ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬, ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ তথ্য অধিদফতর নিবন্ধন নম্বর ০৬
শিরোনাম
Advertisement
সালমান মুক্তাদিরের বক্তব্যে যে প্রশ্নগুলোর উত্তর মেলেনি
✎ সালাউদ্দিন
⏲ প্রকাশিত: বুধবার, ৭ অক্টোবর, ২০২৬, ২:২৫ পিএম আপডেট: ০৭.১০.২০২৬ ২:৩৪ পিএম
সংগৃহীত ছবি
X
Advertisement

সংগৃহীত ছবি

সালমান মুক্তাদিরকে ঘিরে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ এখন আর কেবল একটি স্টুডিওতে হামলা, ভাঙচুর কিংবা ব্যক্তিগত ক্ষয়ক্ষতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তাঁর একের পর এক বক্তব্য, বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ, পরে সেই অবস্থান থেকে সরে আসা এবং সর্বশেষ টকশোতে সরকারের প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ—সব মিলিয়ে ঘটনাটি নতুন মাত্রা পেয়েছে। ফলে হামলার নেপথ্যের প্রকৃত কারণ কী, তাঁর অভিযোগের ভিত্তি কতটা নির্ভরযোগ্য এবং ঘটনার সঙ্গে অন্য কোনো পক্ষের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সালমান মুক্তাদির একজন পরিচিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর। সম্প্রতি তাঁর ‘ব্রাউনফিশ স্টুডিও’তে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়। বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। এরপর থেকেই ঘটনার আগে-পরে কী ঘটেছিল, হামলার প্রকৃত কারণ কী এবং এর সঙ্গে রাজনৈতিক কোনো পক্ষের সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না—এসব নিয়ে সমাজমাধ্যমে নানা আলোচনা চলছে।

বিশেষ করে সালমানের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। হামলার পর তিনি ফেসবুক লাইভে এসে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে তাঁর কাছে চাঁদা দাবির অভিযোগ করেছিলেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই বক্তব্য থেকে সরে আসেন। সোমবার রাতে সাংবাদিক খালেদ মুহিউদ্দিনের ‘ঠিকানা’ টকশোতে অংশ নিয়ে তিনি আবারও বিষয়টি নিয়ে বিস্ফোরক বক্তব্য দেন এবং সরকারের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন।

টকশোতে সালমানের বক্তব্যের ধরনও আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি দাবি করেন, তাঁর কাছে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নানা ধরনের কাগজপত্র ও তথ্য রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বিএনপির বিরুদ্ধে কঠোর মন্তব্য করেন এবং সরকারের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি নিজে পরিশ্রম করে অর্থ উপার্জন করেছেন এবং তাঁর সব অর্থ বৈধ। বাংলাদেশে থাকবেন না বলেও তিনি জানান।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠছে—সালমান কেন একই ঘটনা নিয়ে ভিন্ন সময়ে ভিন্ন বক্তব্য দিচ্ছেন? প্রথমে বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তোলার পর পরে কেন তিনি সেই অবস্থান পরিবর্তন করলেন? আবার সর্বশেষ টকশোতে কেন এতটা দৃঢ় অবস্থান নিলেন? এসব প্রশ্নের উত্তর বের করতে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন অনেকে। সালমান নিজেও বলেছেন, তদন্তের স্বার্থে সরকার চাইলে তাঁকে তলব করতে পারে।

তাঁর বক্তব্যের পেছনে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য, নথি বা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া দরকার। কারণ যাচাই না করে লাখো মানুষের সামনে একটি রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলা হলে তার সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ক্ষমতায় আসার মাত্র সাত মাসের মধ্যে বিএনপির বিরুদ্ধে এমন অভিযোগের পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আসতে পারে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রাথমিক তদন্ত ও ঘটনাটির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সালমান মুক্তাদিরকে জিজ্ঞাসাবাদের কয়েকটি কারণ সামনে আসে।

প্রথমেই যাচাই করা দরকার, সালমান মুক্তাদিরের তোলা চাঁদাবাজির অভিযোগের ভিত্তি কী এবং এর পক্ষে তাঁর কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য বা প্রমাণ আছে কি না।

হামলার পর ফেসবুক লাইভে সালমান দাবি করেছিলেন, বিএনপির নাম ব্যবহার করে তাঁর কাছে চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ ছিল, চাঁদা না দেওয়ার কারণেই তাঁর স্টুডিওতে হামলা চালানো হয়।

অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছিলেন, সালমানের বক্তব্য অনুযায়ী তাঁর কাছে কেউ সরাসরি চাঁদা দাবি করেনি এবং চাঁদা চাওয়া হলে তিনি তা দিয়ে দিতেন বলেও তিনি জানিয়েছেন। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ফলে একই ঘটনা সম্পর্কে ভিন্ন ধরনের বক্তব্য কেন সামনে এসেছে, সেটি পরিষ্কার করা জরুরি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে চাওয়া হতে পারে—কোন তথ্যের ভিত্তিতে তিনি বিএনপির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলেছিলেন, কার কাছ থেকে তথ্য পেয়েছিলেন এবং অভিযোগটির পক্ষে তাঁর কাছে কী ধরনের প্রমাণ রয়েছে।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হামলার নেপথ্যের প্রকৃত কারণ নির্ধারণ করা।

এখন পর্যন্ত পুলিশ ও প্রশাসনের প্রাথমিক তদন্তে যে তথ্য সামনে এসেছে, তাতে ধারণা করা হচ্ছে, হামলাটি মূলত সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওকে লক্ষ্য করে সংঘটিত হয়নি। ঢাকার ইসিবি চত্বরের পাশে ওই জমি নিয়ে আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নিউ গিনি প্রপার্টিজ ও একজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। জমির মালিকানা ও চলাচলের রাস্তা নিয়ে বিরোধের বিষয়টিও সামনে এসেছে।

