বিশ্ব রাজনীতিতে জাতীয় নিরাপত্তার ধারণা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। একসময় নিরাপত্তা বলতে প্রধানত সীমান্ত, সেনাবাহিনী, অস্ত্র ও যুদ্ধের সক্ষমতাকে বোঝানো হতো। এখন একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নির্ধারিত হয় তার অর্থনৈতিক শক্তি, জ্বানি ও খাদ্যনিরাপত্তা, সমুদ্রপথ, প্রযুক্তি, সাইবার অবকাঠামো, প্রতিরক্ষা শিল্প, কূটনৈতিক অংশীদারিত্ব এবং আন্তর্জাতিক সংকটে সমর্থন আদায়ের সক্ষমতার সমন্বয়ে। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় ৭ আগস্ট ২০২৬ সৌদি আরবের মক্কায় সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমীকরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করার অঙ্গীকার। এতে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা জোরদার এবং সম্মিলিত প্রতিরোধক্ষমতা শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছে। পাকিস্তান ও তুরস্ক চুক্তিটিকে প্রতিরক্ষামূলক এবং কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয় বলে বর্ণনা করেছে। তুরস্ক জানিয়েছে, এটি বিদ্যমান জোটকে প্রতিস্থাপনের উদ্দেশ্যে নয় এবং ভবিষ্যতে অন্য দেশও এতে যুক্ত হতে পারে।
তবে মক্কা চুক্তিকে এখনই ন্যাটোর সমতুল্য পূর্ণাঙ্গ সামরিক জোট হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। ন্যাটোর মতো দীর্ঘদিনের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, সমন্বিত কমান্ড, যৌথ সামরিক অবকাঠামো ও কার্যকর সমষ্টিগত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখনো এর নেই। বরং এটি একটি নতুন ও বিকাশমান ত্রিপক্ষীয় নিরাপত্তা কাঠামো। তবে একটি সদস্যের ওপর আক্রমণকে সবার ওপর আক্রমণ হিসেবে বিবেচনার নীতি এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরোধব্যবস্থায় পরিণত করার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
আজ ৩০ আগস্ট ইস্তাম্বুলে তিন দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সামরিক প্রধানদের অংশগ্রহণে প্রথম বৈঠক হওয়ার কথা; সেখানে সামরিক আন্তঃকার্যক্ষমতা, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং প্রযুক্তি ও উৎপাদন সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। অর্থাৎ চুক্তিটি এখন বাস্তব প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেওয়ার প্রাথমিক ধাপে প্রবেশ করছে।
বাংলাদেশের জন্য প্রশ্ন হলো—এই পরিবর্তিত নিরাপত্তা বাস্তবতাকে কি শুধু অন্য দেশের ভূরাজনৈতিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হবে, নাকি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থের আলোকে এর সম্ভাবনা ও ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হবে? দ্বিতীয় পথটিই অধিক বাস্তববাদী। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান তাকে একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। একদিকে ভারতের দীর্ঘ সীমান্ত ও বিপুল সামরিক-অর্থনৈতিক শক্তি, অন্যদিকে মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতা ও রোহিঙ্গা সংকট, আর দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাস্তবতা বহুমাত্রিক।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সাইবার আক্রমণ, তথ্যযুদ্ধ, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় ডিজিটাল হামলা, জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তা, আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার বিঘ্ন ও অর্থনৈতিক চাপ। ফলে বাংলাদেশের নিরাপত্তা কৌশলকে শুধু সেনাবাহিনীর আকার বা অস্ত্রের পরিমাণ দিয়ে বিচার করলে বাস্তবতার একটি বড় অংশই বাদ পড়ে যায়।
