আপনি যদি একজন সাধারণ পরিবারের বাবা-মা হন, তবে নিশ্চয়ই আপনার সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনি চিন্তিত থাকেন। সেই দুশ্চিন্তা থেকে আপনি হয়তো সর্বক্ষণ সন্তানের পেছনে লেগে থাকেন, যেন সে ভালো পড়াশোনা করে, জিপিএ-৫ পায়, ভালো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পায় এবং এভাবেই সে যেন জীবনে সফল হয়। আমাদের সমাজের প্রায় শতভাগ অভিভাবকের লক্ষ্য ঠিক এখানেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু আপনি হয়তো জানেন না, আপনার এই অবিরাম চেষ্টা আদতে খুব একটা কাজে লাগে না। অনেক পরিশ্রম করে কিছু মানুষ সফল হয় ঠিকই, তবে সেটা আসলে মাত্র কয়েকজন। তারা নিয়মের ব্যতিক্রম হয়ে ভাগ্যক্রমে সফল হন। কিন্তু সফল হওয়ার আসল নিয়মটি অন্য কোথাও লুকিয়ে থাকে।
একটু গভীরভাবে লক্ষ করলেই দেখবেন, পৃথিবীর নানা সমাজে যারা শিক্ষিত ও সচেতন পরিবারের সদস্য, তারাই সাধারণত আর্থিকভাবেও সচ্ছল। অবশ্য সামাজিক ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে দুর্নীতি করে কেউ কেউ হঠাৎ ধনী হয়ে যেতে পারে, তবে সেই ধনী ব্যক্তিদের কথা আমরা এখানে বলছি না। বৈজ্ঞানিক গবেষণার মাধ্যমে উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন উপাত্ত থেকে দেখা যায়, শিক্ষিত ও সচেতন পরিবারের সন্তানেরা জীবনে সফল হওয়ার ক্ষেত্রে কম সচেতন বা দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের তুলনায় ৮০ শতাংশের বেশি এগিয়ে থাকে।
কিছু মানুষ কেন সফল হয়, কেন অন্যরা পিছিয়ে থাকে? এই প্রশ্নের বিষয়ে আমাদের দেশে তেমন কোনো মৌলিক গবেষণা নেই বললেই চলে। অথচ উন্নত দেশগুলোতে নিয়মিত এ নিয়ে গবেষণা হয়, গবেষণার ফলাফল বারবার পুনর্মূল্যায়ন করা হয় এবং তা সমাজে প্রয়োগ করে তারা আরও সমৃদ্ধ হয়। কিন্তু আমাদের মতো পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখবেন, হয়তো কোনো একটি দেশে ১৭০টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, যার অনেকগুলোর বয়স আবার ১০০ বছরেরও বেশি। বিশ্ববিদ্যালয় তো সেই স্থান, যেখানে নতুন জ্ঞানের অনুসন্ধান করা হয়; যার র্যাংক নির্ভর করে মূলত মৌলিক গবেষণা ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টির সক্ষমতার ওপর। কিন্তু আমরা প্রায়ই দেখি, পিছিয়ে পড়া দেশগুলোর সেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিত হয়েছে, এমন মৌলিক জ্ঞান তেমন কিছুই যুক্ত হয়নি।
