ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬, ৩০ আষাঢ় ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
শিকার ছেড়ে যিনি হয়েছিলেন বন্যপ্রাণীর পরম বন্ধু, শ্রীমঙ্গলের ‘সীতেশ বাবু’ আর নেই
✎ অবজারভার সংবাদদাতা
⏲ প্রকাশিত: মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই, ২০২৬, ৬:১৮ পিএম আপডেট: ১৪.০৭.২০২৬ ৬:৪৯ পিএম
X

লোকালয়ে কোনো বিপন্ন বন্যপ্রাণী আটকা পড়েছে কিংবা আহত হয়েছে, এমন খবর পেলেই এলাকার মানুষ যার ওপর সবচেয়ে বেশি ভরসা করতেন, তিনি সীতেশ রঞ্জন দেব। দেশের মানুষের কাছে যিনি ‘সীতেশ বাবু’ নামেই বেশি পরিচিত। আহত পশুপাখি ও বন্যপ্রাণীদের পরম মমতায় সুস্থ করে তোলার এই অকৃত্রিম কারিগর আর নেই।

বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান সীতেশ রঞ্জন দেব আজ (মঙ্গলবার) সকাল ৯টা ৫ মিনিটে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। ৭৫ বছর বয়সে তাঁর এই বিদায়ে দেশের পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আন্দোলনের একটি বড় অধ্যায়ের অবসান ঘটল।

সীতেশ বাবুর এই প্রকৃতিপ্রেমী হয়ে ওঠার পেছনের গল্পটা বেশ চমকপ্রদ। একসময় তিনি নিজেই ছিলেন একজন শিকারি! পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, কৈশোর থেকেই বাবা শিরীষ রঞ্জন দেবের সঙ্গে পশুপাখি পালনের পাশাপাশি সে সময়ের সামাজিক বাস্তবতায় নিয়মিত শিকারেও যেতেন তিনি। তখন দেশে বন্যপ্রাণী শিকারে তেমন কোনো কড়াকড়ি ছিল না।

তবে ১৯৮৬ সালে বাবার মৃত্যুর পর সীতেশ বাবুর জীবনে নতুন উপলব্ধি আসে। তিনি বুঝতে পারেন, প্রকৃতিকে তার আপন রূপে টিকিয়ে রাখতে হলে বন্যপ্রাণী মারলে চলবে না, বরং তাদের বাঁচাতে হবে। এই চিন্তাতেই শিকারের বন্দুক চিরতরে নামিয়ে রেখে তিনি আজীবনের জন্য বেছে নেন বন্যপ্রাণী সেবার পথ।

নিজের এই ভাবনা থেকেই শ্রীমঙ্গল শহরের মিশন রোডে নিজ বাড়ির আঙিনায় ছোট একটি সেবাকেন্দ্র গড়ে তোলেন সীতেশ বাবু। সম্পূর্ণ ব্যক্তি-উদ্যোগে গড়ে ওঠা দেশে বন্যপ্রাণী সেবার এই অনন্য প্রতিষ্ঠানটি পরে পরিধি বেড়ে যাওয়ায় পশ্চিম ভাড়াউড়ার বাগানবাড়িতে স্থানান্তর করা হয়। এটিই একসময় ‘বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন’ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। তবে প্রকৃতিপ্রেমী, স্থানীয় মানুষ ও পর্যটকদের কাছে তাঁর এই ভালোবাসার জায়গাটি ‘সীতেশ বাবুর চিড়িয়াখানা’ নামেই বেশি পরিচিতি পায়। বিভিন্ন মাধ্যম থেকে উদ্ধার হওয়া আহত প্রাণীদের এখানেই পরম যত্নে চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ করতেন তিনি। এরপর তাদের মুক্ত করে দিতেন প্রকৃতির বুকে।

গত কয়েক দশকে সীতেশ রঞ্জন দেবের এই সেবাকেন্দ্রে চিকিৎসা পেয়ে সাপ, বানর, হনুমান, শকুন, পাখি, মেছোবাঘ, হরিণসহ হাজার হাজার বন্যপ্রাণী নতুন জীবন ফিরে পেয়েছে। তিনি বিশ্বাস করতেন এরা প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার অপরিহার্য অংশ। তাই শুধু প্রাণী উদ্ধার বা সেবাই নয়; বন্যপ্রাণী হত্যা রোধ, পাচার বন্ধ করা, পরিবেশ সংরক্ষণ, বৃক্ষরোপণ এবং মানুষের সঙ্গে বন্যপ্রাণীর নিরাপদ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে আজীবন জনসচেতনতা তৈরির কাজ করে গেছেন তিনি।

বন্যপ্রাণীর এই নিঃস্বার্থ বন্ধু দীর্ঘদিন ধরে ডায়াবেটিসসহ বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন। তাঁর নাতি রাজদ্বীপ দেব স্ট্রিমকে জানান, সীতেশ বাবু নিজ বাসাতেই চিকিৎসাধীন ছিলেন। মঙ্গলবার সকালে হঠাৎ করেই তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে। পরিবারের সদস্যরা দ্রুত তাঁকে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান।

তবে সীতেশ বাবু শারীরিকভাবে বিদায় নিলেও, তাঁর লালিত স্বপ্ন এবং এতদিনের কষ্টার্জিত কাজ থেমে থাকছে না। তিনি অসুস্থ হওয়ার পর থেকেই তাঁর দুই ছেলে সজল দেব ও সঞ্জিত দেব বাবার দেখানো পথ অনুসরণ করে বন্যপ্রাণী উদ্ধার, চিকিৎসা ও সংরক্ষণের দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। তাঁদের হাত ধরেই সীতেশ বাবুর আদর্শ ও বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম আগামী দিনেও প্রকৃতির বুকে আলো ছড়াবে। একজন শিকারি থেকে পরম মমতাময়ী রক্ষক হয়ে ওঠার যে অনন্য দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করে গেছেন, তা দেশের পরিবেশ আন্দোলনের ইতিহাসে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

এসএস/এসআর



Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১, ই-মেইল: [email protected], ‍[email protected] অনলাইন: ৪১০৫৩০১৪; ০১৫৫০৭০৭২৯৭ ই-মেইল: [email protected] ০১৫৫০৭০৭২৯৬
🔝