হৃদরোগের নাম শুনলেই অনেকের মনে হার্ট অ্যাটাকের কথা আসে। কিন্তু হৃদরোগের পরিসর আরও অনেক বড়। উচ্চ রক্তচাপ, করোনারি আর্টারি ডিজিজ, হার্ট ফেইলিওর, অ্যারিদমিয়া, হৃদযন্ত্রের ভালভের সমস্যা, কার্ডিওমায়োপ্যাথি কিংবা জন্মগত হৃদরোগ ভিন্ন ভিন্ন কারণে হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে। বাংলাদেশে পরিবর্তিত জীবনযাপন, অনিয়ন্ত্রিত খাদ্যাভ্যাস, ধূমপান, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপের মতো ঝুঁকি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হৃদরোগও ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যঝুঁকি হয়ে উঠছে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, হৃদরোগের অনেক লক্ষণ মানুষ সময়মতো গুরুত্ব দেন না। বুকের মাঝখানে চাপ বা ব্যথা, হাঁটলে শ্বাসকষ্ট, অল্প পরিশ্রমেই ক্লান্ত হয়ে পড়া, বুক ধড়ফড় করা কিংবা মাথা ঘোরা এসবকে অনেক সময় গ্যাস, দুর্বলতা বা সাময়িক অস্বস্তি হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। বিশেষ করে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি, নারী ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে হৃদরোগের উপসর্গ সবসময় প্রচলিত রূপে নাও দেখা দিতে পারে। ফলে সন্দেহজনক কোনো লক্ষণ দেখা দিলে অপেক্ষা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
এই প্রয়োজনকে সামনে রেখে এভারকেয়ার হসপিটাল ঢাকা-এর কার্ডিওলজি বিভাগ হৃদরোগের রোগীদের জন্য রোগ নির্ণয় থেকে চিকিৎসা ও পরবর্তী ফলো-আপ পর্যন্ত সমন্বিত সেবা প্রদান করছে। অভিজ্ঞ কার্ডিওলজিস্ট, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে রোগীর শারীরিক অবস্থা ও ঝুঁকি বিবেচনা করে চিকিৎসার পরিকল্পনা করা হয়। ফলে একজন রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী প্রাথমিক মূল্যায়ন থেকে শুরু করে জটিল হৃদরোগের ব্যবস্থাপনাও একটি সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থার আওতায় করা সম্ভব। জন্মগত হৃদরোগের চিকিৎসায় কার্ডিয়াক ডিভাইসের মাধ্যমে বুক না কেটে চিকিৎসা প্রদানের ক্ষেত্রেও এই হাসপাতালে রয়েছে দীর্ঘদিনের সফল অভিজ্ঞতা ও আধুনিক চিকিৎসার সুযোগ।
হৃদরোগ নির্ণয়ে রোগীর উপসর্গ ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রাফি, কালার ডপলার ইকো, এক্সারসাইজ টলারেন্স টেস্ট, হোল্টার মনিটরিং, অ্যাম্বুলেটরি ব্লাড প্রেসার মনিটরিংসহ বিভিন্ন পরীক্ষা করা হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী অন্যান্য উন্নত কার্ডিয়াক পরীক্ষা ও ইমেজিংয়ের মাধ্যমে হৃদযন্ত্রের কার্যক্ষমতা এবং রক্তনালির অবস্থা মূল্যায়ন করা হয়। এর উদ্দেশ্য শুধু রোগ শনাক্ত করা নয়, বরং রোগীর জন্য কোন ধরনের চিকিৎসা সবচেয়ে উপযুক্ত হবে, সেই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো।
হৃদযন্ত্রের রক্তনালিতে ব্লক পাওয়া গেলে রোগীর অবস্থা অনুযায়ী করোনারি অ্যাঞ্জিওগ্রাফি, অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি বা স্টেন্টিংয়ের প্রয়োজন হতে পারে। এভারকেয়ার হসপিটাল ঢাকায় আধুনিক ক্যাথ ল্যাবের মাধ্যমে ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। একই সঙ্গে পেসমেকার ইমপ্লান্টেশন, হার্ট ফেইলিওর ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন জটিল হৃদরোগের চিকিৎসাও রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী করা হয়।
হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে চিকিৎসার প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ। বুকে চাপ বা ব্যথার সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, দুর্বলতা, মাথা ঘোরা, বমি ভাব কিংবা ব্যথা হাত, কাঁধ, পিঠ বা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়লে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে ঘরে বসে গ্যাসের ওষুধ খেয়ে অপেক্ষা করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। দ্রুত ইসিজি ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করে হার্ট অ্যাটাক শনাক্ত করা গেলে উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে জরুরি চিকিৎসা দ্রুত শুরু করা সম্ভব।
জটিল হৃদরোগের চিকিৎসায় শুধু একজন চিকিৎসকের সিদ্ধান্তই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থা। এভারকেয়ার হসপিটাল ঢাকায় কার্ডিওলজি সেবার সঙ্গে জরুরি চিকিৎসা, ক্রিটিক্যাল কেয়ার, ডায়াগনস্টিক ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত সেবার সমন্বয়ের সুযোগ রয়েছে। সংকটাপন্ন রোগীর ক্ষেত্রে দ্রুত মূল্যায়ন, প্রয়োজনীয় ইন্টারভেনশন এবং চিকিৎসা-পরবর্তী নিবিড় পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করাও এই সমন্বিত ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তবে হৃদরোগের চিকিৎসা হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরার পরও চলতে থাকে। হার্ট অ্যাটাক বা অন্য কোনো গুরুতর হৃদরোগের পর নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ, রক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, কোলেস্টেরল কমানো, ওজন নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান বন্ধ করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী শারীরিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া জরুরি। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট সময় পরপর ফলো-আপের মাধ্যমে রোগীর হৃদযন্ত্রের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।
হৃদরোগের ঝুঁকি কমানোর শুরুটাও হতে পারে দৈনন্দিন জীবনযাপন থেকেই। স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত হাঁটা বা ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, ধূমপান ও তামাক পরিহার এবং রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ হৃদযন্ত্রকে সুরক্ষিত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ। সবচেয়ে জরুরি হলো শরীরের সতর্কসংকেতকে অবহেলা না করা।
আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ বিশেষজ্ঞ, উন্নত কার্ডিয়াক সুবিধা এবং সমন্বিত চিকিৎসা ব্যবস্থার মাধ্যমে এভারকেয়ার হসপিটাল ঢাকা হৃদরোগীদের বিশ্বমানের সেবা দিতে কাজ করছে। লক্ষ্য শুধু রোগ শনাক্ত বা চিকিৎসা করা নয়; বরং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে জটিলতা কমানো এবং রোগীকে নিরাপদ, স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে সহায়তা করা।
লেখক:
ডা. এ. কিউ. এম. রেজা
সিনিয়র কনসালট্যান্ট অ্যান্ড কো-অর্ডিনেটর
ক্লিনিক্যাল এন্ড ইন্টারভেনশনাল কার্ডিওলজি ডিপার্টমেন্ট
এভারকেয়ার হসপিটাল ঢাকা