জীবনের প্রাথমিক ও মৌলিক চাহিদা হিসেবে আমাদের প্রয়োজন ছিল কেবল খাদ্য, শীত নিবারণের কিছু পোশাক, নিরাপদ আশ্রয়ে একটু বিশ্রাম এবং পরস্পরের সহযোগিতা, যা বেঁচে থাকার জন্য সম্পূর্ণ যথেষ্ট ছিল। কিন্তু সামাজিক পরিবেশে শৈশব থেকে বেড়ে ওঠার পথে আমরা এমনভাবে অভ্যস্ত হয়ে উঠলাম যে, আমাদের মন প্রবেশ করল সম্মান ও মর্যাদার চিরন্তন এক আকাঙ্ক্ষায়। সম্মান বা মর্যাদার এই অনুভব মানুষের মধ্যে এমন এক তুলনামূলক প্রতিযোগিতার জন্ম দিল, যেখানে অন্যের চেয়ে নিজেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বা মূল্যবান হিসেবে তুলে ধরার কোনো শেষ প্রান্তসীমা নেই। এর ফলে জীবনের মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য যতটুকু শ্রম বা প্রচেষ্টার প্রয়োজন ছিল, তা হঠাৎ রকেটের গতিতে বেড়ে গেল এবং আমরা কে কার চেয়ে বেশি সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করে নিজের গুরুত্ব বাড়াতে পারি, সেই অন্তহীন প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়লাম।
মর্যাদাবৃদ্ধির এই লোভ মানুষের মনে যে শক্তির জন্ম দিল, তা হয়ে উঠল আধুনিক উদ্ভাবন ও জমকালো সভ্যতার জ্বালানি। অন্যদিকে ক্ষমতাবান মানুষেরা আরও ক্ষমতার লোভে মেতে উঠল, ধনীরা আরও ধনী হওয়ার সংগ্রামে লিপ্ত হলো। আর মর্যাদার এই প্রবল প্রতিযোগিতায় ক্ষমতাধর ও ধনীদের বুদ্ধির কৌশলের কাছে হেরে গেল সাধারণ মানুষ, যার ফলশ্রুতিতে জন্ম নিল নানা শ্রেণিভেদ এবং বিশেষ করে ধনী ও দরিদ্রের বিশাল ব্যবধান। এই বৈষম্যের চূড়ায় পৌঁছে একসময় ধনীরা গরিব মানুষদের কেনাবেচা শুরু করেছিল, যা মানব ইতিহাসের পাতায় ক্রীতদাস প্রথা হিসেবে এক কলঙ্কিত অধ্যায় হয়ে রয়েছে।
পরবর্তীতে ধনীরা নিজেদের মানবিক ও আধুনিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার স্বার্থে দেশে দেশে ক্রীতদাস প্রথা নিষিদ্ধ ঘোষণা করল। কিন্তু মর্যাদা আর সম্মানের সেই আদিম প্রতিযোগিতা শেষ হলো না; সেই কৌশল আরও নতুন ও অদৃশ্য এক রূপ লাভ করল। গরিব মানুষদের সামনে সম্মান ও মর্যাদার এক নতুন পথ ও অভ্যাস ঝুলিয়ে দেওয়া হলো। সাধারণ মানুষেরাও কীভাবে সম্পদ ও জৌলুস বাড়িয়ে সম্মানিত ও মর্যাদাবান হওয়া যায়, সেই চর্চায় অভ্যস্ত হয়ে উঠল। আর ঠিক তখনই সেই সম্মান ও মর্যাদার লোভনীয় অনুভবকে সাধারণ মানুষকে নিয়ন্ত্রণের মোক্ষম অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা শুরু হলো। প্রাচীন যুগের সেই শারীরিক বলপ্রয়োগ বা চাবুকের শাসন রূপ নিল আধুনিক মনস্তাত্ত্বিক দাসত্বে, যেখানে মানুষ আর বলপ্রয়োগের মাধ্যমে নয়, বরং মর্যাদা ও সম্মানের মোহে অন্ধ হয়ে স্বেচ্ছায় সেই চিরন্তন প্রতিযোগিতার চাকায় নিজেকে সঁপে দিল। তাই, “মর্যাদাবোধের ইঞ্জিনিয়ারিং কি উন্নতির সোপান নাকি অশান্তির নরক?”—এই প্রশ্নটি বিজ্ঞ পাঠকের কাছেই রেখে গেলাম।
কেন আত্মসম্মানী মানুষ জগতের সবচেয়ে সুখী মানুষ?
