ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই ২০২৬, ২৫ আষাঢ় ১৪৩৩
শিরোনাম
Advertisement
ঝড়ের খবর জানে না চরফ্যাশন উপকূলের জেলেরা!
✎ শিপু ফরাজী
⏲ প্রকাশিত: বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬, ৬:৫৬ পিএম
X Advertisement

উপকূলের জেলেরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গভীর সাগরে মাছ শিকারে যান। এসব জেলেদের জন্য প্রাকৃতিক দুর্যোগকালীন সময়ে যে সব সতর্কবার্তা আবহাওয়া অধিদপ্তর প্রচার করে, গভীর সাগরে রেডিও কিংবা মোবাইল নেটওয়ার্ক কাজ না করায় ঝড় এলে তাঁরা সেই খবর পান না। ফলে জীবন বিপন্ন হয়। এদেরকে সংকেত বোঝানোর বা রেডিও কিংবা মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়ার জন্য উল্লেখযোগ্য বড় ধরনের কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় একের পর এক দুর্যোগে হারাতে হচ্ছে বিপুল পরিমাণ জানমাল ও সম্পদ।

জানা যায়, সাগর ও নদীতে মাছ ধরার ওপর নির্ভরশীল চরফ্যাশন উপকূলীয় এলাকার দুই লাখেরও বেশি জেলে। উপকূলীয় নদ-নদীগুলোতে আষাঢ়-শ্রাবণ এই দুই মাস ইলিশের জন্য ভরা মৌসুম। অন্যদিকে সরকার প্রতি বছর ১৫ মার্চ থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত দুর্যোগের মাস হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তারপরও জীবনের ঝুঁকি আছে জেনেও তারা অথই সমুদ্রের হাতছানিতে ছোট ছোট নৌযানে করে গভীর সাগর পর্যন্ত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছেন মাছ ধরতে।

সরকারিভাবে দুর্যোগ-পূর্ববর্তী নানা সতর্কতা থাকলেও তা কাজে আসছে না উপকূলের স্বল্পশিক্ষিত জেলেদের। কেননা উপকূল থেকে ২০ কিলোমিটার পেরোলেই গভীর সাগরে বাংলাদেশ বেতারের তরঙ্গ মিলছে না। উপকূল থেকে দুই-তিন ঘণ্টা গভীর সাগরের দিকে ট্রলার নিয়ে গেলে মুঠোফোন নেটওয়ার্কও অকার্যকর হয়ে যায়। তখন উপকূলের কয়েক হাজার মাছ ধরার ট্রলারের কয়েক লাখ জেলে পুরোপুরি যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন মূল ভূখণ্ড থেকে। ফলে ঝড়-বৃষ্টি, নিম্নচাপের খবরও জানার সুযোগ পান না তাঁরা। এতে প্রতিবছরই সাগরে ঘটছে প্রাণহানি ও নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা। বাড়ছে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ।

জানা যায়, ২০২২ সালের অক্টোবর মাসে ইলিশ মাছ রক্ষার অভিযানের মধ্যেই ভোলার শতাধিক ট্রলার সাগরে পাঠায় মালিকপক্ষ। ২৪ অক্টোবর ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের কবলে পড়ে ৭টি ট্রলার ডুবে যায়। এর মধ্যে নুসরাত ট্রলারের ২০ জন, শারমিন ট্রলারের ৮ জন, এফবি তিন্নি ট্রলারের ৬ জন, এফবি আম্মাজান-১১সহ মোট ৭৮ জন জেলে নিখোঁজ হন। এর মধ্যে দুই দফায় ৩৬ জন জেলে উদ্ধার হলেও এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ৪২ জন। নিখোঁজদের বাড়ি চরফ্যাশন ও মনপুরা উপজেলায়। ওই ট্রলারের জীবিত ফিরে আসা নিহত নুর ইসলামের ভাই মো. রফিক মাঝি বলেন, ‘আমরা তো হেই সময় গভীর সাগরে আছিলাম। সেইখানে রেডিও ও ফোনের নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। তাই আমরা আবহাওয়ার খবর জানতে পারি নাই। তয় সাগরের অবস্থা দেইখ্যা অনুমান হইছিল যে বড় কোনো বইন্যা আইতে লাগছে। মনডায় কামড় দিছে, সাগরের অবস্থাও তখন খুব খারাপ। মোরা জাল-কাছি সব ট্রলারে উডাইয়্যা কিনারে রওনা দিছি। কিন্তু এত্তো ঢেউ যে ট্রলার সামনে আগায় না। খালি ঢেউয়ে বাড়ি মারে। হেইবার ১৬ জনের মধ্যে আমরা ৩ জন ফিরতে পারছি।’

