আপনার শ্রম আপনার সম্পদ এবং আপনার স্বাধীনতা কেবলই আপনার। এই ধারনাটি মানব সভ্যতার ইতিহাসে এক অসাধারণ সৃষ্টি। মধ্যযুগের রাজা-মহারাজাদের একচেটিয়া আভিজাত্যবাদ ও চরম শোষণের বিপরীতে সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার এক অবিস্মরণীয় যাত্রা এনে দিয়েছিল এই ধারণা। কিন্তু কার্ল মার্কস পুঁজিবাদের এই যুগান্তকারী ধারণার ভেতরে লুকিয়ে থাকা একটি ভয়াবহ দানবকে খুব স্পষ্টভাবে দেখতে পেয়েছিলেন। তাই তিনি সতর্ক করে বলেছিলেন, ‘যেন এক বিশাল অজগর নিজেই নিজেকে গিলে খাচ্ছে, এমনই হবে পুঁজিবাদের চূড়ান্ত পরিণতি’।
কেন তিনি এমন কথা বলেছিলেন? তার কারণ পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মূল সুরটাই এমন যে, সে শুধু বাজারকে আরও বড় করতে চায়। সে চায় আরও বেশি পণ্য বিক্রি করতে, আরও বেশি মুনাফা লুটতে এবং বাজারে প্রতিযোগিতা আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে। এই প্রক্রিয়ায় সমাজে এক বিপুল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়, মানুষের কর্মসংস্থান বাড়ে, নতুন নতুন শহর গড়ে ওঠে, আর আধুনিক ও নব্য প্রযুক্তির দ্রুত উদ্ভাবন হয়। ওপর থেকে দেখলে এটি এক অসাধারণ উন্নয়ন তত্ত্ব। কিন্তু এক সময় নদীর পানি বাড়তে বাড়তে যেমন কুল উপচে যায়, ভয়ানক বন্যা সৃষ্টি করে সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়, ঠিক তেমনই পুঁজিবাদের ভেতরেই সুপ্ত থাকে সেই ধ্বংসাত্মক শক্তি, সবকিছু ভাসিয়ে দেওয়ার তুফান।
মার্কস দেখিয়েছিলেন, প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে গিয়ে পুঁজিপতিরা যখন প্রযুক্তি দিয়ে মানুষকে প্রতিস্থাপন করে কিংবা মুনাফা সর্বোচ্চ করতে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরিকে অগ্রায্য করে, তখন এক অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বাজারে পণ্যের পাহাড় জমে ঠিকই, কিন্তু ক্রেতার পকেটে সেই পণ্য কেনার মতো টাকা থাকে না; দেখা দেয় ওভারপ্রোডাকশনের সংকট। একদিকে কিছু মানুষের হাতে অঢেল সম্পদ জমা হয় আর অন্যদিকে সাধারণ মানুষের চরম দারিদ্র্য; সম্পদ কিছু মানুষের হাতে কুক্ষিগত হয়ে সমাজকে এক তীব্র বৈষম্যের দিকে ঠেলে দেয়।
আজ বিশ্বের মাত্র শীর্ষ ১ শতাংশ ধনীর হাতে রয়েছে পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি সম্পদ। বিপরীতে, বিশ্বের প্রায় ৪০০ কোটি মানুষের জীবন চলছে বৈশ্বিক সম্পদের মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ দিয়ে। তীব্র মূল্যস্ফীতির সংকটের মাঝেও বিশ্বজুড়ে বিলিয়নিয়ারদের সম্পদ রেকর্ড গতিতে বাড়ছে। অন্যদিকে, প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষকে খাদ্য, পানি ও চিকিৎসার মতো মৌলিক চাহিদা মেটাতে সীমাহীন সংগ্রাম করতে হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী কর কাঠামো ধনীদের পক্ষে সহজ ও সুবিধাজনক। বড় বড় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ও অতি-ধনীরা আইনি ফাঁকফোকর এবং 'ট্যাক্স হ্যাভেন' ব্যবহার করে শত শত বিলিয়ন ডলার ট্যাক্স ফাঁকি দিচ্ছে। ফলে রাষ্ট্র সাধারণ জনগণের কল্যাণে বা বৈষম্য কমাতে প্রয়োজনীয় সামাজিক সুরক্ষায় বিনিয়োগ ব্যর্থ হচ্ছে। ডিজিটাল যুগে বড় বড় প্রযুক্তি জায়ান্ট বা সিলিকন ভ্যালির প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্ব বাজারের সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ফলে একদিকে সাধারণ মানুষের চাকরি সংকুচিত হচ্ছে, অন্যদিকে সমস্ত প্রযুক্তিগত অর্থনৈতিক মুনাফা জমা হচ্ছে গুটি কয়েক গ্লোবাল করপোরেশনের পকেটে।
এমনই সব বৈষম্যের বিরুদ্ধে জমে থাকা ক্ষোভের আগুনে ২০২৪ এর জুলাই বুক পেতে বাংলার শহীদ আবু সাঈদ আজও পুলিশের বুলেটের সামনে জীবন্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। ২০২৫ এর সেপ্টেম্বরে নেপালে তরুণদের আন্দোলনের পেছনের মূল কারণ ছিল বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা দুর্নীতি, চরম বেকারত্ব ও সীমাহীন হতাশা। আজ ফ্রান্সের ছাত্ররা রাজপথে নেমে এসেছে কেবল একটু ভালো মানের শিক্ষার পরিবেশটুকু পাওয়ার আশায়। ইতালিতে যুদ্ধবিরোধী প্রতিবাদ। স্পেনের ৮৭ বছর বয়সী এক বৃদ্ধাকে বাসস্থান থেকে উচ্ছেদ করার পর তিনি মারা গেলেন, কিন্তু তিনি কেবল একা নন, একটি সামান্য আশ্রয় পাওয়ার স্বপ্ন আজ সেখানে লক্ষ লক্ষ তরুণের কাছে এক অসম্ভব লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে। আমেরিকাতেও ছড়িয়ে পড়েছে জেন জি আন্দোলন; ভারতের তরুণেরা অধিকার রক্ষার সংগ্রামে এখনও রাজপথে। কিন্তু কেন এত সব আন্দোলন? আসলে আন্দোলন গুলির ভাষা আলাদা কিন্তু সব জেন জি আন্দোলনের মূল সূত্র একই সুতায় বাঁধা।
আজ সারা বিশ্বে যে জেন জি আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে—তার মূলে রয়েছে পুঁজিবাদের সেই একই আত্মবিনাশী সূত্র। আজকের তরুণ প্রজন্ম দিনরাত পরিশ্রম করেও মাথার ওপর একটা ছাদ জোগাড় করতে পারছে না, কারণ আবাসন আজ সাধারণ চাহিদার বদলে অতি-মুনাফার ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা আর কর্মসংস্থান সবকিছুতেই এক তীব্র অনিশ্চয়তা। পুঁজিবাদের লাগামহীন মুনাফার লোভে প্রকৃতির ওপর যে তাণ্ডব চালানো হয়েছে, তার ফলে সৃষ্টি হওয়া জলবায়ু সংকট আজকের এই জেন জি প্রজন্মের ভবিষ্যৎকেই সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। স্পষ্টই মার্কসের সেই অজগরের রূপকটি আজ আরও বেশি সত্যি হয়ে উঠেছে—ব্যবস্থাটা মুনাফার লোভে এতটাই অন্ধ যে, সে নিজের ভিত্তিকেই আজ একটু একটু করে গ্রাস করে ফেলছে। আর তরুণদের এই ক্ষোভ তারই এক সরাসরি বহিঃপ্রকাশ।
কিন্তু, এটা কীভাবে ঘটছে? এটা কি শুধুই অধিকার আন্দোলন, স্বাধীনতার আন্দোলন, ধনীদের বিরুদ্ধে আন্দোলন, নাকি সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন? নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে গভীর এক মনস্তাত্ত্বিক সংকট? মধ্যযুগের একজন রাজা কোনো দিন আকাশে চড়েননি, তাঁর কোনো টেলিভিশন বা স্মার্টফোন ছিল না, ফ্রিজ, এসি এমনকি সাইকেলও ছিল না তাদের। ঘোড়া কিংবা হাতির পিঠে চড়েই তাঁকে চলতে হতো। রাজপ্রাসাদ ছিল ঠিকই, কিন্তু তা কতই বা উঁচু ছিল; আকাশচুম্বী বিল্ডিংয়ে থাকার কোনো সুযোগ তাঁর ছিল না। চিন্তা করলে দেখা যায়, আজকের যুগের একজন সাধারণ মানুষ যে জীবনযাপন করে ও সুবিধা ভোগ করে, তার চেয়েও দুর্বল ছিল তখনকার রাজার সুযোগ-সুবিধা।
তাহলে, আজ কেন মানুষেরা এত প্রযুক্তি, এত জৌলুস আর বিলাসিতার মাঝে থেকেও আন্দোলন করছে? আসলে কারণটা অধিকাংশই মনস্তাত্ত্বিক। আজকের যুগের মানুষ সত্যিই জানে ও বিশ্বাস করে যে তারা স্বাধীন মানুষ, কিন্তু আগের যুগের সেই সাধারণ প্রজারা ছিলেন কেবল রাজার গোলাম। আজকের জেন জি প্রজন্ম সত্যিই জানে যে রাষ্ট্রের সব সম্পদের ওপর সকলের ন্যায়সংগত অধিকার আছে, কিন্তু আগের যুগের শোষিত ও বঞ্চিত সাধারণ মানুষ শুধু গোলামিকেই তাদের নিয়তি হিসেবে মেনে নিয়েছিল। আজকের মানুষ জানে কেউ জন্মগতভাবেই অভিজাত হয় না, আবার কেউ জন্মগতভাবেই ধনী কিংবা গরিব হয়ে জন্মায় না। তারা স্পষ্ট বুঝতে পারে, ধনী আর গরিবের এই আকাশচুম্বী ব্যবধান আসলে অন্যায্য সামাজিক নিয়মের সৃষ্টি। তাই তারা সেই নিয়মকে বদল করতেই পথে নেমেছে; তারা তাদের ন্যায্য অধিকার চাইছে। তারা কোনো রাজা চাইছে না, তারা চাইছে দায়িত্ববান অভিভাবক। তারা ধনী আর গরিবের ব্যবধান ঘুচিয়ে দিতে চাইছে। একদল মানুষ সম্পদের পাহাড় গড়বে আর জগতের অধিকাংশ মানুষ সেই পাহাড়ের নিচে চাপা পড়ে প্রাণ ত্যাগ করবে—সেটা আর হতে দেওয়া যায় না। তাই তারা রাষ্ট্র ও সমাজের সেই প্রচলিত নিয়মকে চ্যালেঞ্জ করেছে, যা ধনীকে আরও ধনী বানায় আর ধনীর সঙ্গে গরিবের ব্যবধানকে দিন দিন আরও বাড়িয়ে দেয়।
মানুষ আসলে শুধু অভাব থেকে খুব কমই প্রতিবাদী হয়। যখন সমাজের সকলেই কষ্টের সাথে একসাথে সংগ্রাম করে, তখন মানুষের পারস্পরিক বন্ধন বরং আরও দৃঢ় হতে দেখা যায়। কিন্তু মানুষ প্রতিবাদী হয়ে ওঠে তখনই, যখন সে তার চারপাশে অসমতা দেখে। কেউ মিলিয়ন ডলার খরচ করে আনন্দ-বিলাসিতা করছে আর কেউ হাজার ডলার খরচ করতেও হিমশিম খাচ্ছে—ঠিক এখানেই জ্বলে ওঠে ক্ষোভের বারুদ। কারো হাতে ৫ লাখ টাকা মূল্যের ফ্ল্যাগশিপ সেলফোন আর কারো হাতে অতি সাধারণ বাটন ফোন—এখানেই জ্বলে ওঠে আন্দোলনের জ্বালানি। কারো মাথার ওপর স্কাইহাই বিল্ডিং আর কেউ দিন কাটায় টিনের ঘরে—ঠিক এখানেই রচিত হয় বিপ্লবের পটভূমি।
বিগত কয়েক যুগ ধরে পুঁজিবাদী জায়ান্টরা মুনাফা বাড়ানোর কৌশলে বিশ্বব্যাপী শুধু পণ্যের লোভনীয় বিজ্ঞাপন ছড়িয়ে দিল, শুধু বিক্রি বাড়িয়ে গেল। তারা নতুন নতুন প্রযুক্তি দিয়ে আরও আকর্ষণীয়, আরও নতুন মডেল আর বিলাসিতার অন্ধ প্রতিযোগিতা ছড়িয়ে দিতে লাগল। কিন্তু বিশ্বব্যাপী যারা ক্রেতা—বিজ্ঞাপনের কৌশলে সেই ক্রেতাদের কেনার ইচ্ছে তীব্র হলেও, পণ্য কেনার মতো অর্থ যে তাদের হাতে নেই! একই সাথে প্রযুক্তির উন্নয়নের ফলে রাতারাতি চাকরি হারাল কোটি কোটি মানুষ। তাদের ক্ষুধা আছে, পণ্য কেনার তীব্র চাহিদাও আছে, কিন্তু পকেটে কোনো অর্থ নেই। নিজের মনের কাছেই তারা প্রশ্ন করতে শুরু করল—কেন ধনীদের সব থাকবে আর আমাদের থাকবে না? কোন নিয়ম জগতের সব সম্পদ আর ক্ষমতার ওপর ধনীদের একচেটিয়া অধিকার দিয়েছে? এটাই মূলত জেন জি প্রতিবাদের মূল প্রশ্ন।
যে জায়ান্ট শিল্পপতিরা বিশ্বব্যাপী তরুণদের হাতে হাতে ফেসবুক ও সোশ্যাল মিডিয়া পৌঁছে দিয়েছিল, তারা হয়তো জানতই না যে সেই ফেসবুকের শক্তি কীভাবে এই প্রজন্মের অন্তরে নিজেদের অধিকারবোধকে মজবুত করবে! তারা হয়ত বুঝতে পারেনি যে কীভাবে এটি একদিন সব রাজাদের প্রাসাদ ভেঙে ফেলবে এবং কীভাবে ধনীরা নিশ্চিতভাবেই এক দিন তাদের ব্যবসায়ের সাম্রাজ্য হারাবে।
তাই সময় এসেছে রাষ্ট্রচিন্তাকে আবার নতুন করে ভাবার। রাষ্ট্রকে অবশ্যই নতুন করে ভাবতে হবে যে, দারিদ্র্যের যেমন একটি নিম্নসীমা থাকে, তেমনি ধনীর ধন-সম্পদেরও একটি সর্বোচ্চ সীমা থাকা দরকার। একটি রাষ্ট্রে মেধা ও যোগ্যতা অনুযায়ী কার কেমন উপার্জন হওয়া উচিত এবং বিশেষ করে কার উপার্জন কত টাকার বেশি হওয়া উচিত নয়, তা কঠোরভাবে নির্ধারণ করার সময় এসেছে। সমাজ আর রাষ্ট্রকে সত্যিকার কল্যাণ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হলে ভোগের প্রচার কতটুকু করা উচিত এবং কোথায় গিয়ে থামা দরকার, তা নিয়ে গভীর গবেষণার দাবি রাখে।
(মাইন্ড-ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ের গবেষক)