মানুষ জন্ম থেকেই সুখে থাকার জন্য সংগ্রাম করে যাচ্ছে। কেউ সুখ খোঁজে সম্পদের পাহাড়ে, কেউ ক্ষমতার উচ্চাসনে, আবার কেউ বা বাহ্যিক জৌলুস ও সামাজিক খ্যাতিতে। কিন্তু ইতিহাসের গভীর বিশ্লেষণ প্রমাণ করে যে, এই বস্তুগত ইঁদুর দৌড়ে কেউ কখনো পরিতৃপ্তির নাগাল পায় না। বরং পৃথিবীর তাবৎ সুখ, শান্তি ও মানসিক স্বাধীনতার মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে মানুষের ভেতরকার যে এক উচ্চতর শক্তির মাঝে, তা হলো সততা, দায়িত্বশীলতা, আর মমতার মতো নৈতিক শক্তিতে মজবুত আত্মসম্মানবোধ।
একজন এমন আত্মসম্মানী মানুষ কখনোই কাউকে ভয় পান না; তিনি নিজের নৈতিক কোড বা মূল্যবোধকে পৃথিবীর যেকোনো কিছুর চেয়ে বেশি মূল্য দেন এবং এর মাধ্যমে এক গভীর ও দীর্ঘমেয়াদি তৃপ্তি অনুভব করেন। সাধারণ মানুষ প্রতিনিয়ত সমাজের বেঁধে দেওয়া বহিরাগত মানদণ্ড অর্জনের এক অন্তহীন প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত থাকে এবং অন্যের কাছ থেকে বাহবা বা ‘ভ্যালিডেশন’ পাওয়ার কাঙালপনায় অদৃশ্য মানসিক চাপে ভোগে। কিন্তু একজন আত্মসম্মানী মানুষ নিজের মর্যাদা পরিমাপ করার জন্য বাইরের পৃথিবীর ওপর বিন্দুমাত্র নির্ভর করেন না; ফলে অন্যের প্রশংসা বা অবমূল্যায়ন তাঁকে আর আন্দোলিত করতে পারে না এবং এই অনুভূতিই তাঁকে এনে দেয় পরম মানসিক স্বাধীনতা।
আধুনিক সমাজব্যবস্থা নেগেটিভ মাইন্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে মানুষকে ভোগের অন্তহীন প্রতিযোগিতায় নামিয়ে দিয়ে চলছে, কিন্তু আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন মানুষ সেই লোভের দাসে পরিণত হন না। নিজের যতটুকু প্রয়োজন, তাতেই তিনি সন্তুষ্ট থাকেন এবং অতিরিক্ত পাওয়ার মোহে নিজের মূল্যবোধকে কখনো বিকিয়ে দেন না। আত্মসম্মানের মূল ভিত্তি হলো নিজের নৈতিক মানদণ্ড ও দায়িত্ববোধ। একজন আত্মসম্মানী মানুষ যখন প্রতিদিনের ছোট ছোট সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে নিজের কাজ পরিচালনা করেন এবং নিজের বিবেকের কাছে সম্পূর্ণ সৎ থাকেন, তখন তাঁর মস্তিষ্ক থেকে নিঃসৃত হরমোন তাঁর মেজাজকে স্থিতিশীল রাখে ও মানসিক চাপ থেকে মুক্ত করে। অতীতে হয়তো নিজে না খেয়ে অন্যকে খাওয়ানোর আনন্দ কিংবা বড় কোনো ক্ষতি মেনে নিয়েও সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহসিকতা তাঁকে আজীবন এক অভ্যন্তরীণ প্রশান্তি দিয়ে যায়। পার্থিব যেকোনো অর্জনের চেয়ে নিজের সততা বজায় রাখতে পারার এই আনন্দ তাঁর কাছে অনেক বেশি মূল্যবান আনন্দের উৎস হয়ে থাকে।