বিদ্যুৎ আবিষ্কার করেছে ইউরোপের ছেলেরা, নভোযান আবিষ্কার করেছে ওরা, পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার কীভাবে করা যায়, সেই বিজ্ঞান ওরাই আবিষ্কার করেছে। আমরা যে কম্পিউটার ব্যবহার করছি, তা আমেরিকার ছেলেরা আজ থেকে ৮৫ বছর আগে আবিষ্কার করেছে। আজ আমরা যে এআই ব্যবহার করছি, তার গবেষণা শুরু হয়েছিল ১৯৫০-এর দশকেই আর ১৯৬৬ সালেই বিজ্ঞানীরা সফলভাবে চ্যাটবটের সঙ্গে কথা বলেছিলেন। আবার আজকের যে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উন্নতি, তার প্রায় সবই ওই পশ্চিমা দেশগুলোর বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার। যুদ্ধবিদ্যা, রাষ্ট্রব্যবস্থা, অর্থব্যবস্থা, সমাজব্যবস্থা—আসলে আজকের জগতের সবই যেন তাদেরই আবিষ্কার।
তাহলে প্রশ্ন আসে, কেন আমরা পিছিয়ে আছি? কেন ইংল্যান্ড কিংবা জার্মানির শিশুরা আমাদের শিশুদের তুলনায় অনেক বেশি সৃজনশীল হয়ে বড় হয়? তারা কেন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী আর সফল? এটি কি কেবল আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা? আসলে তা নয়। এর মূল শিকড়টি আরও গভীরে, আরও মৌলিক জায়গায় প্রোথিত।
বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে, মানুষের জীবনের সফলতার পেছনে অনেক বড় ভূমিকা হলো শিশুর প্রাথমিক লালন-পালন, পারিবারিক পরিবেশ এবং মানসিক বৃদ্ধি, অর্থাৎ সঠিক প্যারেন্টিং স্টাইল। গবেষণায় দেখা যায়, সচেতন ও শিক্ষিত বাবা-মা তাদের শিশুকে প্রাথমিক বয়সে, অর্থাৎ প্রথম ৭ বছর পর্যন্ত যেভাবে বড় করেন, অসচেতন বাবা-মা করেন তার চেয়ে ভিন্নভাবে। প্রতিটি শিশুর অন্তর যেন এক টুকরো উর্বর ভূমির ওপর ছড়িয়ে দেওয়া সতেজ বীজ। সেই বীজ থেকে যখন দুটি পাতার ছোট্ট স্বপ্নরূপী চারাগাছ বের হয়, তখন যদি সঠিক পরিচর্যার বদলে রুক্ষ পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়, তবে সেই শিশুর ভবিষ্যৎ সেখানেই আটকে পড়ে।
কেন মানুষ সফল হয়, সে বিষয়ে বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ওয়াল্টার মিশেল শিশুদের নিয়ে একটি চমৎকার গবেষণা করেছিলেন, যা ‘মার্শমেলো টেস্ট’ (Marshmallow Test) নামে পরিচিত। এই গবেষণায় শিশুদের সামনে একটি করে মার্শমেলো (মিষ্টি খাবার) রেখে শিক্ষক বলতেন, “আমি কিছুক্ষণের জন্য একটা কাজে যাচ্ছি, তুমি যদি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে পারো এবং মার্শমেলোটি না খেয়ে লোভ সংবরণ করো, তবে ফিরে এসে আমি তোমাকে একটির বদলে দুটি মার্শমেলো দেব।”
এরপর সেই শিশুদের জীবন কেমন চলছে, তার ওপর গবেষক ওয়াল্টার মিশেল প্রায় ৫০ বছর লক্ষ্য রাখেন। তাঁর সেই গবেষণার ফলাফলে দেখা গেল, যেসব শিশু লোভ সংবরণ করতে পেরেছিল, অর্থাৎ আত্মনিয়ন্ত্রণে যারা মজবুত ছিল, তারা পরবর্তী জীবনে অনেক বেশি সফল হয়েছিল। গবেষণাটি বলছে, যারা ধৈর্য রক্ষায় মজবুত চরিত্রের, তারাই জীবনে অনেক বেশি সফল হয়।