এই জায়গায় মক্কা চুক্তির সম্ভাব্য গুরুত্ব রয়েছে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান তিন ধরনের কৌশলগত সক্ষমতার অধিকারী। ২০২৫ সালে সৌদি আরবের সামরিক ব্যয় ছিল প্রায় ৮৩ দশমিক ২ বিলিয়ন, তুরস্কের ৩০ বিলিয়ন এবং পাকিস্তানের ১১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার—তিন দেশের সম্মিলিত প্রায় ১২৫ বিলিয়ন ডলার। বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের হিসাবে তাদের GDP যথাক্রমে প্রায় ১ দশমিক ২৮ ট্রিলিয়ন, ৮৬৪ বিলিয়ন ও ৪০৭ বিলিয়ন ডলার—সম্মিলিত প্রায় ২ দশমিক ৫৫ ট্রিলিয়ন ডলার। তুলনায় বাংলাদেশের GDP প্রায় ৪৫৬ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ সম্ভাব্য এই অংশীদারিত্বের পেছনে উল্লেখযোগ্য সামরিক, অর্থনৈতিক ও শিল্পভিত্তি রয়েছে।
সৌদি আরব বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। ২০২৫–২৬ অর্থবছরে সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে প্রায় ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৩৭ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স ও জ্বালানি নিরাপত্তার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এই সম্পর্ককে বিনিয়োগ, শিল্প, খাদ্যনিরাপত্তা, অবকাঠামো ও নবায়নযোগ্য শক্তিতে বিস্তৃত করা প্রয়োজন। সৌদি বিনিয়োগ সক্ষমতা ও বাংলাদেশের শিল্পায়নের প্রয়োজনের সমন্বয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারে—আর শক্তিশালী অর্থনীতি নিজেই জাতীয় নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
তুরস্কের গুরুত্ব মূলত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও শিল্প সক্ষমতায়। বাংলাদেশের সঙ্গে ইতোমধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা রয়েছে। ২০২৫ সালের রাজনৈতিক পরামর্শ বৈঠকের যৌথ বিবৃতিতে প্রতিরক্ষা শিল্প, সরঞ্জাম সংগ্রহ, প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য তুরস্কের সবচেয়ে বড় শিক্ষা শুধু অস্ত্র কেনা নয়; বরং নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তোলা। ড্রোন, সামরিক যান, নৌযান, রাডার, নজরদারি ব্যবস্থা ও প্রতিরক্ষা ইলেকট্রনিক্সে দেশীয় উৎপাদন, রক্ষণাবেক্ষণ ও গবেষণা সক্ষমতা তৈরি করা জরুরি।
পাকিস্তানের গুরুত্ব অবশ্য আরও সংবেদনশীল। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ; তা বিস্মৃত হওয়ার প্রশ্নই নেই। তবে রাষ্ট্রীয় কূটনীতিতে অতীতকে স্মরণ করেও বর্তমান ও ভবিষ্যতের জাতীয় স্বার্থকে আলাদাভাবে মূল্যায়ন করতে হয়। সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর আগ্রহ দেখা গেছে। পাকিস্তানের সামরিক অভিজ্ঞতা প্রশিক্ষণ, কৌশলগত গবেষণা, সামরিক শিক্ষা ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতায় মূল্যবান হতে পারে। তবে পাকিস্তানের পারমাণবিক সক্ষমতাকে বাংলাদেশের জন্য সরাসরি ‘পারমাণবিক ছাতা’ হিসেবে দেখার কোনো ভিত্তি নেই; মক্কা চুক্তিও এমন নিশ্চয়তা দেয়নি। এটি বরং দক্ষিণ এশীয় শক্তির ভারসাম্যের একটি উপাদান।
বাংলাদেশের সামনে বড় কৌশলগত প্রশ্ন হলো—ভারত এই পরিবর্তনকে কীভাবে দেখবে। ২৮ আগস্ট ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, ভারতের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট উন্নয়ন তারা ঘনিষ্ঠভাবে অনুসরণ করে। বাংলাদেশের মক্কা চুক্তিতে সম্ভাব্য সম্পৃক্ততা নিয়ে তাঁর বক্তব্যকে দিল্লির সতর্ক নজরের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা যায়। এটি আনুষ্ঠানিক বিরোধিতা নয়; তবে পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের সঙ্গে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠতা ভারতের নিরাপত্তাগত হিসাবের বিষয় হওয়া স্বাভাবিক।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বাস্তবতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভারত বাংলাদেশে প্রায় ৯ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি এবং বাংলাদেশ থেকে প্রায় ১ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করেছে; মোট দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রায় ১১ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে বাংলাদেশি কিছু পণ্যের আমদানিতে ভারত স্থলবন্দরভিত্তিক বিধিনিষেধ আরোপ করেছে—যা দেখায়, বাণিজ্যও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের কৌশলগত হাতিয়ার হতে পারে।