এই বিরোধের জেরেই আবাসন প্রকল্পে হামলার পরিকল্পনা হয়েছিল বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। ওই হামলার সময় প্রকল্প এলাকায় থাকা সালমানের টিনশেড স্টুডিওও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

তাই এখানে আরও কিছু প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। বিতর্কিত জমিতে স্টুডিও নির্মাণের আগে সালমান মুক্তাদির জমি ও মালিকানা-সংক্রান্ত বিষয়গুলো যথাযথভাবে যাচাই করেছিলেন কি না, তিনি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বিরোধ সম্পর্কে জানতেন কি না এবং কোনো পক্ষ তাঁকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করছিল কি না—এসব বিষয়ও তদন্তে পরিষ্কার হওয়া দরকার।

তৃতীয়ত, মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া নিয়েও যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে, তার উত্তর প্রয়োজন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রথমে বলেছিলেন, সালমান মুক্তাদির সমাজমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করলেও থানায় কোনো সুনির্দিষ্ট মামলা করেননি। এর বিপরীতে সালমান দাবি করেন, হামলার রাতেই তিনি ভোররাত পর্যন্ত থানায় অবস্থান করে মামলা করার আবেদন করেছিলেন। তাঁর অভিযোগ, পুলিশ প্রথমে মামলা নেয়নি। পরে মন্ত্রীর বক্তব্যের পর মামলা গ্রহণ করা হয়।

এখানে ঘটনার রাতে থানায় আসলে কী ঘটেছিল, সালমান কখন থানায় গিয়েছিলেন, কী অভিযোগ করেছিলেন এবং এজাহারে কী ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ও অভিযোগ উল্লেখ করা হয়েছিল—এসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

তদন্ত কর্মকর্তাদের কাছে তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে থানার নথি, মামলা দায়েরের সময় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য মিলিয়ে দেখা হলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হতে পারে।

চতুর্থত, সালমান মুক্তাদিরের সমাজমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যের প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

তিনি একজন প্রভাবশালী সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার এবং তাঁর বিপুলসংখ্যক অনুসারী রয়েছে। ফলে তাঁর বক্তব্য খুব অল্প সময়ের মধ্যে বড় একটি জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে যায়। এ কারণে তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানসহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে তাঁকে সমাজমাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সালমানের বক্তব্যের কারণে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বা রাজনৈতিক পরিবেশে কোনো নেতিবাচক প্রভাব তৈরি হচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি কোনো তথ্য যথাযথভাবে যাচাই না করে প্রচার করেছেন কি না, করে থাকলে তার কারণ কী—তাও তদন্তের বিষয় হতে পারে।

তবে এটিও মনে রাখা দরকার, সালমান মুক্তাদির এ ঘটনায় একজন ভুক্তভোগী। তাঁর স্টুডিওতে হামলা হয়েছে, মূল্যবান যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সামগ্রী ভাঙচুর ও লুটের অভিযোগ রয়েছে। একজন ভুক্তভোগী হিসেবে তাঁর ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার অবশ্যই রয়েছে।

কিন্তু একই সঙ্গে ঘটনাটি নিয়ে তাঁর প্রকাশ্য বক্তব্য, রাজনৈতিক অভিযোগ এবং হামলার প্রকৃত নেপথ্য কারণ উদ্ঘাটনের স্বার্থে তদন্তকারী সংস্থার পক্ষ থেকে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা তদন্তপ্রক্রিয়ারই অংশ হতে পারে। তিনি কোনো তৃতীয় পক্ষের হয়ে কাজ করেছেন কি না, কিংবা অন্য কোনো পক্ষ তাঁর বক্তব্য বা অবস্থানকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তরও তদন্তের মাধ্যমেই পাওয়া সম্ভব।

এদিকে সালমান মুক্তাদিরের অর্থের উৎস নিয়েও অনুসন্ধান চলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ইন্টেলিজেন্ট বিভাগ তাঁর ব্যাংক হিসাব, অ্যাকাউন্ট খোলার কাগজপত্র এবং লেনদেনের তথ্য পর্যালোচনা করছে বলে জানা গেছে।

সালমান অবশ্য দাবি করেছেন, তাঁর সব অর্থ বৈধ ও সাদা।

এ ছাড়া তাঁর শ্বশুর শেখ নূর ইসলামের ব্যবসার কয়েকটি গুদাম শুল্কমুক্ত মদ রাখার অভিযোগে সিল করে দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। তবে সালমান ও তাঁর শ্বশুর উভয়েই দাবি করেছেন, তাঁদের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্ক নেই।

সব মিলিয়ে সালমান মুক্তাদিরকে ঘিরে তৈরি হওয়া পরিস্থিতি এখন শুধু একটি হামলার তদন্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। তাঁর অভিযোগের ভিত্তি, বক্তব্যের পরিবর্তন, জমি ও রাস্তা নিয়ে বিরোধ, মামলা দায়েরের প্রক্রিয়া, সমাজমাধ্যমে তাঁর বক্তব্যের প্রভাব এবং অর্থনৈতিক বিষয়—সবগুলো দিক পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে।

তাই তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সেটিকে শুধু কোনো রাজনৈতিক অভিযোগের কারণে নেওয়া পদক্ষেপ হিসেবে না দেখে পুরো ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে। তাঁর কাছে থাকা নথি, তথ্য ও বক্তব্য তদন্তের অন্যান্য প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখাই এখন গুরুত্বপূর্ণ। এতে হামলার প্রকৃত কারণ যেমন স্পষ্ট হতে পারে, তেমনি তাঁর তোলা রাজনৈতিক অভিযোগের ভিত্তিও পরিষ্কার হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝
Advertisement