ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩০ ভাদ্র ১৪৩৩ তথ্য অধিদফতর নিবন্ধন নম্বর ০৬
শিরোনাম
Advertisement
চোখে চোখ রেখে সীমান্ত পাহারা বিজিবির
✎ এম.আব্দুল্লাহ আল মামুন খান
⏲ প্রকাশিত: সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ২:১৬ পিএম
সংগৃহীত ছবি
X
Advertisement

সংগৃহীত ছবি

সীমান্তে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের পরীক্ষা চলে একেবারেই নীরবে। দেশের ৪ হাজার ৪২৭ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তে প্রতিনিয়ত অদৃশ্য এক যুদ্ধের সামনের সারিতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। জনবল আর অস্ত্রের গণ্ডি ছাপিয়ে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা এখন তথ্য, প্রযুক্তি আর কৌশলের ক্ষেত্রেও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। জটিল বাস্তবতায় সীমান্ত পাহারায় শুধুমাত্র নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই বিজিবির। কাঁটাতারের পুরোনো প্রহরাকে প্রযুক্তি, গোয়েন্দা সক্ষমতা ও জনসম্পৃক্ততার সমন্বয়ে নতুন উচ্চতায় দাঁড় করিয়ে সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগাম প্রতিরোধ গড়ে তুলছে এই বাহিনী। অর্জন করছে সীমান্তবাসীর আস্থাও। মূলত চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর সীমান্তে বদলে গেছে বিজিবির কৌশল ও প্রতিক্রিয়ার ধরন। বদলেছে চোখের ও মনের ভাষাও। 

কোনো ঘটনা ঘটার পর পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার পরিবর্তে আগাম তথ্য বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য ঝুঁকি আঁচ করছে সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরী বিজিবি। সাজিয়ে নিচ্ছে নিজেদের প্রস্তুতি। দীর্ঘ সীমান্তে পিছু হটছে না। দৃঢ় অবস্থান ধরে রাখছে।  আবার অহেতুক উত্তেজনাও তৈরি করছে না। স্থানীয়দের সঙ্গে নিয়ে টহল, মাইকিং এবং সন্দেহজনক চলাচলের ওপর বাড়তি নজরদারির মাধ্যমে ঠেকিয়ে দিচ্ছে প্রতিবেশী দেশের বিএসএফের একের পর এক অবৈধ পুশ-ইন অপচেষ্টা। অমিত দৃঢ়তা, সক্রিয়তা ও আগাম প্রস্তুতির এই কার্যকর সমন্বয়ই সাম্প্রতিক সময়ে বিজিবির বদলে যাওয়ার সবচেয়ে বড় চিত্র। আর বিএসএফের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে চোখে চোখ রেখে কথা বলার নানান ছবি ও ভিডিও দেশের মানুষের মনে গেঁথে রয়েছে। এসব যেন সীমান্তে আত্মবিশ্বাসী ও সাহসী বিজিবি জওয়ানদের সক্ষমতা, পেশাদারিত্ব, দায়িত্ব ও দেশপ্রেমকে করেছে আরও সুসংহত। 

তাঁরা নিজেদের বহুমাত্রিক কর্মযজ্ঞ সম্পাদনে প্রয়োজনে নদীতে নামে, চর পেরোয়, অরণ্যে ঢোকে আবার প্রয়োজন হলে পাহাড়ে ও আকাশেও ওঠে। দেশের পাহাড়, নদী, বন, চর ও উপকূলের বিচিত্র ভূপ্রকৃতিতে একই সীমান্তে একাধিক ফ্রন্টে কাজ করছে। যেখানে রাষ্ট্রের উপস্থিতি সেখানেই তাদের উপস্থিতি। সীমান্তবাসীর আপদে-বিপদে মানবিক হৃদয় নিয়ে পাশে দাঁড়াচ্ছে। কাঁটাতার রক্ষার পাশাপাশি ভৌগলিক অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রেখে সীমান্তকে করছে সুরক্ষিত। অর্জন করেছে সীমান্তের বাসিন্দাদের গভীর আস্থা ও বিশ্বাস। 

