মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা বরাবরই একটি বড় প্রশ্ন। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর হলেও দীর্ঘদিন ধরে দুর্বল জায়গায় রয়েছে এই শিক্ষা। উচ্চশিক্ষার ভিত তৈরির এই স্তরে শিক্ষার্থীর পাঠাভ্যাস, ভাষাজ্ঞান, সৃজনশীলতা, শারীরিক সক্ষমতা ও সামাজিক মূল্যবোধ গড়ে ওঠার কথা থাকলেও শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা, মুখস্থনির্ভরতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতিতে সেই লক্ষ্য বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এবার প্রাথমিক শিক্ষার এই কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে একটি আধুনিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জীবনমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার। প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে উপযুক্ত মানদণ্ড ও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর এ ব্যবস্থাকে দাঁড় করাতে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলেছে।
প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই আগামীর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চান প্রধানমন্ত্রী। তাই একজন শিশুর আত্মিক বিকাশ এবং দেশের সামগ্রিক আর্থসামাজিক ব্যবস্থার পরিবর্তনের কার্যকর সূচনায় প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোর দিকে বিশেষভাবে নজর দেওয়া হয়েছে। সরকারের পরিকল্পনায় প্রাথমিক শিক্ষার সার্বিক উন্নয়নে নেওয়া হচ্ছে ১৩টি নতুন প্রকল্প। অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তির ব্যবহার, প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার পরিবেশ, খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণ—বহুমাত্রিক উদ্যোগের মাধ্যমে প্রাথমিক বিদ্যালয়কে কেবল পাঠদানের স্থান নয়, শিশুর সামগ্রিক বিকাশের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।
‘স্মার্ট এডুকেশন ইকোসিস্টেম’
পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ‘স্মার্ট এডুকেশন ইকোসিস্টেম’ গড়ে তোলা। ডিজিটাল কনটেন্ট, ইন্টারঅ্যাকটিভ প্রযুক্তি এবং উন্নত সংযোগব্যবস্থার মাধ্যমে শ্রেণিকক্ষকে আরও কার্যকর ও শিক্ষার্থীবান্ধব করার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সঙ্গে লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (এলএমএস), স্মার্ট মূল্যায়ন এবং শিক্ষার্থীর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণকে একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে শিক্ষার্থীর শেখার ঘাটতি কোথায়, কোন বিষয়ে সে এগিয়ে এবং কোথায় বাড়তি সহায়তা প্রয়োজন—এসব তথ্যভিত্তিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হতে পারে। তবে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সুফল পেতে হলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এবং প্রশিক্ষিত শিক্ষক নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।
ভাবনার বড় জায়গা খেলাধুলা ও সংস্কৃতি
নতুন ভাবনার আরেকটি বড় জায়গা খেলাধুলা ও সংস্কৃতি। প্রাথমিক স্তরে ফুটবল ও দাবাকে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি গান, আবৃত্তি ও বিতর্কের সুযোগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রমে চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলাকে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। দেশের ৬৫ হাজারের বেশি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে ‘প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ টুর্নামেন্ট’ আয়োজন এরই একটি বড় উদাহরণ। বালক ও বালিকা—দুই বিভাগেই বিপুলসংখ্যক দলের অংশগ্রহণ দেখিয়ে দিয়েছে, বিদ্যালয় পর্যায়ে খেলাধুলার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কতটা ব্যাপক।
সংস্কৃতিচর্চাকেও দেখা হচ্ছে শিশুর আত্মপ্রকাশের মাধ্যম হিসেবে। পারফরমেটিভ ও এক্সপ্রেসিভ—দুই ধারায় শিক্ষার্থীদের শিল্প ও সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থাৎ শুধু মঞ্চে পরিবেশন নয়, নিজের অনুভূতি, চিন্তা ও সৃজনশীলতাকে প্রকাশ করার সুযোগও তৈরি করা হবে।
২০২৭ থেকে ‘শিল্প ও সংস্কৃতি’, ২০২৮-এ নতুন কারিকুলাম
প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ্যক্রমে সংগীত, নৃত্যকলা, নাট্যকলা এবং চারু ও কারুকলার মতো বিষয় যুক্ত করার উদ্যোগটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সাল থেকে চতুর্থ শ্রেণিতে ‘শিল্প ও সংস্কৃতি’ নামে নতুন পাঠ্যবই চালু করার কথা রয়েছে। চারটি অধ্যায়ে থাকবে চারু ও কারুকলা, সংগীত, নৃত্যকলা ও নাট্যকলা।
