নেত্রকোনা জেলার খালিয়াজুরী উপজেলার এক প্রত্যন্ত হাওর অঞ্চল থেকে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে আজ তিনি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগের শিক্ষার্থী। প্রান্তিক হাওরের জল-কাদামাটিতে বেড়ে ওঠা এই তরুণী কেবল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং ফোকলোরের বিশাল ক্যানভাসে নিজেকে টিকিয়ে রাখতে বেছে নিয়েছেন এক অনন্য গবেষণার ক্ষেত্র।
যাঁরা হাওর অঞ্চলে বড় হয়েছেন, তাঁরা প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের আজন্ম লড়াইয়ের গল্প খুব কাছ থেকে দেখেন। প্রকৃতির নির্মম রূপ আর টিকে থাকার সংগ্রাম তনিয়ার মনস্তত্ত্বে গভীর প্রভাব ফেলেছে। আর হয়তো সে কারণেই তাঁর গবেষণার বিষয়বস্তু হিসেবে উঠে এসেছে সুন্দরবন অঞ্চলের অতি পরিচিত অথচ অবহেলিত এক লোকায়িত উপাদান। ’সুন্দরবন অঞ্চলের লোকঐতিহ্য : বনবিবি পালাগানের অস্তিত্ব সংকট ও সংরক্ষণের সম্ভাবনা'।
সুন্দরবনের মৌয়াল, কাঠুরিয়া ও জেলের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা বনবিবির লোকবিশ্বাস, দক্ষিণ রায়ের সঙ্গে তাঁর আধ্যাত্মিক লড়াই এবং বিপন্ন প্রকৃতির বুকে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক আশ্রয়ের জায়গাগুলোকে তিনি তাঁর গবেষণায় নিপুণভাবে তুলে আনার চেষ্টা করছেন। আধুনিকতার আগ্রাসন, স্যাটেলাইট সংস্কৃতি এবং পর্যটনের বাণিজ্যিকীকরণে যখন এই প্রাচীন লোকশিল্পগুলো হারিয়ে যাওয়ার মুখে, তখন তনিয়ার মতো তরুণ গবেষকদের এই উদ্যোগ আমাদের লোকসংস্কৃতির ভাণ্ডারে আশার এক নতুন আলো জ্বেলেছে।
একজন ফোকলোর গবেষক হিসেবে তনিয়ার দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত শাণিত ও জীবনঘনিষ্ঠ। হাওরের প্রান্তিক জীবন থেকে শুরু করে ময়মনসিংহের ত্রিশালের উচ্চশিক্ষা চত্বর—এই দীর্ঘ যাত্রায় তাঁর একাগ্রতা ও গবেষণা-মনস্কতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছে। তিনি কেবল একটি একাডেমিক গবেষণাপত্র তৈরি করছেন না, বরং সুন্দরবনের সেই অবহেলিত পালাগান ও প্রান্তিক শিল্পীদের আকুতিকে খবরের কাগজের পাতার আলোয় ফুটিয়ে তুলতে সচেষ্ট হয়েছেন।
হাওরের মৃদু হাওয়া থেকে সুন্দরবনের গভীর অরণ্য—তাঁর এই জ্ঞানচর্চার যাত্রা প্রমাণ করে যে, শেকড়ের টানে যাঁরা কাজ করেন, তাঁরাই আগামী দিনে আমাদের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠেন। তনিয়ার এই নিরলস গবেষণা ও লেখালেখি বাংলার লোকসংস্কৃতি চর্চাকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাক, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।