দীর্ঘ কয়েক বছর পর ২০০৭ সালে জন্মস্থান নরসিংদী জেলার বেলাব উপজেলার আমলাব এলাকায় চাচার বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে লটকনের একটি বাগান দেখে মুগ্ধ হন মো. হামিদুল্লাহ। ফেরার সময় শখের বশে কয়েকটি লটকনের চারা সঙ্গে নিয়ে আসেন। পরে শেরপুরের ঝিনাইগাতী উপজেলার নলকুড়া ইউনিয়নের ভারুয়া গ্রামে নিজের বাড়ির পাশের পরিত্যক্ত জমিতে চারাগুলো রোপণ করেন।
রোপণের প্রায় সাত বছর পর, ২০১৪ সালে গাছগুলোতে প্রথম ফল আসে। ফলন আশানুরূপ হওয়ায় তিনি বুঝতে পারেন, এ অঞ্চলেও সফলভাবে লটকন চাষ সম্ভব। এরপর তিনি ধীরে ধীরে বাণিজ্যিকভাবে লটকনের বাগান গড়ে তোলেন। বর্তমানে তার বাগানে শতাধিক লটকনগাছ রয়েছে। এর মধ্যে এ বছর ৫১টি গাছের লটকন বিক্রি করে পেয়েছেন ১ লাখ ৯০ হাজার টাকা। মো. হামিদুল্লাহ নলকুড়া ইউনিয়ন পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য।
স্থানীয়দের মতে, হামিদুল্লাহর এই বাগান এখন অনেকের কাছে অনুপ্রেরণার উদাহরণ। তার উদ্যোগে স্থানীয়ভাবে মৌসুমি কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অন্যান্য কৃষকদেরও উদ্বুদ্ধ করছে।
কৃষি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সঠিক পরিচর্যা ও পরিকল্পনা থাকলে লটকন চাষ হতে পারে গ্রামীণ অর্থনীতির একটি সম্ভাবনাময় খাত।
সম্প্র্রতি ওই গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিটি গাছের গোড়া থেকে ডোগা পর্যন্ত থোকায় থোকায় ঝুলছে লটকন। বিভিন্ন এলাকা থেকে ফল ব্যবসায়ীরা এসেছেন লটকন কিনতে। তারা নিজেরাই বাগানে ঢুকে গাছ থেকে ইচ্ছেমতো লটকন সংগ্রহ করছেন। আবার এ বাগানের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের পর অনেকেই দেখতেও আসছেন।
ইউপি সদস্য মো. হামিদুল্লাহ বলেন, শুরুতে শুধু শখের বশে কয়েকটি চারা লাগিয়েছিলাম। পরে ভালো ফলন দেখে বাগান বড় করার সিদ্ধান্ত নিই। লটকন চাষে তেমন পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না।
তিনি আরো বলেন, গাছ রোপণের পর পরিপূর্ণ বড় হতে প্রায় ১০ বছর লেগে যায়। তার পর থেকে ফলের উৎপাদন বাড়তে থাকে। প্রথমে আমি যখন লটকনের বাগান করি, তখন অনেকেই নিরুৎসাহিত করেছেন। তারা বলেছেন, আমাদের অঞ্চলে এটির ভালো ফলন হবে না। লোকসান হবে, কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। আজ প্রমাণিত হয়েছে, আমাদের এলাকায় লটকন চাষ সম্ভব। এখন তিনি প্রতিবছর লটকন বিক্রি করে উল্লেখযোগ্য আয় হচ্ছে। ভবিষ্যতে আরও গাছ লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান এ ইউপি সদস্য।
স্থানীয় শ্রমিক মো. আব্দুল কুদ্দুস বলেন, আমরা মেম্বারের লটকন বাগানের পরিচর্যার কাজ করে যে বেতন পাই, তাতে আমার সংসার চলে। এছাড়া মেম্বারের বাগানের দেখাদেখি আরও কয়েকজন চাষ শুরু করেছে। ওই বাগানগুলোতেও অনেক শ্রমিকরা কাজ কওে, তাদেও সংসার চালান।
স্থানীয় কৃষক মো. আব্দুস সালাম বলেন, মেম্বারের বাগান দেখে আমার বাড়ির পাশের জমিতে লটকন গাছের চারা রোপণের জন্য ইতোমধ্যে প্রস্তুত করেছি। আশা করছি, অল্প কিছু দিনের মধ্যে চারা রোপণ করতে পারব।
শিক্ষক মো. আবুল কাশেম বলেন, এ বাগানের লটকন আকারে বড় এবং সুমিষ্ট। লটকন প্রচুর ক্যালরি ও পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ একটি ঔষুধি গুণসম্পন্ন ফল। এ বাগানে লটকন দেখে আমি অবাক হয়েছি। আমি নিজেও লটকন গাছের চারা রোপণ করব।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. ফরহাদ হোসেন বলেন, এ অঞ্চলের মাটি লটকন চাষের উপযোগী। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে হামিদুল্লাহকে পরামর্শসহ সার্বিক সহযোগিতা করা হয়। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে লটকন চাষের সম্ভাবনা আছে এ অঞ্চলে। সঠিক পরিচর্যা, ব্যবস্থাপনা ও বাজারজাতকরণ নিশ্চিত করা গেলে লটকন চাষ গ্রামীণ অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে অনাবাদি বা পরিত্যক্ত জমি কাজে লাগিয়ে এ ফলের চাষ কৃষকদের জন্য লাভজনক বিকল্প হতে পারে।
এসআর