একজন রোগী যখন চিকিৎসকের কাছে যান, তখন তিনি শুধু রোগের চিকিৎসা চান না; চান তাঁর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা হোক, উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া হোক এবং তাঁর শারীরিক ও মানসিক অবস্থাকে বোঝার চেষ্টা করা হোক। অনেক সময় চিকিৎসকের কাছ থেকে পাওয়া একটি আশ্বাসপূর্ণ কথা, ধৈর্য নিয়ে শোনা কয়েকটি বাক্য কিংবা সহজ ভাষায় দেওয়া একটি ব্যাখ্যা রোগীর পুরো চিকিৎসা-অভিজ্ঞতাকে বদলে দিতে পারে। তাই চিকিৎসার সাফল্য নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ওষুধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি সহমর্মিতার গুরুত্বও সমানভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসার ক্ষেত্রে অভাবনীয় পরিবর্তন এসেছে। আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত রোগনির্ণয় পদ্ধতি এবং বিশেষায়িত চিকিৎসা মানুষের সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনাকে অনেক ক্ষেত্রে বাড়িয়েছে। কিন্তু চিকিৎসার এই অগ্রগতির মধ্যেও একটি মৌলিক বিষয় অপরিবর্তিত রয়েছে—রোগী একজন মানুষ, যাঁর ভয়, প্রত্যাশা, পারিবারিক বাস্তবতা এবং ব্যক্তিগত উদ্বেগ রয়েছে। রোগীর শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি এসব বিষয় বোঝার চেষ্টা না করলে চিকিৎসাসেবা অনেক সময় প্রয়োজনীয় মানবিক মাত্রা হারাতে পারে।
সহমর্মিতা মানে শুধু রোগীর প্রতি সদয় আচরণ নয়। এর অর্থ হলো তাঁর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা, তাঁর উদ্বেগের কারণ বোঝা, প্রশ্ন করার সুযোগ দেওয়া এবং চিকিৎসার সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তাঁকে যথাযথভাবে অবহিত করা। একজন রোগী যখন নিজের উপসর্গ, পূর্বের অভিজ্ঞতা কিংবা চিকিৎসা নিয়ে ভয় প্রকাশ করার সুযোগ পান, তখন চিকিৎসক তাঁর অবস্থা সম্পর্কে আরও প্রাসঙ্গিক তথ্য জানতে পারেন। ফলে রোগীর প্রয়োজন বুঝে চিকিৎসার পরিকল্পনা করতে সুবিধা হয়। এ কারণেই রোগীকে মনোযোগ দিয়ে শোনা কেবল ভালো ব্যবহারের অংশ নয়; এটি কার্যকর চিকিৎসা-যোগাযোগেরও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
ধরা যাক, একজন রোগী দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন, কিন্তু নিজের উপসর্গ ঠিকভাবে ব্যাখ্যা করতে পারছেন না। তিনি হয়তো ভয়ের কারণে কিছু কথা বলতে সংকোচ বোধ করছেন, অথবা আগের কোনো নেতিবাচক অভিজ্ঞতার কারণে চিকিৎসা নিয়ে উদ্বিগ্ন। এমন পরিস্থিতিতে তাঁকে তাড়াহুড়া না করে কথা বলার সুযোগ দেওয়া এবং প্রয়োজনীয় প্রশ্নের মাধ্যমে তাঁর অভিজ্ঞতা বোঝার চেষ্টা করা গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর বক্তব্যের সঙ্গে চিকিৎসাগত মূল্যায়ন ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষার সমন্বয় ঘটলেই একটি যুক্তিসংগত চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করা সম্ভব।
