটির আনুষ্ঠানিক যাত্রা উদ্বোধন করেন। শক্তিশালী টাগবোট ‘কুশল কোনওয়ার’-এর সাহায্যে এটি ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করেছে। এ ছাড়া উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অনলাইনে যুক্ত ছিলেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা।
এই যাত্রায় আসামের নামরূপে অবস্থিত রাজ্য সরকারের মালিকানাধীন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ‘আসাম পেট্রো-কেমিক্যালস লিমিটেড’ (এপিএল)-এর উৎপাদিত মিথানল বহন করা হচ্ছে। ডিব্রুগড় থেকে ঢাকার পানগাঁও বন্দর পর্যন্ত এই পুরো যাত্রাপথ প্রায় ১,৩০০ কিলোমিটার। বার্জটি ভারতের ন্যাশনাল ওয়াটারওয়ে-২ ধরে আসাম অতিক্রম করে বাংলাদেশ সীমান্তে প্রবেশ করবে এবং এরপর ভারত-বাংলাদেশ ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রানজিট অ্যান্ড ট্রেড প্রটোকল রুট অনুসরণ করে ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও ধলেশ্বরী নদী অতিক্রম করে বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত পানগাঁও অভ্যন্তরীণ নৌবন্দরে নোঙর করবে। বগিবিল থেকে সীমান্ত পর্যন্ত ৭৮৩ কিলোমিটার এবং সেখান থেকে বাংলাদেশের পানগাঁও পৌঁছাতে আনুমানিক সাত থেকে আট দিন সময় লাগবে।
এই বাণিজ্যিক পথ চালুর পেছনে রয়েছে অত্যন্ত উদ্ভাবনী উদ্যোগ ও অবকাঠামোগত প্রস্তুতি। এপিএলের এই মূল ভূমিকার পেছনে ছিল দীর্ঘ ৩০ বছর অচল অবস্থায় পড়ে থাকা দুটি অভ্যন্তরীণ জলপথ পরিবহন বিভাগের জাহাজ। এপিএল কর্তৃপক্ষ অকেজো পড়ে থাকা এই জাহাজ দুটি লিজ নিয়ে গুয়াহাটির পান্ডুঘাটে এনে সম্পূর্ণ পুনর্নির্মাণ ও আধুনিকায়ন করে। সংস্কারের মাধ্যমে এ দুটি জাহাজকে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ভারী পণ্য ও রাসায়নিক পরিবহনের উপযোগী করে তোলা হয়। প্রতিটি জাহাজে ২৭টি করে কনটেইনার পরিবহনের ব্যবস্থা করা হয়েছে, যেখানে প্রতিটি কনটেইনারে ২০ টন করে মিথানল থাকবে; অর্থাৎ দুই জাহাজে দুই দফায় মোট ১,০৮০ টন মিথানল বাংলাদেশে আসবে, যার প্রথম চালান ৫৪০ টন ইতোমধ্যে পথিমধ্যে রয়েছে।
পাশাপাশি বগিবিল ইনল্যান্ড ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট টার্মিনালটিকে দ্রুত আন্তর্জাতিক কার্গো ডকিং ও ব্যবস্থাপনার উপযোগী করে সাজানো হয়েছে, যেখানে আধুনিক জেটি, স্টোরেজ বা গুদাম এবং দ্রুত কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। রাতে নিরাপদে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলের উদ্দেশে লাইটহাউস স্থাপনের কাজ চলছে এবং সামগ্রিক ট্রাফিক পরিচালনার জন্য একটি রিজিওনাল সেন্টার অব এক্সিলেন্স তৈরি করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান শিল্পায়নের সঙ্গে কাঁচামাল হিসেবে মিথানলের চাহিদা দিনদিন বাড়ছে। টেক্সটাইল, ওষুধ, পেইন্টস, ফরমালডিহাইড এবং বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে মিথানল অত্যন্ত আবশ্যকীয় একটি রাসায়নিক উপাদান। এতদিন বাংলাদেশকে মধ্যপ্রাচ্য বা দূরপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে সমুদ্রপথে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও দীর্ঘ সময়সাপেক্ষ প্রক্রিয়ায় মিথানল আমদানি করতে হতো। আসাম থেকে সরাসরি নদীপথে মিথানল আমদানির ফলে সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যয় ও সময় উভয়ই অনেকাংশে কমে আসবে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এই জলপথের সম্ভাবনা কেবল মিথানল পরিবহনে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বগিবিল টার্মিনাল পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর ফলে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন শিল্প ও কৃষিপণ্য যেমন—ব্রহ্মপুত্র ক্র্যাকার অ্যান্ড পলিমার লিমিটেডের প্লাস্টিক ও পেট্রোকেমিক্যাল কাঁচামাল, বিভিন্ন পেট্রোলিয়াম সামগ্রী, কয়লা, বিখ্যাত আসাম চা এবং জিআই ট্যাগপ্রাপ্ত আসামের কাজীনেমু, ভূত জলকিয়া ও গোলমরিচের মতো কৃষিপণ্য বাংলাদেশের বাজার ও বঙ্গোপসাগরভিত্তিক বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশাধিকার পাবে। একইভাবে, এই জলপথ ব্যবহার করে বাংলাদেশও আসাম ও ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে তৈরি পোশাক, প্লাস্টিক পণ্য, প্রসেসড ফুড, সিমেন্ট এবং নির্মাণসামগ্রী কম খরচে পাঠাতে পারবে।
