ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বাংলাদেশসহ সারা বিশ্বে তথ্যে প্রবেশগম্যতা অভাবনীয়ভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে, যা মানুষের কল্যাণে কাজে আসছে। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে মানুষ চাকরি হারানোর আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন। এসব প্রযুক্তি মানুষের অধিকার হরণ ও নির্যাতন বৃদ্ধিতেও সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। তথ্যের পাশাপাশি অপতথ্য, গুজব, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা তথ্য, মানুষের চরিত্রহনন, ভুয়া ছবি-ভিডিও ও ডিপফেক নারী ও শিশুর নিরাপত্তা, মর্যাদা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিচার এবং সামাজিক অংশগ্রহণের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত করে। বিশেষ করে লিঙ্গভিত্তিক অপতথ্য নারীদের কণ্ঠরোধ, সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা, ঘরে আটকে রাখা, ভীতসন্ত্রস্ত করা এবং নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্য বাড়ানোর কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠছে।
নারী ও শিশু সুরক্ষার জন্য, এমনকি নিজেকে রক্ষার জন্যও অপতথ্য কী, তা আগে জানা প্রয়োজন। অপতথ্য বলতে নানা ধরনের ভুল তথ্য বোঝায়। সব ভুল তথ্য একই ধরনের নয়। ভুল তথ্য হলো অজ্ঞতা বা ভুল বোঝাবুঝির কারণে অনিচ্ছাকৃতভাবে ছড়ানো তথ্য। অন্যদিকে, অপতথ্য হলো কাউকে ক্ষতি করা, বিভ্রান্ত করা বা কোনো স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে জেনেশুনে ছড়ানো মিথ্যা তথ্য। ক্ষতিকর তথ্য হলো—সত্য হলেও কারও ব্যক্তিগত তথ্য, ছবি বা পরিচয় অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করে ক্ষতি করা। লিঙ্গভিত্তিক অপতথ্য বলতে নারী হওয়া, নারীর মতামত, পোশাক, পেশা, রাজনৈতিক অবস্থান বা ব্যক্তিগত জীবনকে কেন্দ্র করে মিথ্যা, অপমানজনক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণাকে বোঝায়, যা নারীর জীবনকে অতিষ্ঠ করে তোলে।
জাতিসংঘের মতে, লিঙ্গভিত্তিক অপতথ্যের সঙ্গে বিদ্যমান পিতৃতান্ত্রিক ধারণা, যৌন কুৎসা ও সামাজিক কুসংস্কার যুক্ত হয়ে নারীদের নীরব রাখা বা জনজীবন থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করা হয়। নারী অধিকার কীভাবে ক্ষুণ্ন হয়, তা জানা প্রয়োজন। প্রথমে আলোচনা করা যাক নারীর চরিত্রহনন ও সামাজিক বয়কট নিয়ে। কোনো নারী সম্পর্কে ‘চরিত্রহীন’, ‘অনৈতিক’, ‘পরিবারবিরোধী’ বা ‘ধর্মবিরোধী’—এ ধরনের মিথ্যা প্রচারণা চালালে পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও সমাজে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা কমে যায়। এর ফলে তিনি চাকরি, শিক্ষা, নেতৃত্ব, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও সামাজিক যোগাযোগের সুযোগ হারাতে পারেন। এমনকি অনেকের সংসারও ভেঙে যায়।
আরেকটি বিষয় হলো, আমাদের দেশে সচরাচর ভুক্তভোগীকেই দোষারোপ করা হয়। যৌন হয়রানি, ধর্ষণ, পারিবারিক নির্যাতন বা বাল্যবিবাহের ঘটনায় অপতথ্য ছড়িয়ে বলা হয়, ভুক্তভোগী নিজেই ঘটনার জন্য দায়ী। এ ধারণা অপরাধীকে আড়াল করে এবং নারীর অভিযোগ করার অধিকার দুর্বল করে দেয়।
অপতথ্য অভিযোগ ও বিচারপ্রাপ্তিতে বাধা সৃষ্টি করে। ভুয়া তথ্যের কারণে পুলিশ, আদালত, পরিবার বা সমাজ ভুক্তভোগীর বক্তব্য অবিশ্বাস করতে পারে। এতে মামলা প্রত্যাহার, আপস, সামাজিক চাপ ও বিচারহীনতার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
