লালমনিরহাটের পাটগ্রামে এক গৃহবধূর বিয়ের সময় নির্ধারিত ১৭ লাখ টাকা দেনমোহর কমিয়ে ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা করার অভিযোগ উঠেছে নিকাহ রেজিস্ট্রার (কাজি) ইউনুস আলীর বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় তাঁর দুই সহযোগীকে আটক করেন স্থানীয়রা। পরে মুচলেকা দিয়ে তাঁরা ছাড়া পান। তবে দেনমোহরের অঙ্ক পরিবর্তনের অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত কাজির বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বুধবার রাতে পাটগ্রাম পৌরসভার মির্জারকোট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
আটক দুজন হলেন আজাদ ও মামুন। আজাদ পাটগ্রাম উপজেলা বুড়িমারী আলিয়া মাদরাসার অধ্যক্ষ ও পৌরসভার নিকাহ রেজিস্ট্রার ইউনুস আলীর সহযোগী। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, আজাদ জেলা জামায়াতের সাবেক আমির আতাউর রহমানের ছোট ভাই।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, হাতীবান্ধা উপজেলার বড়খাতা ইউনিয়নের দালালপাড়া গ্রামের শাহাজান আলীর ছেলে অহেদ আলী ২০২৫ সালের ১০ জানুয়ারি দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পাটগ্রাম পৌরসভার মির্জারকোট এলাকার রিকশাচালক আশাদুল ইসলামের মেয়ে আরফিনা আক্তার মিমকে বিয়ে করেন। ওই বিয়েতে ১৭ লাখ টাকা দেনমোহর নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরিবারের দাবি, বিয়ে নিবন্ধনের পাশাপাশি নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে একটি লিখিত চুক্তিও করা হয়।
পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর আরফিনা প্রথমবার অন্তঃসত্ত্বা হলে তাঁর গর্ভপাত করানো হয়। পরে দ্বিতীয়বার অন্তঃসত্ত্বা হয়ে তিনি একটি কন্যাসন্তানের জন্ম দেন। এরই মধ্যে নিকাহ রেজিস্ট্রারকে ম্যানেজ করে বিয়ের মূল দেনমোহর ১৭ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
পরিবারের ভাষ্য, পরে ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা আদালতে জমা দিয়ে আরফিনাকে তালাক দেন অহেদ আলী। তালাকের নোটিশ হাতে পাওয়ার পর দেনমোহরের অঙ্ক নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এরপর গ্রামবাসীর সহযোগিতায় বিয়ের নকল বা নিবন্ধনের কপি সংগ্রহের উদ্যোগ নেয় পরিবারটি।
বুধবার রাতে নিকাহ রেজিস্ট্রার ইউনুস আলীর দুই সহযোগী আজাদ ও মামুন বিয়ের নকল নিয়ে আরফিনার বাড়িতে গেলে স্থানীয়রা তাঁদের আটকে রাখেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তাঁরা জনসমক্ষে দেনমোহরের অঙ্ক পরিবর্তনের বিষয়টি স্বীকার করেন। পরে আপস-মীমাংসার আশ্বাসে মুচলেকা নিয়ে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
বৈঠকেও মেলেনি সমাধান
বৃহস্পতিবার পাটগ্রাম পৌর বিএনপির সভাপতি মোস্তফা সানাউজ্জামান ওপেল ও পৌর জামায়াতের আমির সোহেল রানার নেতৃত্বে এ বিষয়ে বৈঠক হয়। বৈঠকে নিকাহ রেজিস্ট্রার ইউনুস আলীর প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর ভগ্নিপতি উপস্থিত ছিলেন। সেখানে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সামান্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলেও পরিবার ও স্থানীয়রা তাতে রাজি হননি। ফলে কোনো সমাধান ছাড়াই বৈঠক শেষ হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী শহিদুল ইসলাম বলেন, “গ্রামবাসী কাজির দুই সহযোগীকে আটক করেছিল। পরে আপস-মীমাংসার আশ্বাসে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। বিয়ের সময় ১৭ লাখ টাকা দেনমোহর লেখা থাকলেও পরবর্তী সময়ে নকল কপিতে ৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা লেখা হয়েছে বলে আটক ব্যক্তিরা জনসমক্ষে স্বীকার করেছেন।”
বিয়ের ভলিউম বহির লেখক ও কাজির সহযোগী হাফিজুল ইসলাম বলেন, “৯ নম্বর ওয়ার্ডের বিয়ে নিবন্ধনের কাজ আমি করি। ১৭ লাখ টাকা দেনমোহরের ওই বিয়েটিও আমি নিবন্ধন করেছি। মূল ভলিউমে অঙ্ক ও কথায় ১৭ লাখ টাকা লিখেছিলাম। এ বিয়ে নিবন্ধনের জন্য কাজি ইউনুস আলী ১০ হাজার টাকা নিয়েছেন। দেনমোহর কমানোর বিষয়ে কাজি ইউনুস আলীই বলতে পারবেন।”
আটক সহযোগীদের একজন আজাদ বলেন, “কাজি ইউনুস আলীর নির্দেশে মূল ভলিউম বই দেখে নকল তৈরি করে নিয়ে এসেছি। জালিয়াতি হয়েছে কি না, সে বিষয়ে কাজি ইউনুস আলী বলতে পারবেন। আমরা তাঁর হয়ে শুধু লিখে দিই।”
আগেও অনিয়মের অভিযোগ
স্থানীয়দের অভিযোগ, এর আগেও দেনমোহর-সংক্রান্ত অনিয়মের ঘটনায় নিকাহ রেজিস্ট্রার ইউনুস আলী ভ্রাম্যমাণ আদালতে সাজাপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। মাদরাসার অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি একাধিক সহযোগীর মাধ্যমে বিয়ে নিবন্ধনের কাজ পরিচালনা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে পাটগ্রাম পৌরসভার নিকাহ রেজিস্ট্রার ইউনুস আলীর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
বৈঠকে উপস্থিত পাটগ্রাম পৌর বিএনপির সভাপতি মোস্তফা সানাউজ্জামান ওপেল বলেন, “জনতার কাছে আটক দুই ব্যক্তি দেনমোহর পরিবর্তনের বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে অভিযুক্ত কাজি ইউনুস আলী আত্মগোপনে থাকায় বিষয়টির সমাধান করা সম্ভব হয়নি। তাঁর বিরুদ্ধে আগেও দেনমোহর জালিয়াতিসহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে। তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
পাটগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম বলেন, “স্থানীয়দের মাধ্যমে দেনমোহর জালিয়াতি ও দুই ব্যক্তিকে আটকের বিষয়টি জানতে পেরেছি। তবে এ ঘটনায় এখনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
দেনমোহরের অঙ্ক পরিবর্তনের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, বিয়ের মূল নিবন্ধন বহি ও নকলের তথ্য যাচাই এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয়রা।
মাহফুজ সাজু / এফএস