সীমান্ত শার্দুলদের তীক্ষ্ম চোখ পাহাড়, নদী, কাঁটাতার, আকাশ আর সীমান্তের মানুষের দিকে। স্থানীয়দের সহযোগিতায় চোরাচালানের রুট চিহ্নিত করা ও দুর্গম এলাকায় কার্যকর গোয়েন্দা নেটওয়ার্ক তৈরির মাধ্যমে সীমান্তরক্ষী এই বাহিনীটি সীমান্ত বসবাসকারীদের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে গড়েছে সখ্য-হৃদ্যতা। সীমান্তের শেষ আলো নিভে গিয়ে যখন বাসিন্দাদের চোখে ঘুম নামে তখনও জেগে থাকে বিজিবি-অহর্নিশ। 

বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই সদর দপ্তরের পরিকল্পনার সঙ্গে মাঠের বাস্তবতা পরখ করতে ছুটেছেন সীমান্তে। সীমান্ত নিরাপত্তার সঙ্গে তিনি পেশাদারিত্বে বিশেষভাবে জোর দিয়েছেন। একটি আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং জনসম্পৃক্ত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠানে রূপ দিতে সরকারের গাইডলাইনে কাজ করছেন। সরকারের নির্দেশে একটি আধুনিক সীমান্তরক্ষী বাহিনী হিসেবে বিজিবির শক্তিকে শুধুমাত্র সাহসের বৃত্তে বন্দি না করে শৃঙ্খলায়, প্রশিক্ষণে, তড়িৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা, তথ্য ব্যবহার ও আধুনিক প্রযুক্তির মধ্যকার সমন্বয় ঘটিয়েছেন। দুর্গম সীমান্তে গিয়ে সদস্যদের মনোবল বাড়ানোর পাশাপাশি সদর দপ্তরের পরিকল্পনা মাঠের বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে নিচ্ছেন। 

সম্প্রতি তিনি চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন করে প্রতিকূল পরিবেশে দায়িত্ব পালনকারী সদস্যদের প্রশংসা করেছেন। একই সঙ্গে মাদক ও অস্ত্রের চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশ, অবৈধ সার মজুদ ও পাচার এবং পুশ-ইন প্রতিরোধে সততা, নিষ্ঠা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য কেবলমাত্র কোন নির্দেশনা নয় বরং এটি বিজিবির বর্তমান অগ্রাধিকার বিষয়ের একটি পরিষ্কার চিত্র। সীমান্তে কঠোরতা, অভিযানে পেশাদারিত্ব, গোয়েন্দা তৎপরতায় গতি আর সীমান্তবাসীদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে মানবিকতা-এই চারটি বিষয় মাঠ পর্যায়ে সুচারূভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে বিজিবিকে ফ্রন্টলাইনার হিসেবে তুলে ধরেছেন। বিজিব যেমন সংঘাত চায় না তেমনি কিন্তু প্রতিবেশীদের ছাড়ও দিচ্ছে না। সীমান্তে পিঠ দেখাচ্ছে না। বিএসএফের সঙ্গে চোখে চোখ রেখে পরিস্থিতি সামলাচ্ছে।

দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় রাষ্ট্রের দৃশ্যমান উপস্থিতিরও প্রতীক বিজিবি। ১৬টি ব্যাটালিয়নের অধীনে ১৫০টি বিওপি এবং বিভিন্ন অস্থায়ী ক্যাম্প তাই শুধু নিরাপত্তার অবকাঠামো হিসেবে কাজ করছে না। পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। তাঁরা দুর্গম এলাকায় বই বিতরণ করছে। চিকিৎসা শিবির আয়োজন করে। স্থানীয় ভাষায় সচেতনতা তৈরি করে। শিক্ষা ও কারিগরি প্রশিক্ষণে ভূমিকা রাখছে, প্রাকৃতিক দুর্যোগে উদ্ধার ও ত্রাণকাজে অংশ নেয়। জাতীয় প্রয়োজনের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বও পালন করে। এসবের মাধ্যমে সীমান্তে তাঁরা রাষ্ট্রের শক্তি আর সাধারণ মানুষের কাছে রাষ্ট্রের উজ্জ্বল মুখ হয়ে উঠেছে। 