তাই ভারতের সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়া শুধু কূটনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বাণিজ্য, ট্রানজিট, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, পানি ও যোগাযোগেও এর প্রভাব পড়তে পারে। সমাধান ভারতের সঙ্গে সংঘাত নয়; বরং রপ্তানি বাজার, জ্বালানি উৎস, আমদানি পথ ও আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থা বহুমুখী করা। কারণ বিকল্প যত বেশি, চাপ প্রয়োগের কার্যকারিতা তত কম।
বাংলাদেশের নীতি তাই হওয়া উচিত—ভারতবিরোধিতা নয়, ভারতনির্ভরতাও নয়। ভারতের সঙ্গে স্থিতিশীল ও পারস্পরিক স্বার্থভিত্তিক সম্পর্ক অপরিহার্য; কিন্তু বন্ধুত্বের অর্থ নির্ভরতা নয়। একইভাবে সৌদি আরব, তুরস্ক বা পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অর্থ তাদের ভূরাজনৈতিক স্বার্থের অনুসারী হওয়াও নয়। বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন—সব পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা, কিন্তু কোনো পক্ষের ওপর এমন নির্ভরতা না তৈরি করা যাতে জাতীয় স্বার্থে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
ন্যাটো থেকেও বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে—সমষ্টিগত প্রতিরক্ষা। মক্কা চুক্তির প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ন্যাটোর পর্যায়ে না থাকলেও একটি সদস্যের ওপর সশস্ত্র হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনার নীতি সম্মিলিত প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানোর সম্ভাবনা তৈরি করে। তবে বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা ন্যাটোর অনুকরণ নয়; বরং নির্ভরযোগ্য অংশীদারিত্বের মাধ্যমে নিজের প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ানো। কোনো জোটই বাংলাদেশের নিজস্ব অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের বিকল্প নয়।
বাংলাদেশকে তাই কোনো একটি সামরিক জোটের ওপর নির্ভর না করে একটি বহুমাত্রিক নিরাপত্তা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। ভারতের সঙ্গে সীমান্ত ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা, চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত সম্পর্ক, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য ও প্রযুক্তি সহযোগিতা, জাপানের সঙ্গে অবকাঠামো ও শিল্প অংশীদারিত্ব এবং সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে যথাক্রমে জ্বালানি-অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ও কৌশলগত সহযোগিতা—সবকিছুকে একটি সমন্বিত জাতীয় কৌশলের অংশ করা যেতে পারে।
তবে মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদানের আগে এর সামরিক বাধ্যবাধকতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো, কোনো সদস্যের সঙ্গে সংঘাতে বাংলাদেশের দায়িত্ব, সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া এবং বাস্তব অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সুবিধা গভীরভাবে যাচাই করা জরুরি। কারণ একটি প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রকৃত মূল্য ঘোষণায় নয়; সংকটের সময় অংশীদাররা বাস্তবে কী করতে প্রস্তুত এবং কত দ্রুত করতে পারে, তার ওপর নির্ভর করে।
একই সঙ্গে বাংলাদেশকে নিজের সক্ষমতা বাড়াতে হবে—আধুনিক নৌ ও বিমান প্রতিরক্ষা, সমুদ্র নজরদারি, সাইবার নিরাপত্তা, ড্রোন ও unmanned systems, প্রতিরক্ষা ইলেকট্রনিক্স, নিজস্ব রক্ষণাবেক্ষণ সক্ষমতা এবং ধীরে ধীরে প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রসীমা, জ্বালানি সম্ভাবনা, বন্দর, মৎস্যসম্পদ ও আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা ভবিষ্যতে আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
অর্থনৈতিক শক্তিও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে ২০২৫ সালে বাংলাদেশের GDP প্রায় ৪৫৬ বিলিয়ন ডলার এবং প্রবৃদ্ধি ছিল ৩.৫ শতাংশ। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা, জ্বালানি ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রা, রপ্তানি বাজার ও বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জের মধ্যে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল রাষ্ট্রের কৌশলগত স্বাধীনতাও সীমিত থাকে। তাই রপ্তানি বাজার বহুমুখীকরণ, বৈদেশিক বিনিয়োগ, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিই বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতার ভিত শক্ত করবে।
এই বাস্তবতায় মক্কা চুক্তিকে বাংলাদেশের জন্য ‘সমাধান’ নয়, সম্ভাব্য একটি কৌশলগত উপাদান হিসেবে দেখা উচিত। চুক্তিতে যোগ দেওয়া নিজেই কোনো সাফল্য নয়; সাফল্য তখনই, যখন এর মাধ্যমে বাংলাদেশ বাস্তব প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক সক্ষমতা বাড়াতে পারবে—কিন্তু নতুন কোনো নির্ভরতার ফাঁদে পড়বে না।
বাংলাদেশের সামনে তাই দুটি চরমপন্থা এড়িয়ে চলতে হবে। একদিকে ভারত কী বলবে—এই আশঙ্কায় সব কৌশলগত বিকল্প বন্ধ করা, অন্যদিকে ভারতবিরোধিতার জন্য নতুন কোনো ভূরাজনৈতিক বলয়ে ঢুকে পড়া। দুটিই ভুল। বাংলাদেশের পথ হওয়া উচিত তৃতীয় পথ—ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু নির্ভরতা নয়; চীনের সঙ্গে সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু একচেটিয়া নির্ভরতা নয়; যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমের সঙ্গে বাণিজ্য ও প্রযুক্তি সহযোগিতা থাকবে, কিন্তু কৌশলগত আনুগত্য নয়; সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকবে, কিন্তু তাদের কোনো একজনের ভূরাজনৈতিক স্বার্থের অনুসারী হওয়া যাবে না।
এই নীতিই বাংলাদেশকে একটি প্রকৃত ‘সেতুরাষ্ট্রে’ পরিণত করতে পারে—দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য ও বৃহত্তর মুসলিম বিশ্বের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, জ্বালানি, প্রযুক্তি ও কূটনীতির সংযোগস্থল হিসেবে। মক্কা চুক্তি সেই বৃহত্তর কৌশলের একটি সম্ভাবনাময় অংশ হতে পারে; কিন্তু এর সাফল্য নির্ভর করবে বাংলাদেশ কতটা দক্ষতার সঙ্গে নিজের জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব ও দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তার সঙ্গে এই সম্পর্ককে সামঞ্জস্য করতে পারে তার ওপর।
শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় নিশ্চয়তা কোনো বিদেশি চুক্তি বা সামরিক জোট নয়—নিজের শক্তি। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো ভৌগোলিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ দেশের জন্য মক্কা চুক্তিতে যোগদানের সিদ্ধান্ত আবেগে নয়, জাতীয় স্বার্থ, নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও কূটনৈতিক ঝুঁকির কঠোর হিসাবের ভিত্তিতে নিতে হবে। কোনো জোট যদি আমাদের প্রতিরোধক্ষমতা ও কৌশলগত স্বাধীনতা বাড়ায়, তা বিবেচনাযোগ্য; কিন্তু যদি নতুন নির্ভরতা বা অন্যের সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করে, তবে তা এড়িয়ে চলাই বিচক্ষণতা। তাই বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলমন্ত্র হওয়া উচিত—কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন, কিন্তু বিচ্ছিন্নতা নয়; সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কিন্তু কারও কাছে কৌশলগত নির্ভরতা নয়। বাংলাদেশ কারও বিরুদ্ধে নয়; বাংলাদেশ বাংলাদেশের পক্ষে।
লেখক: অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও কলামিস্ট