অনলাইন হয়রানি ও ভয় দেখানো আরেক ধরনের সহিংস অপরাধ। মিথ্যা পোস্ট, ভুয়া অ্যাকাউন্ট, কুৎসামূলক ভিডিও, ব্যক্তিগত ছবি প্রকাশ, ডক্সিং, হুমকি ও যৌন মন্তব্য নারীদের মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে। ইউএন উইমেনের তথ্য অনুযায়ী, নারীদের বিরুদ্ধে প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতার মধ্যে মিথ্যা তথ্য ও মানহানি অন্যতম সাধারণ রূপ। একটি বৈশ্বিক গবেষণায় এ ধরনের ঘটনা ৬৭ শতাংশ নারীর ক্ষেত্রে ঘটতে দেখা গেছে।
অপতথ্যের ফলে নারী-পুরুষ উভয়ের অর্থনৈতিক অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কোনো নারী উদ্যোক্তা, শিক্ষক, কর্মী বা নেত্রীর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালালে তাঁর ব্যবসা, চাকরি, ক্লায়েন্ট, আয় ও পেশাগত মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এভাবে অপতথ্য নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা কমিয়ে নির্যাতনমূলক সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ায়।
অপতথ্যের কারণে নারীর রাজনৈতিক ও জনজীবনে অংশগ্রহণও কমে যেতে পারে। নারী জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও নেত্রীদের বিরুদ্ধে সমন্বিত অপপ্রচার তাঁদের নীরব করতে এবং নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দিতে ব্যবহৃত হয়। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীর প্রতিনিধিত্ব কমে যায়। পরিবার থেকেও এসব পেশায় নারীদের অংশগ্রহণে বাধা দেওয়া হয়।
একইভাবে শিশুদের অধিকারও বিভিন্নভাবে ক্ষুণ্ন হয়। অপতথ্যের কারণে শিশুদের শিক্ষা থেকে বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং আলোকিত জীবন থেকে দূরে রাখা হয়। এতে তাদের স্বনির্ভরতা অর্জনে বাধা সৃষ্টি হয়, পারিবারিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকে না এবং স্বাধীনভাবে বাইরে যাওয়া ও চলাফেরার অধিকার সীমিত বা খর্ব করা হয়।
‘মেয়েকে দ্রুত বিয়ে না দিলে বিপদ হবে’, ‘মেয়েরা বেশি পড়াশোনা করলে অবাধ্য হয়’—এ ধরনের অপতথ্য বাল্যবিবাহকে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য করে তোলে। আবার কোনো মেয়ে শিশুর নামে মিথ্যা প্রেম বা চরিত্রসংক্রান্ত গুজব ছড়ালে পরিবার ‘সম্মান রক্ষার’ নামে দ্রুত বিয়ে দিতে পারে। এতে বাল্যবিবাহের হার বাড়ে। টিকা, যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য, প্রতিবন্ধিতা বা মেয়ে শিশুর শিক্ষাকে কেন্দ্র করে গুজব ছড়ালে অভিভাবকেরা শিশুকে স্কুলে পাঠানো বন্ধ করতে পারেন। এতে শিশুর শিক্ষা, বিকাশ ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সুযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অপতথ্য শিশুর গোপনীয়তা ও মর্যাদাও নষ্ট করে। শিশুর ছবি, ভিডিও, স্কুলের পরিচয়, ঠিকানা বা পারিবারিক তথ্য অনুমতি ছাড়া প্রকাশ করলে তাকে অপমান, ব্ল্যাকমেইল, অপহরণ বা যৌন শোষণের ঝুঁকিতে ফেলা হতে পারে। শিশুদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর বুলিং ও হয়রানি তাদের সুরক্ষার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত। অনলাইন গ্রুমিং ও যৌন শোষণের শিকার হচ্ছে হাজার হাজার কিশোর-কিশোরী। ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধীরা শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্ব করে, ব্যক্তিগত ছবি চায় এবং পরে ব্ল্যাকমেইল করে। মিথ্যা চাকরি, পুরস্কার, মডেলিং বা বন্ধুত্বের প্রস্তাবের মাধ্যমেও শিশু পাচার ও যৌন শোষণের ঝুঁকি বেড়েছে।
মানুষের মধ্যে ভুল ধারণা ছড়িয়ে স্বাস্থ্য ও টিকাদানের পুরো খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। টিকা, চিকিৎসা বা পুষ্টি সম্পর্কে ভুয়া তথ্যের কারণে অভিভাবকেরা শিশুকে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত করতে পারেন। এতে শিশুর জীবন, স্বাস্থ্য ও বেঁচে থাকার অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