কিন্তু আপাতদৃষ্টিতে এই গবেষণার দাবিটি অত্যন্ত যৌক্তিক মনে হলেও এর গভীরে লুকিয়ে আছে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মনস্তাত্ত্বিক স্তর। লক্ষ করে দেখুন, মার্শমেলো টেস্ট কেবল আত্মনিয়ন্ত্রণের পরীক্ষা ছিল না, এটি ছিল মূলত ‘আস্থার পরীক্ষা’। যে শিশুরা বিশ্বাস করেছিল যে শিক্ষক সত্যিই ফিরে এসে তাকে দুটি মার্শমেলো দেবেন, তারা কেবল সেই আস্থার কারণেই ধৈর্য ধরতে পেরেছিল। আর যে শিশুরা শিক্ষকের কথায় বিশ্বাস রাখতে পারেনি এবং ভেবেছিল যে শিক্ষক হয়তো আর ফিরে আসবেন না বা ওয়াদা রাখবেন না, তারা তাৎক্ষণিকভাবেই মার্শমেলোটি খেয়ে ফেলেছিল।
তাহলে এখানেই প্রশ্ন এসে যায়, শিশুদের অন্তরে আস্থা কীভাবে সৃষ্টি হয়? কেন কিছু শিশু অন্য কাউকে বিশ্বাস করে এবং কিছু শিশু কম আস্থা রাখে? এর মূলে রয়েছে প্রথম ৭ বছরের প্রাথমিক প্যারেন্টিং। সচেতন, শিক্ষিত বাবা-মা তাদের শিশুদের কোনো প্রতিশ্রুতি দিলে তারা সেটা রক্ষা করেন। এমন পরিবারে শিশুরা অনেক স্বাধীনভাবে চলাফেরা করে, বাবা-মা শুধু খেয়াল রাখেন যে শিশুটি যেন কোনো দুর্ঘটনার মধ্যে না পড়ে। তারা শিশুদের প্রচুর স্বাধীনতা দেন, সন্তানদের সঙ্গে দীর্ঘ বাক্যে তারা প্রচুর কথা বলেন এবং যেকোনো বিষয় তাদের বুঝিয়ে বলেন। শিশুটি যদি গরম চুলায় হাত পুড়িয়ে ফেলে, তবে সচেতন বাবা-মা তাকে পরম যত্নে বুঝিয়ে বলেন কেন তার ওই কাজটি করা উচিত ছিল না।
অন্যদিকে, অসচেতন বাবা-মা অর্থাৎ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যারা গরিব, সেই পরিবারগুলোতে শিশুর প্রাথমিক বয়সের বেড়ে ওঠায় ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। সেখানে বাবা-মা প্রায়ই শিশুদের কোনো প্রতিশ্রুতি দিলে হয়তো তারা সেটি রক্ষা করতে পারেন না। তারা শিশুদের সঙ্গে বিরক্তির সুরে কথা বলেন। সাধারণত তারা শিশুর সঙ্গে খুব কম কথা বলেন, আর যা-ও বা বলেন, তা খুব সংক্ষিপ্ত; যেমন—‘চলে যাও’, ‘এখন না’, ‘বসে থাকো’ ইত্যাদি খুব ছোট ছোট বাক্য দিয়ে বাবা-মা তাদের শিশুর সঙ্গে কথা বলেন। এই শিশুদের কেউ আগুনে হাত পুড়িয়ে ফেললে মা-বাবা ধমক দিয়ে বলেন, “আবার যদি এমন করিস, তবে পিটিয়ে সোজা করে দেব!” এমন বাবা-মা অনেক ক্ষেত্রেই শিশুদের সঙ্গে অত্যন্ত কর্কশ আচরণ করেন এবং ধমকের সুরে কথা বলেন। আর এর ফলেই শিশুর অবচেতন মনে জন্ম নেয় ভয়, অবিশ্বাস ও অনাস্থা।
তাহলে মার্শমেলো টেস্টের ফলাফল কী দাঁড়াল? আসলে যেসব শিশুর প্রাথমিক প্যারেন্টিং সঠিক ছিল, যারা শৈশবেই আস্থার পরিবেশে বড় হয়েছে, তারাই পরবর্তী জীবনে বেশি সফল হয়েছে।
এবার আসা যাক ‘ফিক্সড মাইন্ডসেট’ ও ‘গ্রোথ মাইন্ডসেট’-এর কথায়। গবেষকেরা দেখিয়েছেন যে, যারা গ্রোথ মাইন্ডসেটের অধিকারী, তারাই জীবনে বেশি দূর এগোতে পারে। কথাটি অত্যন্ত যৌক্তিক বলে মনে হয়, কিন্তু প্রশ্ন হলো, কিছু মানুষের মধ্যে কেন ফিক্সড মাইন্ডসেট আর কেন কিছু মানুষের মধ্যে গ্রোথ মাইন্ডসেট তৈরি হয়?
