ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 শুক্রবার, ৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২০ ভাদ্র ১৪৩৩ তথ্য অধিদফতর নিবন্ধন নম্বর ০৬
শিরোনাম
Advertisement
টিসিবির উদ্যোগে নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তির প্রত্যাশা
⏲ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:৪৬ পিএম
X
Advertisement

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কাছে অর্থনীতির সবচেয়ে দৃশ্যমান সূচক। জিডিপি কত বাড়ল, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কত হলো কিংবা রপ্তানি আয় কতটা বাড়ল- এসব পরিসংখ্যান গুরুত্বপূর্ণ হলেও একজন সাধারণ মানুষ অর্থনীতির অবস্থা প্রথমে বোঝেন বাজারের ব্যাগ হাতে নিয়ে। চাল, ডাল, তেল, চিনি, আটা কিংবা অন্যান্য নিত্যপণ্যের দাম যখন নাগালের মধ্যে থাকে, তখন অর্থনীতির ইতিবাচক সূচকগুলোও তার কাছে অর্থবহ হয়ে ওঠে। আর বাজার যখন অস্থির হয়, তখন সামষ্টিক অর্থনীতির ভালো খবরও অনেকটা ম্লান হয়ে যায়।

এই বাস্তবতায় চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার যে পরিকল্পনা ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ বা টিসিবি নিয়েছে, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিকল্পনা অনুযায়ী স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক উৎস থেকে ২২ কোটি লিটার ভোজ্যতেল, ২ লাখ ২০ হাজার মেট্রিক টন মসুর ডাল, ১ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন চিনি, ১৪ হাজার মেট্রিক টন ছোলা এবং ৪ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন খেজুর কেনা হবে।

পরিমাণের দিক থেকে এটি বড় কর্মসূচি। কিন্তু এর সাফল্য শুধু কত টাকার পণ্য কেনা হলো তার ওপর নির্ভর করবে না। পণ্য কখন কেনা হলো, কোন দামে কেনা হলো, কোথা থেকে কেনা হলো, কত দক্ষতার সঙ্গে মজুত করা গেল এবং প্রয়োজনের সময় কত দ্রুত ভোক্তার কাছে পৌঁছানো গেল- সাফল্যের আসল মাপকাঠি হবে এগুলোই।

টিসিবিকে হতে হবে বাজারের ‘স্ট্যাবিলাইজার’

আমাদের দেশে টিসিবিকে অনেক সময় কেবল কম দামে পণ্য বিক্রির একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হয়। বাস্তবে এর ভূমিকা আরও বড় হওয়া প্রয়োজন। একটি কার্যকর টিসিবি পণ্যের বাজারে সরকারের কৌশলগত হস্তক্ষেপের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হতে পারে।
দেশে নিত্যপণ্যের বাজারে একটি পুরোনো সমস্যা হচ্ছে, সরবরাহে সামান্য বিঘ্ন কিংবা আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হলেই দেশীয় বাজারে তার প্রভাব অনেক সময় দ্রুত পড়ে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমলে তার সুফল একই গতিতে ভোক্তার কাছে পৌঁছায় না। এর সঙ্গে আমদানি ব্যয়, ডলারের বিনিময় হার, পরিবহন খরচ ও সরবরাহ সংকট যুক্ত হতে পারে; আবার কখনো বাজারে অস্বাভাবিক মুনাফার প্রবণতাও দেখা যায়। এখানেই টিসিবির মতো প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা বড় হয়ে দেখা দেয়।

সরকারের হাতে যদি পর্যাপ্ত পণ্য থাকে এবং প্রয়োজনের সময় দ্রুত বাজারে ছাড়া যায়, তাহলে বাজারে একটি শক্তিশালী মনস্তাত্ত্বিক বার্তাও যায়- কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানোর সুযোগ সীমিত। অর্থাৎ টিসিবির পণ্য শুধু যে পরিবারটি কম দামে কিনছে- তাকে সহায়তা করে তা নয়; পর্যাপ্ত পরিমাণে বাজারে হস্তক্ষেপ করা গেলে এর প্রভাব বৃহত্তর খুচরা বাজারেও পড়ে।

টিসিবির চেয়ারম্যানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটি বছরে প্রায় আড়াই লাখ মেট্রিক টন ভোজ্যতেল সরবরাহ করে, যা দেশের মোট বাজারের প্রায় ১৫ শতাংশ। ফলে টিসিবির সরবরাহকে মোট বাজারের তুলনায় নগণ্য ভাবার সুযোগ নেই। সঠিক সময়ে এই পণ্য বাজারে এলে মূল্যবৃদ্ধির ওপর বাস্তব চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব।