অপতথ্য মানুষের মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মমর্যাদারও ক্ষতি করে। এআই-নির্মিত ভুয়া ছবি, অপমানজনক মন্তব্য বা অনলাইন গুজবের শিকার শিশু ভয়, লজ্জা, একাকিত্ব, বিষণ্ণতা ও আত্মক্ষতির চিন্তায় আক্রান্ত হতে পারে। সহপাঠী ও শিক্ষকদের কাছে ছড়ানো ভুল তথ্যের কারণে তরুণী ও কিশোর-কিশোরীরা স্কুলে বুলিং বা সামাজিক বর্জনের শিকার হয়, যা তাদের জীবনকে বিষাদময় করে তোলে।
এআই দিয়ে তৈরি ছবি অথবা ভিডিও সম্পাদনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য ছড়ানোর কারণে নারী নির্যাতনের ঝুঁকি বাড়ছে। অপতথ্য সরাসরি ও পরোক্ষ—দুইভাবেই নির্যাতন বাড়ায়। প্রথমত, মিথ্যা অভিযোগ বা কুৎসা অপরাধীকে ভুক্তভোগীর বিরুদ্ধে সহিংস হতে উসকে দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে ধর্ম, সংস্কৃতি, পোশাক বা ‘পারিবারিক সম্মান’ নিয়ে গুজব শারীরিক নির্যাতন ও তথাকথিত সম্মানরক্ষার নামে সহিংসতা বাড়াতে পারে। নারী বা শিশুর অবস্থান, ফোন নম্বর বা ঠিকানা প্রকাশ করলে অনুসরণ, অপহরণ, যৌন হয়রানি ও হামলার ঝুঁকি বাড়ে। মিথ্যা তথ্যের কারণে অনেক ক্ষেত্রে পরিবার ভুক্তভোগীকেই শাস্তি দেয়, অপরাধীকে নয়। এতে তাঁদের জীবনে অসহায়ত্ব নেমে আসে।
গুজব ছড়িয়ে কোনো সম্প্রদায়, পরিবার বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে গণহয়রানি সৃষ্টি করা যায়। অনলাইনের হুমকি বাস্তব জীবনে অনুসরণ, হামলা বা যৌন সহিংসতায় রূপ নিতে পারে। ইউএন উইমেন প্রযুক্তিনির্ভর লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার মধ্যে অনলাইন হুমকি, সাইবার হয়রানি, স্টকিং, ডক্সিং, ডিপফেক ও অনলাইন গ্রুমিংকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এসবের শিকার ব্যক্তিরা ভয়াবহ ও দুর্বিষহ জীবন যাপন করছেন।
এই ভয়াবহ সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় বিভিন্নভাবে তুলে ধরা যায়। ব্যক্তি ও পরিবারের করণীয় হিসেবে মনে করি, যাচাই না করে কোনো সংবাদ, ছবি, ভিডিও বা অডিও ফরওয়ার্ড করা যাবে না। তথ্য যাচাইয়ের জন্য অন্তত তিনটি বিষয় পরীক্ষা করতে হবে—
১. তথ্যের উৎস কে?
২. প্রকাশের তারিখ ও স্থান কী?
৩. অন্য নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যম বা সরকারি সূত্রে একই তথ্য আছে কি?
সন্দেহজনক ছবির ক্ষেত্রে রিভার্স ইমেজ সার্চ, পুরোনো সংবাদ অনুসন্ধান এবং নির্ভরযোগ্য ফ্যাক্ট-চেকিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করতে হবে। ভুক্তভোগীর নাম, ছবি, ফোন নম্বর, ঠিকানা বা শিশুর পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না। কোনো নারী বা শিশুর বিরুদ্ধে গুজব শুনলে তা ছড়ানোর পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, অভিভাবক বা সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যাচাই করতে হবে। শিশুদের শেখাতে হবে, অনলাইনে অপরিচিত ব্যক্তিকে ব্যক্তিগত ছবি, পাসওয়ার্ড, স্কুলের তথ্য বা অবস্থান জানানো যাবে না। অনলাইন নির্যাতনের প্রমাণ হিসেবে স্ক্রিনশট, লিংক, অ্যাকাউন্টের নাম, তারিখ ও সময় সংরক্ষণ করতে হবে। তবে ক্ষতিকর কনটেন্ট পুনরায় ছড়ানো যাবে না।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও এনজিওগুলোর করণীয়ও গুরুত্বপূর্ণ। স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজ ও কমিউনিটি পর্যায়ে মিডিয়া ও তথ্য-সাক্ষরতা শিক্ষা চালু করতে হবে। শিশু, অভিভাবক, শিক্ষক ও কিশোর-কিশোরীদের জন্য নিরাপদ ইন্টারনেট প্রশিক্ষণের আয়োজন করা প্রয়োজন। গুজব শনাক্তকরণ, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, সাইবার বুলিং ও রিপোর্টিং পদ্ধতি পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। নারী ও শিশুর অভিযোগ গ্রহণের জন্য গোপনীয় ও শিশুবান্ধব ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। কাউন্সেলিং, আইনি সহায়তা, চিকিৎসা