তিনি বলেন, গভীর সাগরে জেলেদের কাছে মূলত ঘূর্ণিঝড়ের বার্তা পৌঁছায় না। পৌঁছালেও অনেক দেরি হয়। তখন জেলেদের কিছুই করার থাকে না। তবে ট্রলারের মাঝি ও জেলেরা সাগরের পানিতে হাত দিয়ে পানির তাপমাত্রা বেশি হলে অনুমান করে তীরে ফেরা শুরু করেন।

উপজেলার হাজারীগঞ্জ ইউনিয়নের জেলে সিরাজ মাঝি বলেন, ‘সাগরে আমরা মোবাইলেই রেডিও শুনি, কিন্তু পাঁচ-ছয় ঘণ্টা চালাইলেই নেটওয়ার্ক নাই হইয়্যা যায়। তারপর কিনারে কী চলে আমরা কিছুই জানি না।’

বাংলাদেশ বেতার বরিশাল কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তাদের এমডব্লিউ ট্রান্সমিটার ১৮ কিলোওয়াট, যা ৮০-১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত কার্যকর। এফএম ট্রান্সমিটার মাত্র ২ কিলোওয়াট, যা পৌঁছায় ৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত। ফলে তাঁরা সাগর তো দূরের কথা, কিনারায় বসেও বরিশাল বেতার শুনতে পান না।

বেসরকারি এনজিও সংস্থার মৎস্য বিশেষজ্ঞ ও উপজেলার সাবেক মেরিন ফিশারিজ কর্মকর্তা সাইদুর রহমান বলেন, রেডিও তরঙ্গ এবং মোবাইল নেটওয়ার্ক সোজা পথে (লাইন-অব-সাইটে) চলাচল করে। পৃথিবীর বক্রতার কারণে নির্দিষ্ট দূরত্বের পর টাওয়ারের সিগন্যাল মাটির সমান্তরালে চলে যায় এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের অনেক ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। ফলে মাঝসমুদ্রে কোনো সিগন্যাল পাওয়া যায় না। তিনি বলেন, জাহাজ বা নৌকার মধ্যে যোগাযোগের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে ভিএইচএফ রেডিও ব্যবহৃত হয়, যা উপকূলীয় স্টেশন বা অন্যান্য জাহাজের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সাহায্য করে। তারা এ পর্যন্ত চরফ্যাশনের বিভিন্ন মাছঘাটে ২৫টি জিপিএস (গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম) জেলেদের ট্রলারে স্থাপন করেছে।

চরফ্যাশন ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি সোহাগ বলেন, দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে উপকূলের লাখো জেলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাগরে যান। কিন্তু তাঁদের নিরাপত্তার বিষয়টি যুগ যুগ ধরে উপেক্ষিত। এমনকি প্রতিবছর অসংখ্য জেলে সাগরে ঝড়ের কবলে পড়ে মারা যাওয়া ও নিখোঁজ হওয়া জেলেদের পরিবার সরকারি তেমন কোনো সাহায্য-সহযোগিতাও পায় না।

এসআর


Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
Editor : Iqbal Sobhan Chowdhury
Published by the Editor on behalf of the Observer Ltd. from Globe Printers, 24/A, New Eskaton Road, Ramna, Dhaka.
Editorial, News and Commercial Offices : Aziz Bhaban (2nd floor), 93, Motijheel C/A, Dhaka-1000.

Phone: PABX- 41053001-06; Online: 41053014; 01550707296 Advertisement: 41053012; 01550707291, E-mail: [email protected] [email protected]
🔝