প্রতিদিন বাসা থেকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) যাওয়ার আগে একটি প্রশ্ন মাথায় আসে—আজ রাস্তায় কতটা সময় লাগবে? গুলশান থেকে বুয়েটে পৌঁছাতে কতক্ষণ লাগবে, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তাই শুধু কখন পৌঁছাতে চাই, সেটি ভাবলেই চলে না; পথে কতটা বাড়তি সময় রাখতে হবে, সেটিও হিসাব করতে হয়।
এই বাড়তি সময় আসলে কোথা থেকে আসে? আমাদের দিনের অন্য কোনো অংশ থেকেই তো। একটু বিশ্রাম, পরিবারের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলা, নিজের কোনো কাজ কিংবা পড়াশোনার জন্য রাখা সময়—কোথাও না কোথাও কাটছাঁট করেই পথের অনিশ্চয়তার জন্য সময় বরাদ্দ করতে হয়।
গবেষণার কাজ শেষে বাসায় ফেরার সময়ও একই প্রশ্ন—কখন পৌঁছাতে পারব? দিনের কাজ শেষ হলেও যেন ফেরার পথের দুশ্চিন্তা শেষ হয় না। তখন মনে হয়, এই শহরে শুধু আমাদের যানবাহনই আটকে থাকে না; আটকে থাকে আমাদের নাগরিক জীবনের মূল্যবান মুহূর্তগুলোও। ক্রমবর্ধমান এই যানজটে এভাবেই হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের মূল্যবান সময়, কমে যাচ্ছে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ, বাড়ছে শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তি।
অথচ এটি শুধু আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়। বরং ঢাকায় প্রতিদিন কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা চিকিৎসার প্রয়োজনে যাতায়াত করা অসংখ্য মানুষেরই পরিচিত বাস্তবতা। আমরা হয়তো এই অনিশ্চয়তার সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। কিন্তু অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া আর ভালোভাবে বেঁচে থাকা কি এক কথা? একটি শহরে সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে প্রতিদিন বাড়তি সময় হাতে রাখতে হলে প্রশ্ন ওঠে—সমস্যাটা কি শুধু যানবাহনের আধিক্য, নাকি আমাদের নগর ও পরিবহন পরিকল্পনার মধ্যেও মৌলিক ঘাটতি রয়েছে?
অথচ এই শহরেই আমরা প্রতিনিয়ত নতুন সড়ক, উড়ালসড়ক, মেট্রোরেলসহ নানা অবকাঠামো নির্মাণ করছি। তাহলে উন্নয়নের এত দৃশ্যমান পরিবর্তনের পরও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন কতটা সহজ, নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক হয়েছে?
চলুন, এবার একটু পরিসংখ্যানের দিকে তাকানো যাক…
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) ২০২২ সালের জনশুমারির চূড়ান্ত তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মিলিয়ে জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩ লাখ। এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৩৯ হাজার ৪০০ মানুষ বসবাস করেন। গত কয়েক বছরে জনসংখ্যা ও নগরসেবার চাহিদায় আরও পরিবর্তন এসেছে। এত বিপুলসংখ্যক মানুষের আবাসন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, পরিবহন ও অন্যান্য নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে কতটা সুপরিকল্পিত নগরব্যবস্থা প্রয়োজন, তা সহজেই অনুমেয়।
বিশ্বব্যাংকের ২০১৮ সালের Toward Great Dhaka প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পূর্ববর্তী এক দশকে ঢাকার যানবাহনের গড় চলাচলের গতি ঘণ্টায় ২১ কিলোমিটার থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটারে নেমে এসেছিল। যদিও এটি বর্তমান সময়ের পরিমাপ নয়, তবুও ঢাকার দীর্ঘদিনের পরিবহন সংকট বোঝার জন্য যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
পরিবেশের অবস্থাও উদ্বেগজনক। IQAir-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ঢাকার বাতাসে বার্ষিক গড় PM2.5-এর ঘনত্ব ছিল প্রতি ঘনমিটারে ৬৮ মাইক্রোগ্রাম, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) বার্ষিক বায়ুমান নির্দেশিকা অনুযায়ী সুপারিশকৃত মাত্রার ১৩.৬ গুণ। ২০২৪ সালের তুলনায় কিছুটা উন্নতি হলেও এই দূষণ জনস্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।
এই পরিসংখ্যানগুলো কেবল কিছু সংখ্যা নয়। এগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের প্রতিদিনের জীবন, সময়, স্বাস্থ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা।
তাহলে সমস্যার শিকড় কোথায়?
আমার মনে হয়, সমস্যার একটি বড় অংশ লুকিয়ে আছে আমাদের অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়নব্যবস্থার মধ্যে।
দেশের প্রশাসনিক কার্যক্রম, উচ্চশিক্ষা, বিশেষায়িত চিকিৎসা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের উল্লেখযোগ্য অংশ রাজধানীকেন্দ্রিক। ফলে উন্নত জীবন ও জীবিকার আশায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ঢাকায় আসছেন। এটি খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে আমাদের নগর অবকাঠামো ও নাগরিক সেবার সক্ষমতা কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ?
একইভাবে, আমাদের সড়কপথ, রেলপথ, মেট্রোরেল এবং আশপাশের নৌপথের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে। ফলে যাতায়াতের একটি বড় চাপ এসে পড়ছে সড়কপথের ওপর। ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরতা এবং পর্যাপ্ত মানসম্মত গণপরিবহনের অভাব পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
অন্যদিকে, অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ, জলাশয় ও সবুজ এলাকা কমে যাওয়া, দুর্বল পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা এবং পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা নগরজীবনকে আরও কঠিন করে তুলছে।
প্রকৌশলী হিসেবে আমাদের দায়িত্ব কোথায়?