আসলে এখানেও ঠিক একই মনস্তাত্ত্বিক বিজ্ঞান কাজ করে। শিক্ষিত বাবা-মা সন্তানের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করেন; তারা যৌক্তিক উপায়ে শিশুকে বুঝিয়ে বলেন যে, কেন কোনো বিষয় ভালো আর কেন কোনো কিছু মন্দ। এভাবে শিশুরা খুব অল্প বয়স থেকেই অবচেতনে শিখে যায় কীভাবে আলোচনা করতে হয়, কীভাবে মতামত দিতে হয়, কীভাবে অন্যের চিন্তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হয় এবং আলোচনার মাধ্যমে কীভাবে সমস্যার সমাধান করতে হয়। এমন প্যারেন্টিংয়ের প্রভাবেই তারা গ্রোথ মাইন্ডসেটের অধিকারী হয়ে ওঠে।
অন্যদিকে, যেসব শিশু শৈশবের প্রথম বয়সগুলোতে কেবল কড়া শাসন ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে বড় হয়, কথায় কথায় ধমক খায় এবং ভয়ে তটস্থ থাকে, অবচেতনে তারা এমন আচরণকেই স্বাভাবিক বলে শিখে নেয়। কিছুটা বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারাও সেই ভীতি, নিয়ন্ত্রণের মানসিকতা এবং অন্যের মতকে অগ্রাহ্য করে নিজের মত জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার মতো ফিক্সড মাইন্ডসেট নিয়ে হাজির হয়। তাদের অন্তর আলোচনা করা কিংবা অন্যের মতামতকে সম্মান করার অভ্যাসে অভ্যস্ত না হওয়ায় সেই মানুষেরা অনমনীয় আচরণকেই সঠিক বলে মনে করে।
তাহলে আমরা কেন পিছিয়ে আছি? আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে কেন গবেষক বা বিজ্ঞানী তৈরি হচ্ছেন না? কেন আমরা কম সৃজনশীল, কিংবা কেন আমরা শুধু বিদেশ থেকে প্রযুক্তি বা পদ্ধতি নিয়ে এসে ব্যবহার করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি? সব সেই প্রশ্নের মূল জবাব আসলে এখানেই।
আমাদের সামাজিক কাঠামোর কর্তৃত্বপরায়ণ প্যারেন্টিং-ই আমাদের সবচেয়ে বড় ত্রুটি। শিশুর অন্তর হলো উর্বর জমির মতো এবং শিশুর জীবনের প্রথম বছরগুলো সবচেয়ে বেশি মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমাদের অধিকাংশ বাবা-মা তাদের সন্তানকে খাবার, বিছানা, খেলনা বা অন্যসব জিনিসপত্র দেওয়ার বিষয়ে যতটা সচেতন, তার মানসিক বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে যেন ততটাই উদাসীন। এ কারণেই অনেক বাবা-মা ব্যস্ততা বা কর্মজীবনের দোহাই দিয়ে শিশুকে গৃহকর্মী বা অন্যের আশ্রয়ে বড় করছেন, যারা শিশুর মানসিক বিকাশের সূক্ষ্ম দিকগুলো নিয়ে কিছুই জানেন না।
একটি শিশুর জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় হলো তার জীবনের প্রথম দিন থেকে প্রথম সাত বছর বা প্রথম ২৫৫৫ দিন। এই সময়টিতেই শিশুর জীবনের মূল মানসিক ক্যানভাস তৈরি হয়ে যায়। এই সময়ে সঠিক মানসিক কাঠামো তৈরি না হলে পরবর্তীতে স্কুল বা কলেজে যাওয়ার পর সেই ক্যানভাস খুব বেশি একটা বদলানো সম্ভব হয় না। তাই শিশুর ভবিষ্যৎ জীবনের সফলতাই শুধু নয়, বরং একটি সৃজনশীল জাতি গড়ার স্বার্থে সমাজের সর্বস্তরে সঠিক প্যারেন্টিং সম্পর্কে সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। হ্যাঁ, এটি জরুরি, কিন্তু কতটা জরুরি? সত্যি বলতে, বর্তমান সময়ে এর চেয়ে জরুরি আর কিছুই নেই।
(লেখক - মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক)