টানা ভারি বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারের চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরী উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা জলাবদ্ধতার মুখে পড়েছে। এই তিন উপজেলাসহ জেলার নিচু এলাকা প্লাবিত হয়ে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন ৫ লক্ষাধিক মানুষ। কক্সবাজারের দুই প্রধান নদী বাঁকখালী ও মাতামুহুরীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
এই দুর্যোগে চকরিয়া উপজেলায় বৃহস্পতিবার (০৯ জুলাই) পাহাড় ধসসহ পৃথক ঘটনায় তিন শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। নিজেদের ঘরে রাতে ঘুমাতে গেলেও সকালে তারা আর ঘুম থেকে উঠতে পারেনি। এ নিয়ে অতিবৃষ্টিতে পাহাড় ধসে অন্তত ২৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। গেল চার দিনের এই ঘটনায় শুধু রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরেই ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন ২০ জনের অধিক মানুষ।
গত রোববার থেকে টানা বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকায় জেলার বহু বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে গিয়ে জনজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কোনো কোনো সড়কে পানি উঠে পড়ায় যান চলাচলেও ব্যাঘাত ঘটছে।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, টানা বৃষ্টিপাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে চকরিয়া ও পেকুয়া উপজেলার রাজাখালী, মগনামা ও উজানটিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামীণ এলাকা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজাখালী ইউনিয়নের বামুলাপাড়া-উলুডিয়াপাড়া, সুন্দরীপাড়া এলাকায় ওবাইদিয়া ফার্ম ও এরশাদ আলী ওয়াকফ এস্টেটের মাছের ঘেরে পানি আটকে থাকায় জলাবদ্ধতা আরও তীব্র হয়েছে। দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না নেওয়ায় দুর্ভোগ বাড়ছে বলেও দাবি তাদের।
প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে, টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে জেলার ৩৫টি ইউনিয়নের অন্তত শতাধিক গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মধ্যে রয়েছে— টইটং ইউনিয়নের হাজীবাজার ও সোনাইছড়ি, শিলখালী ইউনিয়নের হেদায়াতাবাদ, মাঝেরঘোনা, কাছারীমোড়া ও পেঠান মাতবরপাড়া, রাজাখালীর বামুলাপাড়া, মৌলভীপাড়া, উলুডিয়াপাড়া, মগনামার শরৎঘোনা, পশ্চিম বাজারপাড়া, ধারিয়াখালী, ধরদরীঘোনা, মটকাভাঙা, চেরাংঘোনা, মরিচ্যাদিয়া, রঙ্গিয়াখালী, মগঘোনা, মাঝিরপাড়া ও মৌলভীপাড়া, উজানটিয়ার মিয়াপাড়া, সাবখালীপাড়া, ঘোষলপাড়া, পেকুয়ারচর ও পেরাসিংগাপাড়া, পেকুয়া সদর ইউনিয়নের মোরারপাড়া, সৈকতপাড়া, পূর্ব মেহেরনামা ও পশ্চিম গোয়াঁখালী এবং বারবাকিয়া ইউনিয়নের পাহাড়িয়াখালী গ্রাম।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, জেলার বিভিন্ন এলাকায় অনেক পরিবারের ঘরে পানি ঢুকে পড়েছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি গ্রামীণ সড়ক তলিয়ে যাওয়ায় যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। অনেক পরিবার নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের বারবাকিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা খালেকুজ্জামান বলেন, টানা বৃষ্টিতে পাহাড় ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ কারণে পাহাড়সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে সতর্কতামূলক মাইকিং করা হচ্ছে।
পেকুয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও পেকুয়া সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম বাহাদুর শাহ সাংবাদিকদের বলেন, নবগঠিত পেকুয়া পৌর এলাকায় জলাবদ্ধতা নিরসনে পেকুয়া বাজারের জেনারেল হাসপাতাল থেকে বাজারের পশ্চিম মাথা পর্যন্ত কহেলখালী খালের প্রয়োজনীয় জায়গায় ময়লা-আবর্জনা অপসারণ করে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়াও খুলে দেওয়া হয়েছে প্রবাহমান খালের ওয়াপদা সংলগ্ন স্লুইচ গেট।
পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রফিকুল ইসলাম বলেন, অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের ফলে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পরিদর্শন করে উপজেলা প্রশাসন সার্বিক পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণের পাশাপাশি পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত নিম্নাঞ্চল ও পাহাড়সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে, চকরিয়ার কাকারা, ফাঁসিয়াখালী, লক্ষেশ্বর, করইয়াঘোনা, বমুবিলছড়ি ও চকরিয়া পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ড পানিতে তলিয়ে গেছে। এমনকি চকরিয়া সরকারি কলেজেও হাঁটু পরিমাণ পানি ঢুকে পড়েছে। এতে ক্লাসসহ দাপ্তরিক কাজ করতে পারছে না কলেজ কর্তৃপক্ষ।
পাহাড় ধসে ২২ জনের মৃত্যু
টানা বৃষ্টিপাতে কক্সবাজার জেলায় গত চার দিনে পাহাড় ধসে ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পাঁচ দফা পাহাড় ধসে ১৫ জনের মৃত্যু হয়। এছাড়াও কক্সবাজার শহরে দুইজন, চকরিয়া উপজেলায় দুইজন, পেকুয়া উপজেলায় একজন, উখিয়ার মরিচ্ছা এলাকায় একজন, মহেশখালী উপজেলায় একজন ও কুতুবদিয়া উপজেলায় একজনের মৃত্যু হয়েছে। এদের মধ্যে দুইজন পাহাড় ধসে ঘরের দেয়াল চাপা পড়ে মারা যান।
রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে নিহতদের মধ্যে অধিকাংশই শিশু। তাদের মধ্যে গত বুধবার দুপুরে মাদ্রাসায় লেখাপড়া করার সময় পাহাড় ধসে ৫ শিশু শিক্ষার্থী মারা যায়।
এদিকে, বৃহস্পতিবার (০৯ জুলাই) দিনপূর্ব রাত দেড়টার দিকে চকরিয়া উপজেলার বরইতলী ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের মছনিয়াকাটা ডবলতলী এলাকায় পাহাড় ধসের ঘটনায় দুই শিশু মারা যায়।
নিহতরা হলো স্থানীয় বাসিন্দা আবদুল মজিদের ছেলে ওবাইদুল ইসলাম (১৩) এবং মো. কাজলের মেয়ে রুমী আক্তার (১৩)।
বরইতলী ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুস শুক্কুর বলেন, ঘুমন্ত অবস্থায় রাত দেড়টার দিকে বাড়ির পেছনের পাহাড় ধসে তিনজন চাপা পড়ে। খবর পেয়ে স্থানীয়রা তাৎক্ষণিক একজনকে জীবিত উদ্ধার করেন। পরে চাপা পড়া অবস্থা থেকে গ্রামবাসীরা দুইজনের মরদেহ উদ্ধার করেন।
চকরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহীন দেলোয়ার জানান, আহত নারীকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্তদের প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহায়তা প্রদান করা হবে।
বাঁকখালী ও মাতামুহুরীর পানি বিপদসীমার ওপরে
কক্সবাজার জেলার দুই প্রধান নদী বাঁকখালী ও মাতামুহুরীর পানি অতিবৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলে বিপদসীমা অতিক্রম করেছে।
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, বাঁকখালী নদীর বিপদসীমা ৫ দশমিক ৭৯ মিটার ও মাতামুহুরী নদীর বিপদসীমা ৫ দশমিক ৮০ মিটার। বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) বিকেল ৩টার পরিমাপ অনুযায়ী বিপদসীমা অতিক্রম করে বাঁকখালী নদী ৫ দশমিক ৮৮ মিটার ও মাতামুহুরী নদী ৬ দশমিক ৫৪ মিটার দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
তবে তিনি জানান, জেলার কোথাও বেড়িবাঁধ ভেঙে পানি ঢোকার ঘটনা ঘটেনি। শুধুমাত্র চকরিয়া উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নে বেড়িবাঁধ উপচে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করেছে।
পাঁচ দিনে ৫৪৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড
কক্সবাজার আবহাওয়া অধিদপ্তরের সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান জানিয়েছেন, গত রোববার থেকে টানা ৫ দিনে কক্সবাজার জেলায় ৫৪৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
এই বৃষ্টিপাতের মধ্যে রোববার ২৪০ মিলিমিটার, সোমবার ১২৯ মিলিমিটার, মঙ্গলবার ৬৯ মিলিমিটার, বুধবার সকাল ৬টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত ৬৮ মিলিমিটার এবং বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত ৪১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
তিনি জানান, আগামী ১১ জুলাই পর্যন্ত এই বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে।
জেলা প্রশাসনের সতর্কতা
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের জারি করা গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী কয়েকদিন ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে।
এ অবস্থায় যেকোনো ধরনের প্রাণহানি এড়াতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিকটস্থ সাইক্লোন শেল্টার বা নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে জেলা প্রশাসনের কন্ট্রোল রুমের ০১৮৭২৬১৫১৩২ নম্বরে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানিয়েছেন, জেলার ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উদ্ধার, ত্রাণ ও জরুরি সহায়তা কার্যক্রমের জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া কেটে না যাওয়া পর্যন্ত সবাইকে সতর্ক থাকার এবং সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানান তিনি।
৩৫ ইউনিয়নে প্লাবন
জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্যমতে, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে টানা বর্ষণে কক্সবাজার জেলার ১০ উপজেলার অন্তত ৩৫টি ইউনিয়নে দেড় শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। অন্তত পাঁচ লাখ মানুষ পানিবন্দি রয়েছে।
কক্সবাজার সদর, উখিয়া, টেকনাফ, রামু, চকরিয়া, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পেকুয়া, মাতামুহুরী ও ঈদগাঁও উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখন দুর্যোগে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
সেন্টমার্টিনে ৭ দিন ধরে বন্ধ নৌযান
উত্তাল সাগরের কারণে টানা ৭ দিন ধরে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌপথে যাত্রীবাহী ট্রলারসহ সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
একই সঙ্গে কক্সবাজার-মহেশখালী ও পেকুয়া-কুতুবদিয়া নৌপথেও নৌযান চলাচল বন্ধ থাকায় হাজারো মানুষ চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন।
বিশ্বের বৃহত্তম রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। টানা বর্ষণে সেখানে দুই শতাধিক পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে।
এসআর