আমি মনে করি, প্রকৌশলীদের ভূমিকা শুধু অবকাঠামো নির্মাণে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। কোনো উদ্যোগ বাস্তবায়নযোগ্য কি না, দীর্ঘমেয়াদে সেটি রক্ষণাবেক্ষণ করা যাবে কি না, মানুষের প্রয়োজন কতটা মিটবে এবং পরিবেশের ওপর কী প্রভাব পড়তে পারে—এসব প্রশ্নেও আমাদের সক্রিয়ভাবে অবদান রাখা প্রয়োজন।
একজন প্রকৌশলী হিসেবে আমার কাছে ঢাকার সমস্যাগুলোকে শুধু যানজট, বায়ুদূষণ কিংবা অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণের পৃথক সমস্যা বলে মনে হয় না। বরং এগুলো অনেকাংশে একটি বৃহত্তর পরিকল্পনা ও সমন্বয়গত দুর্বলতার সঙ্গে সম্পর্কিত। একটি শহরের পরিবহন, আবাসন, পরিবেশ এবং নাগরিক সেবার পরিকল্পনা যখন পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না, তখন অবকাঠামোগত উন্নয়নের সুফলও সাধারণ মানুষের জীবনে পুরোপুরি পৌঁছায় না।
তবে একজন প্রকৌশলী হিসেবে আমার ভাবনাই একমাত্র সমাধান নয়। নগর পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি, পরিবেশবিদ, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, প্রশাসন এবং নাগরিকদের অভিজ্ঞতাও এই আলোচনায় সমান গুরুত্ব পেতে হবে। যারা প্রতিদিন এই শহরের পথে চলেন এবং এর সেবা ব্যবহার করেন, তাদের কথা না শুনে আমরা কাদের জন্য পরিকল্পনা করব?
আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি শহর শুধু সড়ক, সেতু কিংবা উঁচু ভবনের সমষ্টি নয়। একটি শহরের প্রকৃত সার্থকতা নির্ভর করে তার নাগরিকেরা কতটা নিরাপদে, সুস্থ পরিবেশে এবং স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করতে পারছেন, তার ওপর।
তাহলে আমরা কী করতে পারি?
আমার বিশ্বাস, ঢাকাকে বাসযোগ্য করে তুলতে হলে উন্নয়ন পরিকল্পনাকে আরও সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি করতে হবে। দেশের অন্যান্য শহরে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও প্রশাসনিক সুবিধার বিস্তার ঘটিয়ে ঢাকার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে হবে। পাশাপাশি সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনকে কার্যকরভাবে সংযুক্ত করতে হবে এবং নগর উন্নয়নে পরিবেশ সংরক্ষণ ও নাগরিক নিরাপত্তাকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে।
এসব পরিবর্তন রাতারাতি সম্ভব নয়। তবে সঠিক পরিকল্পনা, প্রকৌশলগত বিশ্লেষণ, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয় এবং কার্যকর বাস্তবায়নের মাধ্যমে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি করা সম্ভব।
আমরা এমন একটি ঢাকা চাই, যেখানে উন্নয়নের সুফল শুধু অবকাঠামোর দৃশ্যমান পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং প্রতিফলিত হবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের স্বস্তি, নিরাপত্তা ও সুস্থতায়। একসময় ঢাকাকে ভালোবেসে ‘তিলোত্তমা ঢাকা’ হিসেবে কল্পনা করা হতো। সেই সৌন্দর্য, প্রাণচাঞ্চল্য আর নাগরিক স্বস্তির স্বপ্ন কি আমরা আবার ফিরিয়ে আনতে পারি না? তবে আমাদের লক্ষ্য শুধু অতীতের ঢাকায় ফিরে যাওয়া নয়; বরং আধুনিক নগর পরিকল্পনা, সমন্বিত পরিবহনব্যবস্থা, সবুজ পরিবেশ এবং নাগরিকবান্ধব অবকাঠামোর মাধ্যমে একটি নতুন ‘তিলোত্তমা ঢাকা’ গড়ে তোলা। যে ঢাকা শুধু দেখতে সুন্দর হবে না, হবে নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর, সুশৃঙ্খল এবং সত্যিকার অর্থে বাসযোগ্য।
এই ভাবনা থেকেই আগামী পর্বগুলোতে ঢাকার অপরিকল্পিত নগরায়ন, পরিবহনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, পরিবেশগত সংকট, ঢাকাকেন্দ্রিক উন্নয়ন ও বিকেন্দ্রীকরণের প্রয়োজনীয়তা এবং এসব সমস্যার সম্ভাব্য প্রকৌশলগত সমাধান নিয়ে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করতে চাই। আমার উদ্দেশ্য শুধু সমস্যাগুলো তুলে ধরা নয়; বরং নিজের অভিজ্ঞতা ও প্রকৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে সমস্যার কারণগুলো বোঝার চেষ্টা করা, বাস্তবসম্মত সমাধানের পথ খোঁজা এবং আপনাদের মতামত ও অভিজ্ঞতা থেকে নতুন কিছু শেখা।
সবশেষে একটি প্রশ্ন রেখে যেতে চাই—
আমরা কি শুধু একটি আধুনিক রাজধানী গড়ে তুলছি, নাকি সত্যিকার অর্থে একটি বাসযোগ্য ঢাকা নির্মাণের পথে এগোচ্ছি?
আপনাদের মতামত ও অভিজ্ঞতা জানতে চাই।
চলবে...
লেখক- ইফতেশাম বাশার
পেশা- পুরপ্রকৌশলী এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক
-টিএস