দেশি-বিদেশি নয়, মূল বিবেচনা হোক দাম ও নির্ভরযোগ্যতা

টিসিবির এবারের পরিকল্পনার একটি ইতিবাচক দিক হচ্ছে, পণ্যের প্রায় অর্ধেক দেশীয় এবং বাকি অর্ধেক আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সংগ্রহের প্রাথমিক পরিকল্পনা থাকলেও এটিকে কঠোর অনুপাতে বেঁধে রাখা হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক বাজারে বেশি প্রতিযোগিতামূলক দাম এবং নির্ভরযোগ্য সরবরাহ পাওয়া গেলে বিদেশ থেকে কেনার পরিমাণ বাড়ানো হতে পারে। এটি বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত।

সরকারি ক্রয়ে মূল বিবেচনা হওয়া উচিত- মানসম্মত পণ্য সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে এবং প্রয়োজনের সময় পাওয়া যাচ্ছে কি না। দেশীয় বাজারে বিপুল পরিমাণ পণ্য কিনতে গিয়ে যদি সরকারের বড় ক্রয়াদেশের কারণে স্থানীয় বাজারে উল্টো মূল্যচাপ সৃষ্টি হয়, তাহলে উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে পারে। আবার সবকিছু আমদানির ওপর নির্ভরশীল করে ফেললেও আন্তর্জাতিক বাজার, ডলারের দাম, জাহাজভাড়া কিংবা ভূরাজনৈতিক সংকটের ঝুঁকি বাড়বে।

বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথে নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তন পণ্য পরিবহনের ব্যয় দ্রুত বাড়িয়ে দিতে পারে। তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবও শুধু জ্বালানি খাতে সীমাবদ্ধ থাকে না; জাহাজভাড়া থেকে উৎপাদন ও পরিবহন- প্রায় সব পর্যায়েই তার প্রভাব পড়ে।

ফলে টিসিবিকে শুধু আজকের বাজারদর দেখে নয়, আগামী কয়েক মাসের সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেও ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এজন্য শক্তিশালী ‘মার্কেট ইন্টেলিজেন্স’ প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কম থাকার সময় আগাম চুক্তি এবং প্রয়োজনীয় মজুত গড়ে তুলতে পারলে সরকারের অর্থ সাশ্রয় হবে, আবার সংকটের সময় বেশি দামে জরুরি আমদানির প্রয়োজনও কমবে।

৮ হাজার কোটি টাকার সঙ্গে জবাবদিহির প্রশ্ন

প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা ছোট অঙ্ক নয়। এত বড় সরকারি ক্রয় কর্মসূচির ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা এবং জবাবদিহির বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।

কোন পণ্য কোন দেশ কিংবা সরবরাহকারীর কাছ থেকে কেনা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারের তুলনায় ক্রয়মূল্য কত, পরিবহনসহ মোট ব্যয় কত এবং চুক্তির পর পণ্য দেশে পৌঁছাতে কত সময় লাগছে- এসব বিষয়ে যত বেশি স্বচ্ছতা থাকবে, জনগণের আস্থাও তত বাড়বে।

সরকারি ক্রয়ের আরেকটি সমস্যা অনেক সময় দীর্ঘসূত্রতা। সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে দরপত্র, চুক্তি এবং পণ্য হাতে পাওয়া পর্যন্ত দীর্ঘ সময় চলে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে যে সুবিধাজনক মূল্য দেখে ক্রয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সেটি আর নাও থাকতে পারে। তাই টিসিবির জন্য দুটি বিষয় সমান গুরুত্বপূর্ণ- দ্রুততা ও স্বচ্ছতা। একটির জন্য অন্যটি বিসর্জন দেওয়ার সুযোগ নেই।

বড় দুর্বলতা গুদাম সক্ষমতায়

টিসিবির বর্তমান গুদাম অবকাঠামোর দিকে তাকালে একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা চোখে পড়ে। সংস্থাটির ৪০টি গুদাম রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র ৯টি নিজস্ব এবং ৩১টি ভাড়া করা। এসব গুদামের মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ৪৮ হাজার ৩৭০ মেট্রিক টন। এর মধ্যে নিজস্ব গুদামের ধারণক্ষমতা মাত্র ১৩ হাজার ৩৭১ মেট্রিক টন, আর ভাড়া করা গুদামের ৩৪ হাজার ৯৯৯ মেট্রিক টন।

যে প্রতিষ্ঠান বছরে বিপুল পরিমাণ নিত্যপণ্য কিনে লাখ লাখ পরিবারের কাছে সরবরাহ করবে, তার নিজস্ব সংরক্ষণ সক্ষমতার এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠা জরুরি।

