দীর্ঘ সাড়ে চার বছর বন্ধ থাকার পর পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার করতোয়া নদীর বালুমহালগুলোতে আবারও শুরু হয়েছে ড্রেজারের ঝনঝনানি। নতুন মেয়াদে বালুমহাল ইজারা দেওয়ার পর নদীর বিভিন্ন পয়েন্টে নিষিদ্ধ ড্রেজার, শ্যালো মেশিন ও এক্সেভেটর ব্যবহার করে বালু উত্তোলনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
স্থানীয়দের দাবি, গত দুই মাস ধরে দিন-রাত সমান তালে চলছে এই কার্যক্রম। তবে এ সময়ের মধ্যে নিষিদ্ধ যন্ত্রপাতির ব্যবহার বন্ধে দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক অভিযান দেখা যায়নি।
সোমবার সরেজমিনে উপজেলার করতোয়া নদীর টাকাহারা, সোনাপোতা ও তেলীপাড়া এলাকায় গিয়ে একাধিক ড্রেজার, শ্যালো মেশিন ও এক্সেভেটর ব্যবহার করে বালু উত্তোলনের চিত্র দেখা যায়। যারা এসব চালায় তারা সবাই একটি রাজনৈতিক দলের নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তি।
স্থানীয়রা জানান, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ড্রেজারের মাধ্যমে নদী থেকে বালু তুলে ট্রাক্টরে লোড করা হয়। কয়েকটি পয়েন্টে রাত ও ভোর পর্যন্তও বালু উত্তোলন চলে। বালুর চাহিদা বেশি থাকলে রাতের বেলাতেও ড্রেজার বন্ধ থাকে না।
তাদের দাবি, প্রশাসনের অভিযান এড়াতে নৌকা কিংবা ড্রামের ওপর ড্রেজার স্থাপন করা হয়। পরে পাইপের মাধ্যমে সেই বালু ট্রাক্টরে তোলা হয়। অনেক ক্ষেত্রে নদীর পাড়ে বালু স্তূপ করে রেখে পরে তা সরিয়ে নেওয়া হয়। অভিযান পরিচালনার খবর পেলেই সংশ্লিষ্টরা ড্রেজারসহ নৌকা নদীর অন্য প্রান্তে সরিয়ে নেয় বলেও অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।
২০২১ সালের পর পুলিশ-প্রশাসন ও স্থানীয় সাংবাদিকদের তৎপরতায় করতোয়া নদীতে ড্রেজার, শ্যালো মেশিন ও এক্সেভেটরের ব্যবহার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর প্রায় সাড়ে চার বছর শ্রমিক দিয়ে সনাতনী পদ্ধতিতে বালু উত্তোলন করা হচ্ছিল। তবে চলতি বছরের এপ্রিলে নতুন মেয়াদে দেবীগঞ্জের তিনটি বালুমহাল ইজারা দেওয়ার পর থেকে আবারও নিষিদ্ধ যন্ত্রের ব্যবহার শুরু হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
স্থানীয়দের মতে, দেবীডুবা ঘাটের টাকাহারা, হালিমের ঘাট ও তেলীপাড়া ঘাটের অন্তত চারটি সাব-পয়েন্টে দিন-রাত সমান তালে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। নদীতে ট্রাক লোড দেওয়ার কথা বলে এক্সেভেটর নামানো হলেও অনেক সময় তা দিয়েও সরাসরি বালু উত্তোলন করা হয়।
নতুন ইজারা কার্যক্রম শুরুর পর গত দুই মাসে ড্রেজার ও এক্সেভেটরের ব্যবহার বন্ধে দৃশ্যমান কোনো প্রশাসনিক অভিযান হয়নি বলেও অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। এর মধ্যে গত ১২ মে উপজেলা প্রশাসন বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন প্রতিপালন বিষয়ে ইজারাদারদের নিয়ে মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। অনেকেই ওই সভাকে ‘অন্দরমহলের বৈঠক’ বলছেন।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, ড্রেজার, শ্যালো মেশিন ও এক্সেভেটর ব্যবহার করে বালু উত্তোলন যে আইনবিরোধী, তা ইজারাদারদের অজানা নয়। তারপরও মাঠপর্যায়ে আইন প্রয়োগের পরিবর্তে এমন মতবিনিময় সভা কতটা কার্যকরী প্রশ্ন রাখেন তারা।
সোমবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে তেলীপাড়া ঘাটের দাড়ারহাট সেচ প্রকল্প এলাকা অতিক্রম করে সামনে গেলে নদীর পাড় থেকে সামান্য দূরে শ্যালো মেশিন দিয়ে বালু উত্তোলনের দৃশ্য দেখা যায়। পরে এক্সেভেটরের মাধ্যমে ট্রাক্টরে বালু লোড করা হচ্ছিল।
আশপাশের স্থানীয়দের দাবি, অনেক সময় ওই এক্সেভেটর দিয়েই সরাসরি বালু উত্তোলন করা হয়।
বিষয়টি তাৎক্ষণিক ভাবে উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল্লাহ বিন জিয়াকে জানানো হলে তিনি দেবীডুবা ভূমি অফিসকে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। তবে উপ-সহকারী ভূমি কর্মকর্তা দিপালী রানী ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই এক্সেভেটর সরিয়ে নেওয়া হয়। একইসঙ্গে পাইপ খুলে শ্যালো মেশিন অপসারণের প্রস্তুতিও শুরু হয়। ফলে প্রশাসনের উপস্থিতির আগেই বালু ব্যবসায়ীদের তথ্য পাওয়া নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ইউএনও দেবীগঞ্জে না থাকায় সহকারী কমিশনার বিষয়টি থানাকে অবহিত করেন। পরে পুলিশ সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন। ড্রেজার জব্দের উদ্যোগ নেওয়া হলেও শ্রমিক সংকটের কারণে তা সম্ভব হয়নি। পরে তেলীপাড়া ঘাটের ইজারাদার সরকার ফরিদুল ইসলামের প্রতিনিধিকে উপজেলা ভূমি অফিসে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
একই সময়ে বিষয়টি জেলা প্রশাসক শুকরিয়া পারভীনকে মুঠোফোনে জানানো হলেও প্রায় চার ঘণ্টা পরও দৃশ্যমান কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) পঞ্চগড় জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আজহারুল ইসলাম জুয়েল বলেন, 'নদীতে ড্রেজার, শ্যালো মেশিন, এক্সেভেটর বন্ধে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পঞ্চগড়ে এর আগেও ড্রেজার বন্ধে রক্তপাত হয়েছিল। আইন প্রয়োগে পুলিশ-প্রশাসন কঠোর অবস্থানে না থাকলে করতোয়ায় আবারো ড্রেজারের ব্যবহার শুরু হবে। যেটা পরিবেশ প্রতিবেশের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনবে।'
এই বিষয়ে এসিল্যান্ড ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আব্দুল্লাহ বিন জিয়া বলেন, 'কেউ যদি আইন ভঙ্গ করে তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমরা তথ্য সংগ্রহ করছি। যদি সহ্য সীমার বাইরে চলে যায় তাহলে বালুমহালের লিজ বাতিলের জন্য আমরা লেখব। তারা যদি শুধরে যায় শুধরাবে। নয়তো আমাদের অভিযানও চলবে এবং প্রশাসনিক ভাবে আমাদের যে কাজগুলো করা দরকার আমরা করব।'
বালুমহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন অনুযায়ী ড্রেজার, শ্যালো মেশিন ও এক্সেভেটর ব্যবহার করে বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এছাড়া জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও শুরু থেকেই সনাতনী পদ্ধতিতে বালু উত্তোলনে ইজারাদারদের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
এসআই/এএম/এমএ