পরিবহন অর্থনীতির আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী, সড়ক বা রেলের তুলনায় জলপথ বহুলাংশে সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই। সড়কপথে যেখানে অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ, যানজট এবং সীমান্ত ক্রসিংয়ে দীর্ঘ বিলম্বের সমস্যা থাকে, কিংবা রেলপথে ওয়াগন ও নেটওয়ার্কের সীমাবদ্ধতা দেখা দেয়, সেখানে ব্রহ্মপুত্রের জলপথে সর্বনিম্ন খরচে এবং সর্বনিম্ন কার্বন নিঃসরণ করে একই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ পণ্য পরিবহন করা সম্ভব। উত্তর-পূর্ব ভারতের ভূমিবেষ্টিত রাজ্যগুলোর জন্য সমুদ্রবন্দরে পৌঁছানোর সবচেয়ে সহজ ও সাশ্রয়ী পথ ছিল বঙ্গোপসাগর। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নৌপথ পুনরুজ্জীবিত হওয়ায় দীর্ঘ পথ ঘুরে পণ্য পরিবহনের যে বাধ্যবাধকতা ছিল, তা দূরীকৃত হচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানকে নিয়ে গঠিত উপ-আঞ্চলিক উদ্যোগগুলোর বাস্তবায়নে নদীপথভিত্তিক কানেক্টিভিটি অত্যন্ত শক্তিশালী অনুঘটক হিসেবে কাজ করবে। বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দর এবং পানগাঁও নৌবন্দরকে উত্তর-পূর্ব ভারতের পণ্য চলাচলের মূল ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার করার অবকাঠামোগত সক্ষমতা তৈরি হচ্ছে, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ পোর্ট চার্জ, প্রটোকল ফি এবং হ্যান্ডলিং চার্জ বাবদ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারবে।
একই সঙ্গে ভারতের 'অ্যাক্ট ইস্ট পলিসির' মূল স্তম্ভ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের দ্রুত বিকাশে বাংলাদেশ হয়ে সমুদ্রের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন অত্যন্ত জরুরি ভূমিকা পালন করবে। এই ঢাকা-গুয়াহাটি-ডিব্রুগড় অক্ষকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী উপ-আঞ্চলিক বাণিজ্য বলয় গড়ে উঠছে, যা ভবিষ্যতে আসাম থেকে ভুটান বা মিয়ানমার সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
তবে এই বিশাল সম্ভাবনার দিগন্তকে সচল ও লাভজনক রাখতে কিছু চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে ওঠাও আবশ্যক। ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার গতিপথ পরিবর্তিত হওয়া এবং পলি জমে চর পড়া একটি নিত্যদিনের সমস্যা হওয়ায় বছরের ১২ মাস, বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে প্রয়োজনীয় গভীরতা বজায় রাখতে ভারত ও বাংলাদেশ উভয় অংশেই নিয়মিত ক্যাপিটাল ড্রেজিং অব্যাহত রাখতে হবে। সেই সঙ্গে বগিবিল এবং পানগাঁও বন্দরে আন্তর্জাতিক মানের অটোমেটেড কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স ও স্ক্যানিং ব্যবস্থা জোরদার করা এবং ১,৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ পথে নাইট নেভিগেশন, জিপিএস ট্র্যাকিং ও লাইটহাউস ব্যবস্থার সামগ্রিক উন্নয়ন ঘটানো জরুরি।
পরিশেষে বলা যায়, ডিব্রুগড়ের নদীঘাট বন্ধ হওয়ার সাত দশক পর ব্রহ্মপুত্রের বুক চিরে মিথানলবাহী বার্জের এই সফর নিছক দুটি দেশের দুটি ঘাটের সংযোগ নয়; এটি হলো ভূ-রাজনীতি, ইতিহাস ও পরিবহন অর্থনীতির এক ঐতিহাসিক মেলবন্ধন। সাত দশকের জমে থাকা পলি সরিয়ে ব্রহ্মপুত্র আবার তার পুরোনো রাজকীয় মেজাজে বাণিজ্যিক রূপ ধারণ করছে। আসাম ও বাংলাদেশের মধ্যকার এই ভৌগোলিক নৈকট্যকে যদি স্থায়ী অর্থনৈতিক সহযোগিতায় রূপান্তর করা যায়, তবে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকা হয়ে উঠবে দক্ষিণ এশিয়ার নতুন অর্থনৈতিক করিডোর। এই বাণিজ্যিক দুয়ার খোলার মাধ্যমে পুনরায় প্রমাণিত হলো যে, প্রকৃতির তৈরি জলপথ কৃত্রিম রাজনৈতিক দেয়ালের চেয়ে বহু গুণ শক্তিশালী। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের সহায় হোন।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।