ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩ তথ্য অধিদফতর নিবন্ধন নম্বর ০৬
শিরোনাম
Advertisement
সংকটে শিল্পকারখানার মালিকদের ভরসা দিচ্ছে সোলার
✎ এম.আব্দুল্লাহ আল মামুন খান
⏲ প্রকাশিত: বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:০৯ পিএম
সংগৃহীত ছবি
X
Advertisement

সংগৃহীত ছবি

এক সময় শিল্পকারখানার ছাদ ছিল অব্যবহৃত। সময়ের বিবর্তনে এখন সেই ছাদই হয়ে উঠছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন এক ক্ষেত্র। জ্বালানি সংকটের চাপ, বিদ্যুতের উচ্চমূল্য ও রপ্তানি বাজার ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশের শিল্পকারখানায় সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ছে দ্রুত গতিতে। বিশেষভাবে জোর দেওয়া হয়েছে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে (গ্রিন এনার্জি)। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে প্রায় ৭ টাকা পর্যন্ত সাশ্রয়ের সুযোগ হাতছাড়া করতে চান না শিল্পকারখানার মালিকরা। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতাদের পরিবেশবান্ধব উৎপাদনের শর্ত পূরণে সৌরবিদ্যুতকে তাঁরা নিজেদের ব্যবসায় গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করছেন। যার মাধ্যমে দেশের জ্বালানি খাতেও বড় পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে নীরবে-নিভৃতে।  

এরই মধ্যে বিভিন্ন শিল্পকারখানা ৬০০ মেগাওয়াটের বেশি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা অর্জন করেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক জ্বালানিবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইইএফএ) গত ৪ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- দেশের ২৩৯টি বড় স্থাপনায় রুফটপ সৌরবিদ্যুতের সক্ষমতা এখন ৬৬৭ মেগাওয়াট। ছোট স্থাপনাগুলোসহ হিসাব কষলে শিল্প খাতে মোট সৌরবিদ্যুৎ সক্ষমতা এরই মধ্যে প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। আরও প্রায় ৫০০ মেগাওয়াট রয়েছে পাইপলাইনে। শুধু তাই নয়, কারখানার ছাদে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ আবার জাতীয় গ্রিডেও দেওয়ার ফলে সেখানে চাপ কমছে। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে নেট মিটারিংয়ের মাধ্যমে বিল সমন্বয়ের সুযোগও তৈরি হয়েছে। 

গ্যাস বিদ্যুতের চরম অনিশ্চয়তার সময়ে শিল্প মালিকদের মধ্যে নিজস্ব সোলার নির্ভরতা তৈরি করছে। পুরো চাহিদা পূরণ না হলেও দিনের কয়েক ঘণ্টা উৎপাদন চালিয়ে রাখতে সহায়তা করছে। হয়ে উঠেছে উৎপাদন ব্যয় কমানোর গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল ইসলামের হিসাবে—‘বর্তমানে শিল্পকারখানায় দিনের সময় গ্রিডের বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিট ১১.৪৭ থেকে ১১.৫৭ টাকা। সেখানে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করলে প্রতি ইউনিটে প্রায় ৭ টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় করা সম্ভব। সহজ হিসাবে, কোনো কারখানা যদি ১ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ নিজস্ব সৌরবিদ্যুৎ থেকে উৎপাদন করে, তাহলে প্রায় ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় হতে পারে। বড় কারখানায় বিদ্যুতের ব্যবহার কয়েক লাখ বা তারও বেশি ইউনিট হওয়ায় বছরে এই সাশ্রয়ের পরিমাণ দাঁড়াতে পারে কয়েক কোটি টাকায়। এ কারণে শিল্প মালিকদের কাছে সোলার এখন শুধু বিকল্প বিদ্যুৎ নয়, বরং খরচ কমানোর একটি দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ।’

সরকারের নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সবুজ অর্থনীতির পরিকল্পনার বাস্তবায়ন দৃশ্যমান হচ্ছে শিল্পে। শিল্পকারখানার ছাদে সোলার প্যানেল বাড়ার অর্থ শুধু আরও বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনই নয় এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কম খরচে উৎপাদন, কম জ্বালানি ঝুঁকি এবং বিশ্ববাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করা। বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের অন্যতম প্রধান বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ইউরোপসহ বিশ্বের বড় ব্র্যান্ডগুলো এখন পণ্য কেনার ক্ষেত্রে কারখানার কার্বন নিঃসরণ ও পরিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থাকে ব্যাপকভাবে গুরুত্ব দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের ২০৩০ সালের পরিবেশগত লক্ষ্য পূরণের চাপ রয়েছে। ফলে পোশাক কারখানাগুলো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে আনছে। বিপরীতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়াচ্ছে। যার নজিরও স্থাপিত হচ্ছে দেশের শিল্পকারখানাগুলোতে। 

