বাংলাদেশে ব্যক্তি উদ্যোগে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের ইতিহাসে এক অনন্য নাম সীতেশ রঞ্জন দেব। শিকারির জীবন থেকে ফিরে এসে আহত, অসুস্থ ও বিপন্ন বন্যপ্রাণীর আশ্রয়দাতা হিসেবে যিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন, সেই মানুষটি আর নেই।
মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সকাল ৯টা ৫ মিনিটে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল পলি ক্লিনিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৮ বছর।
দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে আহত, অসুস্থ ও বিপন্ন বন্যপ্রাণী উদ্ধার, চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং সুস্থ হওয়ার পর প্রকৃতিতে ফিরিয়ে দেওয়ার কাজে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে উৎসর্গ করেছিলেন সীতেশ রঞ্জন দেব। শ্রীমঙ্গলের রূপসপুরে তাঁর প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন বর্তমানে দেশের অন্যতম পরিচিত ব্যক্তি উদ্যোগের বন্যপ্রাণী পুনর্বাসন কেন্দ্র। স্থানীয় মানুষের কাছে এটি এখনও ‘সীতেশ বাবুর চিড়িয়াখানা’ নামেই বেশি পরিচিত।
১৯৪৮ সালে শ্রীমঙ্গলের নোয়াগাঁও গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন সীতেশ রঞ্জন দেব। তাঁর বাবা শ্রীশ চন্দ্র দেব ছিলেন সুপরিচিত শিকারি ও প্রকৃতিপ্রেমী। বাবার সঙ্গেই বন-জঙ্গলে ঘুরে বন্যপ্রাণীর প্রতি আগ্রহ তৈরি হয় তাঁর। তরুণ বয়সে তিনিও শিকার করতেন, তবে সময়ের সঙ্গে সেই জীবন ছেড়ে সম্পূর্ণভাবে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে আত্মনিয়োগ করেন।
১৯৯১ সালের ১৪ জানুয়ারি কমলগঞ্জের পাত্রখোলা চা-বাগানে একটি ভালুকের ভয়াবহ আক্রমণে গুরুতর আহত হন তিনি। দীর্ঘ চিকিৎসার পর প্রাণে বেঁচে ফিরলেও মুখে স্থায়ী ক্ষতচিহ্ন বহন করেন সারাজীবন। ওই ঘটনার পরই তিনি শিকার ছেড়ে বন্যপ্রাণী রক্ষার কাজে আরও দৃঢ়ভাবে যুক্ত হন।
২০০৯ সালে রূপসপুরে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন। গত পাঁচ দশকে তাঁর নেতৃত্বে প্রায় দুই হাজারের বেশি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করে বন বিভাগের মাধ্যমে প্রকৃতিতে অবমুক্ত করা হয়েছে। আহত ও অসুস্থ শত শত প্রাণীকে চিকিৎসা দিয়ে নতুন জীবন ফিরিয়ে দেওয়ার কৃতিত্বও তাঁর।
বর্তমানে ফাউন্ডেশনটিতে ভাল্লুক, উল্লুক, বনরুই, মেছো বিড়াল, চিত্রা হরিণ, অজগর, ধনেশ, শকুনসহ অর্ধশতাধিক বিরল ও বিপন্ন বন্যপ্রাণীর পরিচর্যা করা হচ্ছে। তাঁর মৃত্যুর আগেই দুই ছেলে স্বপন দেব সজল ও সঞ্জিত দেব ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে যুক্ত হয়েছেন।
একসময় যিনি ছিলেন শিকারি, শেষ জীবনে তিনিই হয়ে উঠেছিলেন বন্যপ্রাণীর অভিভাবক। তাঁর হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে রেখে যাওয়া অবদান তাঁকে দীর্ঘদিন স্মরণীয় করে রাখবে।
আরএ/আরএন