আর্থিক সংকটে থাকা বেসরকারি ন্যাশনাল ব্যাংককে তিন মাসের জন্য ৭ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক। বাংলাদেশ ব্যাংকের শতভাগ গ্যারান্টির বিপরীতে ১০ শতাংশ সুদে এ অর্থ দেওয়া হয়েছে।
নির্ধারিত সময়ে ন্যাশনাল ব্যাংক ঋণের টাকা ফেরত দিতে না পারলে গ্যারান্টির শর্ত অনুযায়ী তিন কর্মদিবসের মধ্যে সোনালী ব্যাংককে অর্থ পরিশোধ করবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শওকত আলী খান বিষয়টি নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে বলেন, ব্যাংক খাতে আস্থা ফেরাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের নেওয়া উদ্যোগের অংশ হিসেবে শতভাগ গ্যারান্টির বিপরীতে ন্যাশনাল ব্যাংককে তারল্য সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, মেয়াদ শেষে ন্যাশনাল ব্যাংক অর্থ ফেরত দিতে ব্যর্থ হলে বাংলাদেশ ব্যাংক তিন কর্মদিবসের মধ্যে সোনালী ব্যাংককে টাকা পরিশোধ করবে। ফলে এ ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে সোনালী ব্যাংকের কোনো ঝুঁকি নেই। এর আগে একই প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে ইসলামী ব্যাংকগুলোকে অর্থ দেওয়া হয়েছিল।
একসময় দেশের বেসরকারি খাতের অন্যতম শীর্ষ ব্যাংক ছিল ন্যাশনাল ব্যাংক। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন ঘটে। পরবর্তী সময়ে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ সিকদার পরিবারের হাতে যায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আবারও ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন আনা হয়।
তবে আগের সময়ে সংঘটিত অনিয়মের প্রভাব কাটিয়ে উঠতে পারেনি ব্যাংকটি। উচ্চ খেলাপি ঋণ, ধারাবাহিক লোকসান ও তারল্য সংকটে ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। এর ফলে গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী আমানতের টাকা পরিশোধ করতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে ব্যাংকটিকে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকেও বিভিন্ন সময়ে বড় অঙ্কের তারল্য সহায়তা পেয়েছে ন্যাশনাল ব্যাংক। কিন্তু এসব সহায়তার পরও ব্যাংকটির স্বাভাবিক লেনদেন পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি।
সম্প্রতি আমানতের টাকা তুলতে না পেরে ন্যাশনাল ব্যাংকের চার গ্রাহক হাইকোর্টের দ্বারস্থ হন। পরে তাদের সঞ্চয়ী হিসাবের অর্থ উত্তোলন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে নির্দেশ দেন আদালত।
এ অবস্থায় গত ৮ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ন্যাশনাল ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মেলিতা মেহজাবীন ও ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাহিদুল হক। বৈঠকে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান দাবি করেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক পদক্ষেপের ফলে সুশাসন নিশ্চিত হয়েছে। পাশাপাশি ঋণ ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের মাধ্যমে ব্যাংকটির দক্ষতা ও কার্যক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বৈঠকে গভর্নর ব্যাংকটির তারল্য পরিস্থিতি এবং আমানতকারীদের অর্থ উত্তোলনের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আশ্বাস দেন। আমানতকারীদের স্বার্থ সংরক্ষণ, ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি আস্থা বজায় রাখা এবং ব্যাংকটির কার্যক্রম সুশৃঙ্খল রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেন তিনি। একই সঙ্গে ১৫ অক্টোবর থেকে গ্রাহকেরা যেন চাহিদা অনুযায়ী টাকা তুলতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে বলা হয়।
এর আগে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ৯৮৫ কোটি টাকা ধার নিয়েছিল ন্যাশনাল ব্যাংক। নির্ধারিত সময়ে সেই অর্থ পরিশোধ করতে না পারায় বাংলাদেশ ব্যাংককে দায় পরিশোধ করতে হয়। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ন্যাশনাল ব্যাংকের ঋণ হিসেবে ওই অর্থ যুক্ত হয়।
বর্তমানে ন্যাশনাল ব্যাংকের কাছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাওনা দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, এ অর্থ কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন টাকা সৃষ্টি করে সরবরাহ করেছে।
ব্যাংক খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, তারল্য সংকটে থাকা ব্যাংকগুলোকে সচল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টির বিপরীতে অন্য ব্যাংক থেকে অর্থ ধার নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। এতে তাৎক্ষণিক অর্থ সংকট সামাল দেওয়া সম্ভব হলেও খেলাপি ঋণ আদায়, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে সংকট কাটানো কঠিন হবে।
টিআই