ও নিরাপদ আশ্রয়ের সঙ্গে রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পুরুষ ও কিশোরদের অনলাইন দায়িত্ব, সম্মতি, সমতা ও সহিংসতাবিরোধী আচরণ সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। স্থানীয় ভাষায় সহজ ফ্যাক্ট-চেকিং উপকরণ তৈরি করতে হবে। বাংলাদেশে মিডিয়া-সাক্ষরতা ও বাংলা ভাষার যাচাই-সরঞ্জাম বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেরও কিছু করণীয় রয়েছে। সংবাদ প্রকাশের আগে তথ্যের উৎস, ছবি, ভিডিও ও বক্তব্য যাচাই করতে হবে। নারী ও শিশুর ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীকে দোষারোপ করে—এমন ভাষা পরিহার করা জরুরি। ধর্ষণ, যৌন হয়রানি বা নারী ও শিশু নির্যাতনের প্রতিবেদনে পরিচয় গোপন রাখতে হবে। ডিপফেক, ভুয়া ছবি ও সম্পাদিত ভিডিও শনাক্তে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানো সময়ের দাবি। সমন্বিত অপপ্রচার, ভুয়া অ্যাকাউন্ট ও ঘৃণামূলক বক্তব্য দ্রুত শনাক্ত ও অপসারণের পাশাপাশি অভিযোগের দ্রুত প্রতিকার নিশ্চিত করা জরুরি। আপিলের সুযোগ ও প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। সংশোধিত তথ্য এমনভাবে প্রকাশ করতে হবে, যাতে মিথ্যা দাবিটি আবার বেশি মানুষের কাছে ছড়িয়ে না পড়ে—এ বিষয়েও খেয়াল রাখা জরুরি।
রাষ্ট্র ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার করণীয় নিয়েও আলোচনা করা প্রয়োজন। প্রযুক্তিনির্ভর নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত তদন্ত করতে হবে। পুলিশ, আদালত, শিক্ষক, সমাজকর্মী ও সাংবাদিকদের লিঙ্গ-সংবেদনশীল ডিজিটাল নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। ভুক্তভোগীর জন্য বিনামূল্যে আইনি সহায়তা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপত্তা পরিকল্পনা নিশ্চিত করতে হবে। প্ল্যাটফর্মগুলোর কাছ থেকে স্বচ্ছতা, দ্রুত কনটেন্ট অপসারণ ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির অভিযোগ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা চাইতে হবে। অপতথ্য দমনের নামে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বা ভুক্তভোগীর কণ্ঠ যেন দমন না হয়, সে বিষয়ে স্বাধীন তদারকি রাখতে হবে। নারী ও শিশুর বিরুদ্ধে ডিজিটাল সহিংসতার তথ্য সংগ্রহ, গবেষণা ও নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করাও প্রয়োজন।
কেউ আক্রান্ত হলে তাৎক্ষণিক করণীয় কী, এবার আসা যাক সে বিষয়ে। নিরাপত্তাঝুঁকি থাকলে অবিলম্বে নিরাপদ স্থানে যেতে হবে এবং বিশ্বস্ত ব্যক্তি বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানাতে হবে। পোস্ট বা ভিডিওর লিংক, স্ক্রিনশট, ইউজারনেম, সময় ও হুমকির তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে। অপরাধীর সঙ্গে তর্ক না করে অ্যাকাউন্ট ব্লক ও রিপোর্ট করতে হবে।
নারী ও শিশু নির্যাতনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে জাতীয় হেল্পলাইন ১০৯-এ যোগাযোগ করা যায়। কেন্দ্রটি ২৪ ঘণ্টা সেবা দেওয়ার জন্য পরিচালিত হয়। শিশুর ওপর সহিংসতা, নির্যাতন বা শোষণের ক্ষেত্রে শিশু সহায়তা হেল্পলাইন ১০৯৮-এ ফোন করা যায়। অনলাইন হয়রানি বা সাইবার অপরাধের শিকার নারীরা বাংলাদেশ পুলিশের Police Cyber Support for Women-এর হটলাইন 01320000888 এবং ই-মেইল [email protected] ব্যবহার করতে পারেন।
বাংলাদেশের মানুষের জন্য সহজ সামাজিক বার্তা হতে পারে—“যাচাইহীন তথ্য শেয়ার নয়, ভুক্তভোগীকে দোষারোপ নয়, ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ নয়, নির্যাতন দেখলে নীরব নয়।” অপতথ্য মোকাবিলার মূলনীতি হলো—তথ্য যাচাই, ক্ষতিকর কনটেন্ট না ছড়ানো, ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা রক্ষা, দ্রুত রিপোর্ট করা এবং নারী ও শিশুর পাশে দাঁড়ানো।