জীবন অনিশ্চিত; আপনজনেরা দূরে সরে যেতে পারে, অর্থ-সম্পদ বা ক্ষমতার দাপট মুহূর্তের মধ্যে ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু যিনি নিজের আত্মসম্মান ও নৈতিক মূল্যবোধকে রক্ষা করে জীবনযাপন করতে অভ্যস্ত, তিনি জীবনের যেকোনো পরিস্থিতিতে মজবুত থাকেন। এমন মানুষ কোনো কিছু হারানোর ভয়কে জয় করার অপ্রতিরোধ্য মানসিক শক্তি লাভ করেন। তিনি নিশ্চিত থাকেন, কারণ বাহ্যিক সবকিছু কেড়ে নেওয়া সম্ভব, কিন্তু তাঁর ভেতরের সততা ও আত্মমর্যাদাকে কেউ কখনো কেড়ে নিতে পারবে না।
বাহ্যিক সম্মান ভঙ্গুর, কিন্তু সত্যিকারের সম্মান হলো মানুষের নিজের ভেতরের আয়না থেকে প্রতিফলিত হওয়া এক প্রশান্তি। বৈষম্যহীন জীবনযাপন, দুর্বলদের অগ্রাধিকার দেওয়া এবং নিজের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করার মাধ্যমে এই মানুষগুলো সব সময় নিজেকে ভেতর থেকে ধনী ও পূর্ণাঙ্গ অনুভব করেন। এটি এমন এক একান্ত নিজস্ব অনুভূতি, যা বাইরের দুনিয়ার কোনো বাহ্যিক স্বীকৃতি বা অন্যের ভ্যালিডেশনের ওপর বিন্দুমাত্র নির্ভর করে না। তাই স্ট্যাটাস বা বাহ্যিক জৌলুসের মোহ যাঁদের অন্ধ করতে পারে না এবং যাঁরা নিজের মূল্যবোধের প্রশান্তিকে জীবনের সেরা সম্পদ বলে মনে করার অভ্যাসে অভ্যস্ত, তারাই হন সবচেয়ে স্বাধীন, নির্ভীক ও সুখী মানুষ।
ভেবে দেখুন তো, এমন মানুষেরা যখন জীবন শেষ করে মারা যাচ্ছেন বলে বুঝতে পারেন, তখন তারা কেমন অনুভব করেন?
একজন ধনী ব্যক্তি যিনি সারা জীবন সম্পদ অর্জনের জন্য সংগ্রাম করে ধনী হয়েছেন, মৃত্যুর সময়ে স্বাভাবিকভাবেই তাঁর ধনসম্পদের মায়া ছেড়ে যেতে ভীষণ ভয় পান; খ্যাতিমান মানুষ তাঁর খ্যাতির সেই অনুষ্ঠানগুলো শেষ হয়ে যাচ্ছে অনুভব করে কষ্ট পাবেন সেটাই স্বাভাবিক। ক্ষমতাবান মানুষ ক্ষমতার দিন শেষ হচ্ছে—এমন বেদনায় কাতর থাকেন; আর যারা প্রিয়জনদের ভালোবাসাকে জীবনের সেরা অর্জন বলে অনুভব করতে অভ্যস্ত, তারাও ছেড়ে যেতে হাহাকার করেন। কিন্তু এমন একজন যিনি তাঁর সারা জীবন আত্মসম্মানবোধ ও নৈতিকতাকে সর্বোচ্চ ভালোবেসে নিজের কাছে নিজের পরিচয় প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন, তাঁর বিদায়বেলা সম্পূর্ণ আলাদা।
এমন একজন মানুষ মৃত্যুর অন্তিম মুহূর্তে পার্থিব কোনো প্রাপ্তি বা হারানোর হিসাব নিয়ে চিন্তিত হন না। জীবন চলার পথে নিজের বিবেকের কাছে তিনি যে সততা, মমতা আর দায়িত্ব রক্ষার আত্মিক সম্পদ তৈরি করেছিলেন, সেই পরম আত্মসম্মানের অনুভবকে সাথেই নিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ফেলেন। বাহ্যিক সবকিছুই পড়ে থাকে, কিন্তু তাঁর ভেতরের নৈতিক বিজয় ও মূল্যবোধ তাঁকে মৃত্যুকালীন যেকোনো ভয় ও আতঙ্ক থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রাখে।
(লেখক: মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক)