একটি দেশের সামরিক বাহিনীর পদোন্নতি কেবল পদবি পরিবর্তনের বিষয় নয়। স্বাভাবিকভাবে বিষয়টিকে এভাবে দেখার সুযোগ নেই। বরং এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ কাঠামো, বাহিনীর পেশাদারিত্ব এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা। আধুনিক সামরিক বাহিনীতে প্রযুক্তিগত জ্ঞান যেমন অপরিহার্য, তেমনি পরিবর্তিত যুদ্ধকৌশলের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া, সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা, অধীনস্থদের নেতৃত্ব দেওয়ার দায়িত্ব, নৈতিক দৃঢ়তা এবং সংকটকালে নেতৃত্ব দেওয়ার যোগ্যতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
গত রবিবার (২৩ আগস্ট) বিমান বাহিনী সদর দপ্তরে ‘নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনী নির্বাচনী পর্ষদ-২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সামরিক পদোন্নতির ক্ষেত্রে রাজনীতি নয়, বরং পেশাদারিত্ব ও যোগ্যতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছেন।
দশ কথার এক কথায় তাঁর অন্তর্নিহিত বার্তা বেশ পরিষ্কার—যোগ্যতা যেন পরিচয়ের কাছে পরাজিত না হয়। সামরিক বাহিনীতে পদোন্নতি হবে এমন কর্মকর্তাদের, যারা দায়িত্ব পালনে দক্ষ, শৃঙ্খলাবদ্ধ, সৎ, বিশ্বস্ত এবং নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা রাখেন। অর্থাৎ ভবিষ্যৎ সামরিক নেতৃত্ব বাছাইয়ে কোন মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে, সে বিষয়েও একটি স্পষ্ট দিকনির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। যা ‘পেশাগত দক্ষতা’র সঙ্গে ‘সততা’, ‘বিশ্বস্ততা’, ‘শৃঙ্খলা’ এবং ‘নেতৃত্বের গুণাবলী’কে পাশাপাশি রাখার বিষয়টিকেও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
জানা যায়, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন, কমান্ডার ও লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এবং বিমান বাহিনীর গ্রুপ ক্যাপ্টেন, উইং কমান্ডার ও স্কোয়াড্রন লিডার পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের পরবর্তী পদোন্নতির জন্য এই নির্বাচনী পর্ষদে বিবেচনা করা হয়। যেখানে পদোন্নতি হবে মেধা ও কর্মদক্ষতার স্বীকৃতি, কোনো ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক আনুগত্যের পুরস্কার নয়। সামরিক বাহিনীর মতো শৃঙ্খলানির্ভর প্রতিষ্ঠানে পদোন্নতির প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন অভ্যন্তরীণ আস্থা তৈরির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রধানমন্ত্রী বুঝিয়ে দিয়েছেন, তিনি দক্ষ কর্মকর্তার পাশাপাশি দায়িত্বশীল ও নৈতিক নেতৃত্বের একটি কাঠামো গড়ে তুলতে চান। বাহিনীর অভ্যন্তরীণ আস্থা ও পেশাদার সংস্কৃতির জন্য প্রতিরক্ষামন্ত্রীর এই বক্তব্য নতুন দিকনির্দেশনা দেবে। এর তাৎপর্য শুধু পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বাহিনীর অন্যান্য সদস্যের কাছেও এটি একটি বার্তা—পেশাগত উৎকর্ষ, শৃঙ্খলা ও নৈতিকতা অনুসরণ করেই ভবিষ্যৎ নেতৃত্বে উঠে আসার পথ তৈরি করতে হবে। একটি পেশাদার সামরিক প্রতিষ্ঠানের জন্য এই সংস্কৃতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ নেতৃত্বের প্রতি আস্থা তৈরি হয় তখনই, যখন সদস্যরা বিশ্বাস করেন যে যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতার যথাযথ মূল্যায়ন হচ্ছে।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছালে তাঁকে স্বাগত জানান প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান এডমিরাল খোন্দকার মিসবাহ উল আজীম এবং বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খান।
শুধু অস্ত্র, প্রযুক্তি বা জনবল নয়, সামরিক বাহিনীর মূল শক্তিই হচ্ছে আস্থা ও কমান্ড কাঠামোর প্রতি আনুগত্য। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, নিজের সেনাপ্রধান বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের দৌলতে সেনা পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেশপ্রেমিক সশস্ত্র বাহিনী সম্পর্কে বিস্তৃত জ্ঞান রয়েছে। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা, স্থিতিশীলতা এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তার জন্য তিনি নৌ ও বিমান বাহিনীর সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
সরকারপ্রধানের চোখে জাতীয় সংকট ও দুর্যোগের সময়েও রাষ্ট্রের সক্ষমতার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ সশস্ত্র বাহিনী। কঠিন এই বাস্তবতায় বাহিনীর দক্ষতা, প্রস্তুতি ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা বাড়ানোকে জাতীয় নিরাপত্তার বৃহত্তর কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখছেন প্রধানমন্ত্রী। নির্বাচনী পর্ষদে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে সামরিক বাহিনীকে একই সঙ্গে প্রতিরক্ষা সক্ষমতার রক্ষক এবং জাতীয় সংকটে রাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিও ফুটে উঠেছে। যোগ্য নেতৃত্বের সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তি—রাষ্ট্রীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য এই দুইয়ের সমন্বয়ই কার্যকর শক্তি তৈরি করতে পারে; এমনটাই বিশ্বাস প্রধানমন্ত্রীর।
বিমান বাহিনীর প্রযুক্তিগত সক্ষমতা পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যতমুখী আরও একটি বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন, এয়ার কমান্ড অপারেশন সেন্টারের কার্যক্রম এবং যুদ্ধবিমান দিয়ে শত্রুবিমান শনাক্ত ও প্রতিহত করার লাইভ অপারেশনাল সক্ষমতা অবলোকনের পর তিনি পরিদর্শন করেছেন এ্যারোস্পেস রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কমপ্লেক্স।
সেখানে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি কামিকাজে ড্রোন, ইন্টারসেপ্টর ড্রোন ও ভিটিওএলসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি ও গবেষণা কার্যক্রম দেখেছেন তিনি। এই পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে প্রতিরক্ষা সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের দিকও স্পষ্ট হয়—শুধু বিদেশ থেকে উন্নত প্রযুক্তি সংগ্রহ নয়, বরং নিজেদের গবেষণা, উদ্ভাবন ও প্রকৌশল সক্ষমতার ওপর দাঁড়িয়ে ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা যেন প্রযুক্তিতে আত্মনির্ভরতাকেই চিত্রিত করেছে।
প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির বর্তমান বাস্তবতায় ড্রোন, অ্যান্টি-ড্রোন ব্যবস্থা, আকাশ প্রতিরক্ষা, নজরদারি ও দ্রুতগতির তথ্য বিশ্লেষণ ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ফলে নিজস্ব গবেষণা ও উন্নয়ন সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বারোপকে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রস্তুতির অংশ হিসেবে না দেখার কোনো সুযোগ নেই। দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে তিনি এমন একটি কাঠামোয় দেখতে চান—যেখানে সিদ্ধান্তের ভিত্তি হবে মেধা, নেতৃত্বের ভিত্তি হবে সততা এবং ভবিষ্যতের শক্তির ভিত্তি হবে প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরতা—এমনটিই মনে করেন সামরিক বিশ্লেষকরা।
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক