১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় থেকে শুরু করে আজকের উদীয়মান অর্থনীতির বাংলাদেশ পর্যন্ত—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁকে সূর্যোদয়ের দেশ জাপানকে আমরা পেয়েছি এক অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য, নিঃস্বার্থ ও অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে। স্বাধীনতার পরপরই যে সম্পর্কের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল, সময়ের পরিক্রমায় তা কেবল প্রথাগত কূটনৈতিক আদান-প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং কৌশলগত ঐক্যের এক অনন্য মেলবন্ধনে রূপ নিয়েছে।
এই সুদৃঢ় ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় আজ ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে সেখানে সরকারি সফরে যাচ্ছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গত ২০ অক্টোবর উভয় দেশের সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এই সফরসূচি ঘোষণা করেছে। বর্তমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং পরিবর্তিত অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই সফরটি কেবল দুটি দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের রুটিন কূটনৈতিক সফর নয়, বরং এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উত্তরণ ও আঞ্চলিক নীতি নির্ধারণে নতুন আশা ও উদীয়মান দ্বিপক্ষীয় দিগন্তের সূচনা করছে।
পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, সফরের দ্বিতীয় দিন, অর্থাৎ ২৭ অক্টোবর, টোকিওতে জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হবে বহুল প্রত্যাশিত উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক। এই ঐতিহাসিক বৈঠক উপলক্ষে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে এক বর্ণাঢ্য মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেছেন। ঢাকায় নিযুক্ত জাপান দূতাবাসের অর্থনৈতিক বিভাগের পক্ষ থেকে এই সফরকে আন্তরিকভাবে স্বাগত জানিয়ে পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে যে, ২০২৩ সালে দুই দেশের সম্পর্ক যে কৌশলগত অংশীদারত্বে উন্নীত হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রীর এই আনুষ্ঠানিক সফরের মধ্য দিয়ে তা বহুদূর এগিয়ে যাবে। জাপান মনে করে, এই সফর কেবল দুটি রাষ্ট্রের বাণিজ্যিক স্বার্থকেই ত্বরান্বিত করবে না, বরং ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং অভিন্ন সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতেও অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে। বিশেষত, বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের গৃহীত বিনিয়োগবান্ধব নীতি, আইনি কাঠামো সংস্কার এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির যে ইতিবাচক উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে, তা জাপানি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার এক নতুন জোয়ার সৃষ্টি করেছে। এই সফর দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বকে তাঁদের অভিন্ন অগ্রাধিকারগুলো নতুন করে ঝালিয়ে নেওয়ার এবং উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে পারস্পরিক কৌশল নির্ধারণের প্রত্যক্ষ সুযোগ করে দিচ্ছে।
সফরকালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী টোকিওতে আয়োজিত জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরামে মূল বক্তব্য উপস্থাপন করবেন। এই ফোরাম মূলত জাপানি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ও শীর্ষ উদ্যোক্তাদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের সুনির্দিষ্ট সুবিধা ও সম্ভাবনাগুলো অনুধাবনে অত্যন্ত সহায়ক হবে। প্রধানমন্ত্রী একই সঙ্গে জাপানের শীর্ষ বাণিজ্যিক নেতৃত্বের সঙ্গে গোলটেবিল বৈঠকে বসবেন, যেখানে সরাসরি জাপানি বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রযুক্তি হস্তান্তর, ম্যানুফ্যাকচারিং হাব প্রতিষ্ঠা এবং বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের বহুমুখীকরণ নিয়ে জোরালো আলোচনা হবে। সম্ভাব্য কার্যসূচি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগ এবং জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের মতো প্রভাবশালী নীতিনির্ধারণী সংস্থাগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। এর পাশাপাশি জাপানের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক আর্থিক সহায়তার মূল চালিকাশক্তি—জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি বা জাইকা, জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন বা জেট্রো, জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন বা জেবিআইসি এবং সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের শীর্ষ নির্বাহীদের সঙ্গে পৃথক ও নিবিড় দ্বিপক্ষীয় বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে। এই বৈচিত্র্যময় বৈঠকগুলো ইঙ্গিত দেয় যে, বাংলাদেশ কেবল বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর না করে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ, সহজ শর্তে বাণিজ্যিক অর্থায়ন এবং সক্ষমতা বৃদ্ধিতে মনোযোগ দিচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য সফরসূচিতে বিশেষ একটি অনুষঙ্গ হলো জাপানের শিল্পদক্ষতা ও আধুনিক অবকাঠামো সরাসরি প্রত্যক্ষ করা। সফরকালে চিবা প্রিফেকচারের ফুতসু শহরের একটি বিশালাকার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল ও অত্যাধুনিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শনের কথা রয়েছে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে উত্তরণের কৌশল নির্ধারণে এই পরিদর্শন প্রত্যক্ষ অবদান রাখবে। বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকের বৈশ্বিক বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান ইউনিক্লোর সদর দপ্তর পরিদর্শন থেকে এটি স্পষ্ট যে, বাংলাদেশে ভ্যালু-অ্যাডেড গার্মেন্টস এবং বৈশ্বিক খুচরা বাজারের সাপ্লাই চেইনে এ দেশের পোশাকশিল্পের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করা হবে। অন্যদিকে, নাগোয়া শহরে বিশ্বখ্যাত স্বয়ংচালিত গাড়ি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান টয়োটার কারখানা পরিদর্শন বাংলাদেশের শিল্পসম্ভাবনাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। বাংলাদেশে কেবল টয়োটার গাড়ি সংযোজন নয়, বরং ভবিষ্যতে স্থানীয়ভাবে অটোমোবাইল পার্টস তৈরির সম্ভাবনা এবং ইলেকট্রিক বা হাইব্রিড যানবাহনের প্রযুক্তি হস্তান্তরের নতুন দরজা খুলবে।
বাংলাদেশ ২০২৬ সালের নভেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘ কর্তৃক স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বেরিয়ে গিয়ে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে শামিল হতে যাচ্ছে। এই রূপান্তর যেমন আনন্দের, তেমনই এটি কিছু বাণিজ্যিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসছে। এলডিসি উত্তরণের পর উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আর উন্নত দেশের বাজারে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত জিএসপি সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাবে না। এই বাস্তবতায়, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে স্বাক্ষরিত বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি বা ইপিএ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন ও প্রয়োগের বিষয়টি এই সফরের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে। ইপিএ পুরোপুরি কার্যকর হলে জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার অব্যাহত থাকবে। এটি কেবল প্রথাগত তৈরি পোশাক বা চামড়াজাত পণ্যের মধ্যেই সীমিত থাকবে না; বরং বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধশিল্প, কৃষিজাত পণ্য এবং হিমায়িত খাদ্যের বাজারে প্রবেশাধিকার সহজ করবে। একই সঙ্গে জাপানি উন্নত প্রযুক্তি ও মূলধনি যন্ত্রাংশ বাংলাদেশে আমদানির খরচ কমিয়ে আনবে। ইতোমধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, এ সফরে কৃষি, মৎস্যসম্পদ, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসামরিক বিমান চলাচল, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আধুনিকায়ন-সংক্রান্ত বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক ও দ্বিপক্ষীয় যৌথ ঘোষণা স্বাক্ষরিত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।
জাপান সব সময়ই বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি ও রূপান্তরকারী অবকাঠামো নির্মাণের কারিগর। ঢাকার বুকে যোগাযোগের বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা মেট্রোরেল, ঢাকার ট্রানজিট পয়েন্ট হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের দৃষ্টিনন্দন তৃতীয় টার্মিনাল কিংবা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গভীর সমুদ্রবন্দর ও শক্তিকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠা মাতারবাড়ী ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট—সবগুলোর পেছনেই রয়েছে জাপানি অর্থায়ন, উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ। এই সফরে চলমান বৃহৎ প্রকল্পগুলোর সময়মতো ও নিখুঁত বাস্তবায়ন ত্বরান্বিত করার ওপর জোরালো আলোকপাত করা হবে। পাশাপাশি, মাতারবাড়ীকে কেন্দ্র করে বঙ্গোপসাগরীয় শিল্প উন্নয়ন বলয় বা ‘বিগ-বি’ গড়ার যে দূরদর্শী উদ্যোগ রয়েছে, তার সফল বাস্তবায়নে আলোচনার পথ আরও সুগম হবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খলের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে, যা কেবল বাংলাদেশকে নয়, বরং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যসমূহ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে যোগাযোগের এক নতুন অর্থনৈতিক করিডর গড়ে তুলবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো,জাপান বর্তমানে এক বিশাল জনমিতিক কাঠামোগত সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশটিতে কর্মক্ষম যুবশক্তির ঘাটতি দেখা দিয়েছে; অপরদিকে বাংলাদেশে রয়েছে এক বিশাল উদীয়মান তরুণ ও উদ্দীপ্ত জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে কৌশলগতভাবে সবচেয়ে অগ্রাধিকার পাওয়া খাতগুলোর একটি হবে মানবসম্পদ ও দক্ষতা প্রশিক্ষণ। বাংলাদেশে আধুনিক কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্র স্থাপন এবং জাপানি ভাষার দক্ষতা বৃদ্ধিমূলক প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ প্রসারে জাপানের সার্বিক সহযোগিতা চাওয়া হবে। এটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের হাজার হাজার দক্ষ টেকনিশিয়ান, ইঞ্জিনিয়ার, নার্স এবং আইটি বিশেষজ্ঞ জাপানের ‘স্পেসিফায়েড স্কিলড ওয়ার্কার’ ও প্রযুক্তিগত ইন্টার্নশিপ প্রোগ্রামের অধীনে সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ পাবেন। এটি একদিকে বাংলাদেশের রেমিট্যান্স প্রবাহে নতুন ইতিবাচক বিপ্লব আনবে, অন্যদিকে জাপানের শ্রমবাজারের ঘাটতি পূরণে একটি টেকসই কাঠামো তৈরি করবে।
জাপান দূতাবাসের অর্থনৈতিক বিভাগ সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, শুধু আলোচনা বা চুক্তি স্বাক্ষরই যথেষ্ট নয়; বরং গৃহীত সিদ্ধান্ত ও অঙ্গীকারগুলোর সুনির্দিষ্ট বাস্তবায়নই ব্যবসায়িক আস্থা ধরে রাখার চাবিকাঠি। জাপানি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে কাস্টমস ও বন্দরের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও বিলম্ব দূর করা, যুক্তিসংগত ও ধারাবাহিক করনীতি অনুসরণ, বৈদেশিক মুদ্রার তহবিল প্রত্যাবাসন সহজ করা এবং সুসংহত ওয়ান-স্টপ সার্ভিস ব্যবস্থা কার্যকর করার মতো কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে এই নতুন কূটনৈতিক পদক্ষেপের ক্ষেত্রে জাপান অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে পর্যবেক্ষণ করছে, বাংলাদেশ কীভাবে এই প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করে বিনিয়োগ পরিবেশকে গতিশীল করে তোলে। বাংলাদেশের দৃশ্যমান ও সময়োপযোগী আইনি অবকাঠামো সংস্কারের উদ্যোগগুলো জাপানি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মনে নতুন আস্থার সঞ্চার করেছে, যা এই সফরের মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি পাবে বলে আশা করা যায়।
অর্থনৈতিক সহযোগিতার খতিয়ান ছাড়িয়েও এ সফর আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে গভীর তাৎপর্য বহন করে। বর্তমান বিশ্বব্যাপী ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ ও জাপান অভিন্ন অবস্থান থেকে কাজ করতে চায়। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলকে উন্মুক্ত, মুক্ত, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অধীনে রাখার বিষয়ে দুই দেশ বহু আগে থেকেই একমত। বিশেষভাবে, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া সাড়ে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থীকে তাঁদের মাতৃভূমিতে প্রত্যাবাসনে জাপানের জোরালো কূটনৈতিক সহায়তা প্রত্যাশা করবে বাংলাদেশ। শুরু থেকেই জাপান রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তায় বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করে আসছে, তবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে, বিশেষ করে মিয়ানমারের পরিস্থিতি স্বাভাবিককরণ ও রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনে জাপানের প্রভাবক ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। জাপানও স্বীকার করে যে, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সার্বিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে রোহিঙ্গা সংকটের দ্রুত সমাধান আবশ্যক।
পরিশেষে বলা যায়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাপান সফরটি কেবল দুটি প্রথাগত মিত্র দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের আনুষ্ঠানিক সৌজন্য সাক্ষাৎমাত্র নয়; এটি বাংলাদেশের নতুন অর্থনৈতিক যাত্রার এক ঐতিহাসিক রূপরেখা। স্বাধীনতা-পরবর্তী পুনর্গঠন থেকে শুরু করে আজকের স্মার্ট ও উদীয়মান বাংলাদেশের প্রতিটি ধাপে জাপানের যে কার্যকর ভূমিকার সাক্ষী আমরা হয়েছি, এই সফর সেই ঐতিহাসিক বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করবে। বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি, নতুন জাপানি মূলধন আকর্ষণ, শিল্প খাতের আধুনিকায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, মানবসম্পদের যথাযথ উন্নয়ন এবং মেগাপ্রকল্পের সফল বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই সফর দেশের অর্থনীতিকে এক নতুন মাত্রা প্রদান করবে। টোকিও ও ঢাকার মধ্যকার এই ক্রমবর্ধমান কৌশলগত ঐক্য এশিয়ার দুই প্রান্তকে সুসংহত করার পাশাপাশি নতুন বাংলাদেশের নতুন স্বপ্ন ও প্রত্যাশাকে সফলতার এক অনন্য চূড়ায় পৌঁছে দেবে—এটাই দেশবাসীর প্রত্যাশা। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের সহায় হোন।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, আমার দিন।