দেশের বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠীসমূহ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে এগিয়ে এসেছে। আকিজ, প্রাণ-আরএফএল, আবুল খায়ের, ডিবিএল, রাইজিং, বিএসআরএম, পলমল, অ্যাপেক্স, হামীম, মেঘনা গ্রুপসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান ইতোমধ্যে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করেছে। রাইজিং গ্রুপের চারটি গার্মেন্ট ও টেক্সটাইল কারখানায় বর্তমানে ১৪ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। কারখানাগুলোর প্রায় ৮০ শতাংশ ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে। প্রাণ-আরএফএলও বিভিন্ন কারখানায় সৌরবিদ্যুৎ বাড়াচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি ইতোমধ্যে ২০টি কারখানায় ৩৫ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করছে এবং ১০০ মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে। 

জানতে চাইলে রাইজিং গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ‘আগে পোশাক কারখানায় সোলার রুফটপ ব্যবহার ছিল সীমিত। কিন্তু এখন তাঁরা সোলার রুফটপে ঝুঁকছেন। আগে এটি কমপ্লায়েন্স ছিল এখন এটি বিজনেস কেস। এটি স্থাপন করলে মালিকরাই লাভবান হবেন। আমাদের মোট বিদ্যুতের চাহিদার ৩০ শতাংশ সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে মেটানো সম্ভব হবে।’ সুপারস্টার রিনিউয়েবল এনার্জির তথ্য বলছে-গত ৫ থেকে ৭ বছরে প্রায় ১৫০টি কারখানায় ১০০ থেকে ১৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার রুফটপ সোলার স্থাপন করা হয়েছে। এই চাহিদা ক্রমশও বাড়ছে। আইজিসির অর্থায়নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অতনু রব্বানী ও ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির গবেষণা দলের অক্টোবর ২০২৫-এ সম্পন্ন এক সমীক্ষায় গাজীপুর ও সাভারের ৬৬১টি কারখানার মধ্যে মাত্র ৩১ শতাংশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি, প্রধানত রুফটপ সোলার ব্যবহারের তথ্য মিলেছে। 

দেশজুড়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ ২০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। যা ওই সময়ে সোলার প্যানেল থেকে উৎপাদন করবে ১০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র ২০২৬-২০৩০ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে রুফটপ সোলারের বিস্তার, স্থানীয় পর্যায়ে উদ্যোক্তা তৈরি এবং দেশব্যাপী কার্যকর সোলার সেবা নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে বিদ্যুৎ বিভাগ। রুফটপ সোলারে বিনিয়োগ বাড়াতে বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা দেওয়ার পাশাপাশি কর ও শুল্ক সুবিধা, সহজ শর্তে স্বল্পসুদের ঋণ এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য স্টার্টআপ অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) রাতে জাতীয় সংসদ ভবনের কেবিনেট কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভা বৈঠকে নবায়নযোগ্য সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে ছয় মাস পর্যন্ত শুল্ক-কর রেয়াতি সুবিধায় যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানির বিষয়ে প্রজ্ঞাপন জারির প্রস্তাব অনুমোদন করেছে। 

বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নবায়নযোগ্য সৌরশক্তি উৎপাদনের প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে ১ শতাংশের অতিরিক্ত কাস্টমস ডিউটি, সম্পূর্ণ রেগুলেটরি ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট), আগাম কর এবং অগ্রিম আয়কর থেকে প্রজ্ঞাপন জারির তারিখ থেকে ১৮০ দিন পর্যন্ত অব্যাহতি দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এই সুবিধার ফলে বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে জনজীবনে সৃষ্ট ভোগান্তি কমবে, শিল্প উৎপাদন অব্যাহত থাকবে এবং উৎপাদন ব্যয় হ্রাস পাবে। একই সঙ্গে যন্ত্রপাতির ক্ষয়ক্ষতি কমার পাশাপাশি বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। দ্রুততম সময়ে নবায়নযোগ্য সৌরশক্তি উৎপাদনের মাধ্যমে বিদ্যুতের চাহিদা পূরণেও এই উদ্যোগ সহায়ক হবে। 

জ্বালানি বিশ্লেষকরাও শিল্পকারখানায় সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধিকে শুধু বিনিয়োগের প্রবণতা হিসেবে দেখতে রাজি নন। তাদের মতে-এটি দেশের শিল্প ও জ্বালানি ব্যবস্থায় পরিবর্তনের একটি বড় রকমের কাঠামোগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সরকারের দীর্ঘমেয়াদি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও সবুজ প্রবৃদ্ধির পরিকল্পনার লক্ষ্যও এর মাধ্যমে শিল্প পর্যায়ে বাস্তব রূপ পাচ্ছে। এখন এই উদ্যোগকে আরও দ্রুত ছড়িয়ে দিতে সহজ অর্থায়ন, নেট মিটারিং সম্প্রসারণ ও নীতিগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই হবে সামনের দিনগুলোতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এক চ্যালেঞ্জ। 

লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক সন্ধানী বার্তা; অ্যাকটিং এডিটর, কালের আলো.কম। [email protected]
Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝
Advertisement