ডিজিটাল যুগে শিশু-কিশোরদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, অতিরিক্ত সময় ধরে এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের ফলে শিশু-কিশোরদের ঘুম, মানসিক স্বাস্থ্য, মনোযোগ এবং সামাজিক আচরণে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশেও বয়সভিত্তিক নিয়ন্ত্রণের দাবি জোরালো হচ্ছে।
২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৬ কোটি, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৪ শতাংশ। ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশ কিশোর ও তরুণ। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক এবং ইনস্টাগ্রাম তাদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে ব্যয় করার ফলে শিশু-কিশোরদের মধ্যে ঘুমের ব্যাঘাত, মনোযোগের ঘাটতি, উদ্বেগ, বিষণ্নতা এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে পারিবারিক যোগাযোগ কমে যাওয়া এবং বাস্তব জীবনের সামাজিক সম্পর্ক দুর্বল হওয়ার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সালাহউদ্দিন কাউসার বিপ্লব বলেন, অতিরিক্ত ইন্টারনেট ব্যবহার মস্তিষ্কে ডোপামিনের ক্ষরণ বাড়িয়ে দেয়, যা ধীরে ধীরে স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, “অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিশুরা বাস্তব সামাজিক যোগাযোগ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ঘুমের সমস্যা, ব্যক্তিগত পরিচর্যায় অনীহা এবং চোখের বিভিন্ন সমস্যাও বাড়ছে। অতিরিক্ত স্ক্রিননির্ভরতা শিশুদের কল্পনাশক্তি ও সৃজনশীলতার বিকাশেও বাধা সৃষ্টি করতে পারে।”
‘নেচার অ্যান্ড সায়েন্স অব স্লিপ’ সাময়িকীতে প্রকাশিত বাংলাদেশের ১ হাজার ১৩৯ জন শিক্ষার্থীর ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সময় যত বাড়ে, ঘুমের মান তত কমে যায়। বিশেষ করে দিনে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় এসব প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারকারীদের মধ্যে ঘুমজনিত সমস্যা বেশি দেখা গেছে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার শিশুরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বিভিন্ন ডিজিটাল ডিভাইসে সময় ব্যয় করে। গবেষণায় অংশ নেওয়া শিশুদের উল্লেখযোগ্য অংশ চোখের সমস্যা, মাথাব্যথা এবং ঘুমের ঘাটতিতে ভুগছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
শিশু-কিশোরদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। যুক্তরাজ্য বয়স যাচাই ব্যবস্থা আরও কঠোর করার উদ্যোগ নিয়েছে।
এ ছাড়া ফ্রান্স, নরওয়ে, স্পেন, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশ বয়সভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ বা ব্যবহার সীমিত করার নীতিমালা নিয়ে কাজ করছে। চীন ‘মাইনর মোড’ চালুর মাধ্যমে নির্দিষ্ট বয়সের নিচে শিশুদের স্ক্রিন টাইম সীমিত করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নও শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা জোরদারে বিভিন্ন নির্দেশনা বাস্তবায়ন করছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে শিশু-কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে কোনো নির্দিষ্ট বয়সসীমা বা বাধ্যতামূলক বয়স যাচাই ব্যবস্থা নেই। শিশু অধিকার ও সাইবার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিদ্যমান আইনেও এ বিষয়ে সুস্পষ্ট বিধান অনুপস্থিত।
ইউনিসেফের এক জরিপে দেখা গেছে, অংশগ্রহণকারী তরুণদের ৪৫ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছে। জরিপে অংশ নেওয়া অধিকাংশ তরুণ অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও কার্যকর ও কঠোর নীতিমালার পক্ষে মত দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশু-কিশোরদের নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ নিশ্চিত করতে বয়সভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ, বাধ্যতামূলক বয়স যাচাই ব্যবস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ডিজিটাল নিরাপত্তাবিষয়ক পাঠ্যক্রম চালু এবং অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা বলেন, “আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে বাংলাদেশেও এ বিষয়ে নীতিগত আলোচনা চলছে। শিশু-কিশোরদের জন্য নিরাপদ অনলাইন পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ বিবেচনা করা হচ্ছে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি শিশু-কিশোরদের মানসিক ও শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
এসআর