টিসিবি প্রায় ১০ হাজার মেট্রিক টন অতিরিক্ত নিজস্ব মজুত সক্ষমতা তৈরির পরিকল্পনা করেছে। উদ্যোগটি ইতিবাচক। তবে ভবিষ্যৎ প্রয়োজন বিবেচনায় এটিকে আরও বড় পরিসরে ভাবতে হবে।

শুধু গুদামের আয়তন বাড়ালেই হবে না। পণ্যের ধরন অনুযায়ী আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা, ডিজিটাল ইনভেন্টরি, দ্রুত পরিবহন এবং অঞ্চলভিত্তিক বিতরণ অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। কোন গুদামে কত পণ্য রয়েছে, কত পণ্য পাইপলাইনে আছে এবং কোন অঞ্চলে আগামী মাসে কত চাহিদা তৈরি হবে- এসব তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে রিয়েল টাইমে জানা গেলে অপচয় কমবে এবং সংকটের সময় দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে।

৮০ লাখ স্মার্ট কার্ড বদলে দিতে পারে ব্যবস্থাপনা

টিসিবির প্রায় ৮০ লাখ স্মার্ট কার্ড অনুমোদিত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৭৫ লাখ ইতোমধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। বাকি সুবিধাভোগীদের ঈদুল ফিতরের আগে স্মার্ট কার্ড দেওয়ার আশা করা হচ্ছে।

এটি শুধু একটি কার্ড বিতরণ কর্মসূচি নয়। সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামো হয়ে উঠতে পারে এটি।

আগের ব্যবস্থায় লাইনে দাঁড়ানো, সুবিধাভোগী শনাক্তকরণে সমস্যা, একজনের পণ্য অন্যজন নেওয়া কিংবা তালিকায় অযোগ্য ব্যক্তির অন্তর্ভুক্তির মতো অভিযোগ ছিল। স্মার্ট কার্ড এবং ডিজিটাল ডেটাবেজ এসব সমস্যা অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে।
এর পরবর্তী ধাপ হিসেবে পয়েন্ট অব সেল বা পিওএস মেশিন চালু এবং মোবাইলের মাধ্যমে কার্ডের তথ্য দেখা ও অর্থ পরিশোধের সুযোগ তৈরির পরিকল্পনা আরও তাৎপর্যপূর্ণ।

একজন ভোক্তা যদি মোবাইলেই জানতে পারেন তিনি কোন মাসে কত পণ্য পাবেন, কত টাকা দিতে হবে এবং পণ্য নেওয়ার পর ডিজিটাল রসিদ পান, তাহলে পুরো ব্যবস্থার স্বচ্ছতা বাড়বে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে, টিসিবির তৈরি ব্যবস্থার সঙ্গে প্রায় ২১টি ভিন্ন সরকারি কর্মসূচি যুক্ত করার সুযোগ রয়েছে। ভবিষ্যতে এটি যদি বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে রূপ নেয়, তাহলে একই ব্যক্তির একাধিক সুবিধা নেওয়া, ভুয়া সুবিধাভোগী কিংবা প্রকৃত দরিদ্র মানুষের তালিকা থেকে বাদ পড়ার মতো সমস্যা কমানো সম্ভব হতে পারে।

তবে ডিজিটালাইজেশনের পাশাপাশি নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে।

ভর্তুকি কমানোর উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ

টিসিবির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে সরকারি ভর্তুকির ওপর নির্ভরতা কমানো। প্রতিযোগিতামূলক দামে পণ্য কিনে কিছু পণ্য সামান্য মুনাফায় বিক্রির পরিকল্পনা রয়েছে।

ভোজ্যতেল, ডাল ও চিনির পাশাপাশি পরীক্ষামূলকভাবে সাবান, ডিটারজেন্ট ও লবণ বিক্রি শুরু হয়েছে। ভবিষ্যতে আটা, বিভিন্ন মসলা, মরিচ ও হলুদও যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব পণ্য বাজারদরের চেয়ে কম দামে সরবরাহ করা হলেও সরকারি ভর্তুকি দেওয়া হবে না। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক দর্শন রয়েছে।

টিসিবির উদ্দেশ্য বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মতো সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন নয়। আবার প্রতিটি পণ্য অনির্দিষ্টকাল সরকারি ভর্তুকিতে বিক্রি করাও টেকসই ব্যবস্থা হতে পারে না। অতি দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্যে লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি থাকবে, আর অন্য কিছু পণ্য দক্ষ ক্রয় ব্যবস্থার মাধ্যমে কম দামে কিনে সামান্য মার্জিনে বিক্রি করা যাবে- এমন ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে টিসিবিকে আর্থিকভাবে আরও সক্ষম করে তুলতে পারে। সরকারের ভর্তুকির চাপও এতে কিছুটা কমবে।