প্রতিবেশী দেশ ভারতের অবৈধ পুশ-ইন প্রচেষ্টা সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এলেও মাদক ও অস্ত্রের আন্তঃসীমান্ত নেটওয়ার্ক, সংগঠিত চোরাচালানের বিরুদ্ধে সীমান্তের অতন্দ্র প্রহরীরা নিয়মিতই এক যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। চলতি বছরের আগস্টে বিজিবির অভিযানে ৩৪৭ কোটি ৮১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা মূল্যের চোরাচালান পণ্য, অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার হয়েছে। উদ্ধার তালিকায় রয়েছে স্বর্ণ, শাড়ি, থ্রিপিস ও চাদর, তৈরি পোশাক, বিপুল কসমেটিকস, মোবাইল ফোন, কাঠ, কয়লা, সার ও আতশবাজি। সম্প্রতি নাফ নদীতে ১৪ লাখ ইয়াবা উদ্ধারের চমক জাগানিয়া বিজিবির অভিযান স্পষ্ট করেছে পাচারকারীরা নজরদারি এড়াতে নিজেদের কৌশল বদলাচ্ছে। সীমান্তরক্ষীরা শুধু জনবল বা অস্ত্রের ওপর নির্ভর না করে পরিবর্তিত বাস্তবতায় সীমান্তরক্ষার যুদ্ধ ক্রমেই তথ্যনির্ভর হয়ে উঠছে এই বিষয়টিকে মোটা দাগে প্রমাণ করেছে। ঘটনার দিকে চোখ মেলে তাকালে দেখা যায়, দিনের বেলায় জেলের ছদ্মবেশে নৌকার সঙ্গে দড়ি দিয়ে বাঁধা পানিতে ভাসমান বস্তায় মিয়ানমার থেকে আনা হচ্ছিল ইয়াবা। নৌকায় তল্লাশি করে মাদক না পাওয়ার পরও বিজিবি থামেনি। পানিতে ভাসমান বস্তাগুলো নজরে আসে। সেখানেই বেরিয়ে আসে বিশাল চালান। নিজেদের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, সন্দেহ শনাক্ত করার দক্ষতা ও আগাম গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয়ে ১৪০ কার্টুনে ৪২ কোটি টাকা বাজারমূল্যের ইয়াবার বড় চালান আটক করা সম্ভব হয়েছে। 

২৩১ বছরের পুরনো বর্ডার গার্ড বাংলাদেশকে একটি আধুনিক, দক্ষ ও আরও জনকল্যাণমুখী, সময়োপযোগী এবং জনসম্পৃক্ত এক বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার কথা একাধিকবার গুরুত্বের সঙ্গেই বলেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারপ্রধান ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই অগ্রাধিকার বিজিবির আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির নীতিগত দিকনির্দেশনাকেই দেদীপ্যমান করেছে। একই ধারাবাহিকতায় জল ও স্থলের পাশাপাশি এয়ার উইংয়ে হেলিকপ্টার সংযোজনের মাধ্যমে দুর্গম ও দুর্গমতর সীমান্ত এলাকায় দ্রুত নজরদারি ও তৎপরতার সক্ষমতা তৈরি হয়েছে। পাহাড়ি ও নদীবেষ্টিত সীমান্তে বিজিবির নিয়মিত টহল যেমন রাষ্ট্রের উপস্থিতি দৃশ্যমান করছে, তেমনি সীমান্তবাসীর মধ্যেও নিরাপত্তার আস্থা তৈরি করছে। বিজিবিকে বিশ্বমানের স্মার্ট সীমান্ত বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার সরকারপ্রধানের পরিকল্পনায় আধুনিক অস্ত্রের পাশাপাশি সীমান্ত নজরদারিতে যুক্ত হচ্ছে উন্নত প্রযুক্তি ও সার্ভেইলেন্স সরঞ্জাম। প্রযুক্তি ও দক্ষ মানবসম্পদের সমন্বয়ই হবে ভবিষ্যতের স্মার্ট বিজিবির আসল শক্তি। 

লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক সন্ধানী বার্তা; অ্যাকটিং এডিটর, কালের আলো.কম।

এসএ

Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝
Advertisement