চিকিৎসায় সহমর্মিতা রোগীর আস্থা তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রোগী যখন বুঝতে পারেন যে তাঁর কথা গুরুত্ব দিয়ে শোনা হচ্ছে, তখন তিনি নিজের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য আরও খোলামেলাভাবে জানাতে এবং চিকিৎসকের নির্দেশনা সম্পর্কে প্রশ্ন করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতে পারেন। চিকিৎসা নিয়ে কোনো অস্পষ্টতা থাকলে তা পরিষ্কার করার সুযোগও তৈরি হয়। অন্যদিকে, রোগীর প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া, জটিল ভাষায় ব্যাখ্যা দেওয়া কিংবা তাঁর উদ্বেগকে গুরুত্ব না দেওয়ার অভিজ্ঞতা ভুল বোঝাবুঝি ও অনাস্থা তৈরি করতে পারে।
এখানে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের যোগাযোগদক্ষতার পাশাপাশি হাসপাতালের সামগ্রিক সেবাব্যবস্থারও ভূমিকা রয়েছে। রোগীর সঙ্গে প্রথম যোগাযোগ থেকে শুরু করে নিবন্ধন, অপেক্ষা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, চিকিৎসা এবং পরবর্তী ফলোআপ—প্রতিটি পর্যায়ে সম্মানজনক আচরণ ও স্পষ্ট তথ্য প্রদান জরুরি। একজন নার্সের ধৈর্যশীল ব্যাখ্যা, একজন কর্মীর সহযোগিতাপূর্ণ আচরণ কিংবা চিকিৎসা-পরবর্তী নির্দেশনা সহজ ভাষায় বুঝিয়ে দেওয়ার মতো বিষয়গুলোও রোগীর অভিজ্ঞতায় উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে সহমর্মিতা মানে রোগীকে সব সময় তাঁর পছন্দমতো সিদ্ধান্ত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি নয়। চিকিৎসার সিদ্ধান্ত নিতে হয় বৈজ্ঞানিক প্রমাণ, রোগীর অবস্থা, সম্ভাব্য ঝুঁকি এবং তাঁর অবগত সম্মতিকে গুরুত্ব দিয়ে। কোনো চিকিৎসা প্রয়োজন না হলে তা ব্যাখ্যা করা, ঝুঁকি থাকলে তা স্পষ্টভাবে জানানো এবং বিকল্প পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করাও দায়িত্বশীল চিকিৎসার অংশ। সহমর্মিতার সঙ্গে পেশাগত সততা ও চিকিৎসাগত বিচক্ষণতার সমন্বয়ই রোগীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
স্বাস্থ্যসেবায় মানবিক যোগাযোগ নিশ্চিত করতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণে সহমর্মিতা, সক্রিয়ভাবে শোনা, সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা এবং কঠিন পরিস্থিতিতে যোগাযোগের দক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে হাসপাতালগুলোতে এমন পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি, যেখানে রোগী প্রশ্ন করতে পারেন, নিজের উদ্বেগ প্রকাশ করতে পারেন এবং প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার অধিকার অনুভব করেন। সেবার মান মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও রোগীর অভিজ্ঞতা ও মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে।
আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার ভবিষ্যৎ শুধু আরও উন্নত প্রযুক্তি বা আধুনিক অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে সেই প্রযুক্তি ও দক্ষতাকে রোগীর প্রয়োজনের সঙ্গে কতটা মানবিকভাবে যুক্ত করা যাচ্ছে, তার ওপর। চিকিৎসা মানে শুধু রোগ শনাক্ত করা কিংবা উপসর্গ কমানো নয়—রোগীকে বোঝা, তাঁর উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়া এবং চিকিৎসার প্রতিটি ধাপে তাঁকে যথাযথভাবে সম্পৃক্ত করাও এর অংশ। কারণ, একজন রোগীকে মনোযোগ দিয়ে শোনা মানে শুধু তাঁর কথা শোনা নয়; বরং তাঁর সুস্থতার পথে আরও কার্যকর, দায়িত্বশীল ও মানবিক সহযোগিতার ভিত্তি তৈরি করা।
লেখক : হেড অব ডিজিটাল, ব্র্যান্ড অ্যান্ড পিআর, এভারকেয়ার হাসপাতাল চট্টগ্রাম।