বাজার নিয়ন্ত্রণ নয়, প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে

একটি বিষয় পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন- ৮ হাজার কোটি টাকার পণ্য কিনলেও টিসিবি একা বাংলাদেশের নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। সেটি হওয়াও উচিত নয়।

সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রতিযোগিতামূলক বাজার নিশ্চিত করা। বেসরকারি আমদানিকারক, উৎপাদক, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরা স্বাভাবিকভাবে ব্যবসা করবেন। কিন্তু কোথাও সরবরাহে অস্বাভাবিক ঘাটতি, অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি কিংবা বাজারে কারসাজি দেখা দিলে সরকার যেন দ্রুত হস্তক্ষেপ করতে পারে- টিসিবিকে সেই সক্ষম প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। অর্থাৎ টিসিবি বাজারের বিকল্প নয়; টিসিবি হবে বাজারের ‘স্ট্যাবিলাইজার’।

এর জন্য টিসিবির পাশাপাশি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, প্রতিযোগিতা কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্যের সমন্বয় প্রয়োজন।

কোন পণ্যের আন্তর্জাতিক দাম কত, দেশে বর্তমানে কত মজুত রয়েছে, কত এলসি খোলা হয়েছে, বন্দরে কত পণ্য অপেক্ষমাণ এবং আগামী তিন মাসে সম্ভাব্য চাহিদা কত- এই তথ্যগুলো সমন্বিতভাবে বিশ্লেষণ করা গেলে সংকট তৈরি হওয়ার পর নয়, সংকট তৈরির আগেই ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।

শেষ বিচারে হিসাব হবে বাজারের ব্যাগে

টিসিবির ৮ হাজার কোটি টাকার ক্রয় পরিকল্পনা নিঃসেন্দেহে বড় উদ্যোগ। ২২ কোটি লিটার ভোজ্যতেল কিংবা লাখ লাখ টন ডাল-চিনি কেনার পরিসংখ্যানও বিশাল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এর সাফল্য সরকারি প্রতিবেদনের সংখ্যায় নির্ধারিত হবে না। আসল পরীক্ষা হবে সাধারণ মানুষের বাজারের ব্যাগে।

রমজানের আগে ছোলা, চিনি, তেল কিংবা খেজুরের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়ল কি না; নিম্ন ও সীমিত আয়ের পরিবার প্রয়োজনের সময় পণ্য পেল কি না; আন্তর্জাতিক বাজারে দাম কমার সুবিধা দেশের ভোক্তার কাছে পৌঁছাল কি না; এবং কোনো সংকটের সুযোগ নিয়ে কেউ অস্বাভাবিক মুনাফা করতে পারল কি না- এসব প্রশ্নের উত্তরের মধ্যেই এই ৮ হাজার কোটি টাকার কর্মসূচির সাফল্য কিংবা ব্যর্থতা নির্ধারিত হবে।

টিসিবিকে তাই শুধু পণ্য কেনা ও বিক্রির সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ধীরে ধীরে একটি আধুনিক বাজার স্থিতিশীলকারী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা প্রয়োজন। তার জন্য দরকার শক্তিশালী বাজার গোয়েন্দা ব্যবস্থা, আগাম ক্রয় পরিকল্পনা, আধুনিক গুদাম ও লজিস্টিক নেটওয়ার্ক, স্বচ্ছ আন্তর্জাতিক দরপত্র, ডিজিটাল সুবিধাভোগী ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনের মুহূর্তে দ্রুত বাজারে হস্তক্ষেপের সক্ষমতা। 
৮ হাজার কোটি টাকার পণ্য কেনার এই উদ্যোগ সেই পরিবর্তনের একটি বড় সুযোগ।

সঠিক সময়ে সঠিক দামে পণ্য কিনে যদি সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়, তাহলে এর সুফল শুধু টিসিবির স্মার্ট কার্ডধারী পরিবারগুলো পাবে না; বৃহত্তর বাজারেও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। আর সেটিই হওয়া উচিত টিসিবির সবচেয়ে বড় লক্ষ্য-শুধু কম দামে সরকারি পণ্য বিক্রি করা নয়, বরং এমন একটি কার্যকর উপস্থিতি তৈরি করা, যাতে নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের কাঁধে গিয়ে না পড়ে।

সিরাজুল ইসলাম
লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

-টিএস

Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝
Advertisement