২০২৮ সালের মধ্যে নতুন কারিকুলাম চালুর লক্ষ্যও রয়েছে। এর মধ্য দিয়ে মুখস্থনির্ভর পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা থেকে দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও বাস্তবজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষায় যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ উদ্যোগের আরেকটি সম্ভাব্য প্রভাব কর্মসংস্থান। বিশেষায়িত শিক্ষক ও প্রশিক্ষকের চাহিদা তৈরি হলে সংগীত, নৃত্য, চারুকলা ও নাট্যকলায় শিক্ষিত তরুণদের জন্য নতুন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি হতে পারে। আগামী পাঁচ বছরে এ খাতে ৫০ থেকে ৬০ হাজার কর্মসংস্থানের সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে।
এক মতবিনিময় সভায় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেন, ‘বর্তমান সরকারের শিক্ষা-দর্শনের মূল লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্য তাদের দক্ষ করে তোলা। শিল্প, সংস্কৃতি ও ক্রীড়াভিত্তিক শিক্ষা শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
দীর্ঘমেয়াদে ঝরে পড়ার হার কমাতে ভূমিকা
প্রাথমিক শিক্ষায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখা। এ লক্ষ্যেই মিড ডে মিল কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। বিদ্যালয়ে খাবারের ব্যবস্থা একদিকে যেমন শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করতে পারে, অন্যদিকে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের নিয়মিত স্কুলে আসার আগ্রহ বাড়াতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এটি ঝরে পড়ার হার কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
এর পাশাপাশি বিনামূল্যে ইউনিফর্ম, জুতা, মোজা ও স্কুল ব্যাগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রাথমিক স্তরের ১ কোটি ৭ লাখের বেশি শিক্ষার্থীকে এসব শিক্ষা উপকরণ দেওয়ার উদ্যোগের অংশ হিসেবে প্রথম পর্যায়ে প্রায় সাড়ে ৩ লাখ শিক্ষার্থীকে নিয়ে পাইলট কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর আওতায় থাকবে ২৫ হাজারের বেশি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
পাটের তৈরি ৫ লাখ ওয়াটারপ্রুফ স্কুল ব্যাগ সরবরাহের উদ্যোগও রয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের সহায়তার পাশাপাশি দেশীয় পাটপণ্যের ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
জলবায়ু ঝুঁকিতে বিকল্প শিক্ষা মডেল
বাংলাদেশের জলবায়ু ও ভৌগোলিক বাস্তবতাও পরিকল্পনায় বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। বন্যা ও নদীভাঙনপ্রবণ এলাকায় ভাসমান বা নৌকাভিত্তিক বিদ্যালয় মডেলকে কার্যকর বিকল্প হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘদিন ধরে যেসব এলাকায় এ ধরনের শিক্ষা কার্যক্রম চলছে, সেখানকার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে অনুরূপ অঞ্চলে তা সম্প্রসারণ করা গেলে দুর্যোগের কারণে শিক্ষার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জলবায়ু সহনশীল শিক্ষা ব্যবস্থার অংশ হিসেবে ভাসমান বা নৌকাভিত্তিক বিদ্যালয় মডেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলেও মনে করেন। তাঁর মতে, নৌকাভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে এবং এটি একটি কার্যকর ও পরীক্ষিত মডেল। এই অভিজ্ঞতাকে দেশের অন্যান্য অনুরূপ অঞ্চলে কীভাবে সম্প্রসারণ করা যায়, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে।
প্রয়োজন পর্যাপ্ত অর্থায়ন, দক্ষ জনবল ও নিয়মিত তদারকি
নতুন প্রকল্প, ডিজিটাল শ্রেণিকক্ষ, মিড ডে মিল, বিশেষায়িত শিক্ষক, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক শিক্ষা—সবকিছুকে কার্যকর করতে প্রয়োজন পর্যাপ্ত অর্থায়ন, দক্ষ জনবল, নিয়মিত তদারকি এবং স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহি। বিশেষ করে শিক্ষক সংকট দূর না হলে অবকাঠামো বা প্রযুক্তির উন্নয়ন একা শিক্ষার মান বদলাতে পারবে না।
একইভাবে শহর ও গ্রামের বিদ্যালয়ের সুযোগ-সুবিধার বৈষম্য কমানোর মাধ্যমে ‘বিশ্বমানের’ প্রাথমিক শিক্ষা সবার জন্য নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। মেধাবী কোমলমতি শিশুদের মননকে জাগিয়ে তোলার মাধ্যমে নিশ্চিত হোক প্রকৃত আনন্দময় শিক্ষা।
প্রাথমিক শিক্ষা একটি জাতির ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ তৈরির প্রথম ধাপ। তাই পরিবর্তনের লক্ষ্য শুধু নতুন বই, প্রযুক্তি বা অবকাঠামোয় সীমাবদ্ধ না রেখে শিশুর শেখার আনন্দ, পুষ্টি, সৃজনশীলতা, মূল্যবোধ, খেলাধুলা এবং বাস্তব দক্ষতার সমন্বয় ঘটাতে পারলেই কাঙ্ক্ষিত রূপান্তর সম্ভব। জ্ঞান অর্জনের প্রথম এই পাঠশালা থেকে দেশের ভবিষ্যৎ শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
সুদূরপ্রসারী এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শুধু পাঠশালা নয়—হয়ে উঠতে পারে জ্ঞান, সংস্কৃতি, খেলাধুলা ও সামাজিক বিকাশের প্রাণকেন্দ্র।
লেখক : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক