বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী এবং তাদের আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন ও সুরক্ষা জোরদারে নতুন করে ১৪ মিলিয়ন ইউরো অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)।
জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)-এর সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে এই সহায়তা প্রদান করা হবে। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ ইউরো সমমূল্যের অর্থ।
বৃহস্পতিবার ইউএনএইচসিআর বাংলাদেশের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
আগামী ২০ জুন ‘বিশ্ব শরণার্থী দিবস’ উপলক্ষে আয়োজিত কর্মসূচির প্রাক্কালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এ সহায়তার ঘোষণা দেয়। সংশ্লিষ্টরা জানান, এ তহবিলের মাধ্যমে রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, সুরক্ষা, জীবিকা এবং মৌলিক সেবাসহ বিভিন্ন খাতে সহায়তা কার্যক্রম জোরদার করা হবে।
বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদি মানবিক সংকট মোকাবিলায় বৈশ্বিক সংহতির অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে ইউএনএইচসিআর।
ইউএনএইচসিআরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই নতুন অর্থায়ন মূলত মানবিক সহায়তার পাশাপাশি শরণার্থীদের স্বনির্ভরতা ও স্থানীয় বাংলাদেশিদের সক্ষমতা বাড়াতে ব্যয় করা হবে। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী ও স্থানীয় বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর প্রায় ৭০ হাজার মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং জীবনমান উন্নয়নে এটি সরাসরি ভূমিকা রাখবে। এ ছাড়া পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এই তহবিলের আওতায় লিকুইড পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) বা রান্নার ক্লিন গ্যাস সরবরাহ করা হবে। এলপিজি ব্যবহারের ফলে রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের বনাঞ্চল থেকে কাঠ কুড়ানোর ঝুঁকি কমবে এবং রান্নার ধোঁয়াজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি ও বনের ওপর চাপ কমবে।
এদিকে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধিদলের প্রধান মাইকেল মিলার এই দীর্ঘস্থায়ী সংকট মোকাবিলায় সাড়া দেওয়ার পদ্ধতি পরিবর্তনের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, ইইউ রোহিঙ্গা শরণার্থী ও তাদের আশ্রয়দানকারী বাংলাদেশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পাশে থাকতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই ১৪ মিলিয়ন ইউরো স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের জন্য শিক্ষা, কর্মমুখী শিক্ষা ও আয়বর্ধক কাজের সুযোগ বাড়াবে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের মর্যাদা রক্ষা করা, তাদের সক্ষমতা বাড়ানো এবং এমন কিছু বাস্তবমুখী দক্ষতা শেখানো, যাতে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি অনুকূলে এলে তারা নিজ দেশ মিয়ানমারে স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও সসম্মানে ফিরে গিয়ে নিজেদের জীবন নতুন করে গড়ে তুলতে পারে।
ইউএনএইচসিআরের বাংলাদেশ প্রতিনিধি ইভো ফ্রেইসেন এই অবিচল সমর্থনের জন্য ইইউকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, দীর্ঘ ৯ বছর ধরে চরম কষ্টের মধ্যে থাকা পরিবারগুলোর মৌলিক চাহিদা পূরণ, সুরক্ষা ও সুন্দর ভবিষ্যতের আশা বাঁচিয়ে রাখতে এই সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কক্সবাজারের শরণার্থীশিবিরগুলোর জনাকীর্ণ পরিবেশ ও সীমিত সম্পদের কারণে রোহিঙ্গারা প্রতিনিয়ত নানামুখী ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। বিশেষ করে, নারী ও শিশুরা মানব পাচার, শোষণ ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার চরম ঝুঁকিতে থাকে।
নতুন এই অনুদানের মাধ্যমে ক্যাম্পের ভেতরে নিরাপদ আশ্রয়স্থল নির্মাণ, পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা করা এবং কার্যকর কমিউনিটি-ভিত্তিক সুরক্ষাব্যবস্থা শক্তিশালী করা হবে। এর ফলে শরণার্থীদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা সহজ হবে বলে মনে করছে জাতিসংঘ।
ইউএনএইচসিআর রোহিঙ্গা সংকটের জন্য গৃহীত ২০২৫-২৬ জয়েন্ট রেসপন্স প্ল্যানের (জেআরপি) আওতায় বাংলাদেশ সরকার ও আন্তর্জাতিক দাতাদের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে। চলতি বছরে ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর জরুরি চাহিদা পূরণ এবং নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে ৭১ কোটি মার্কিন ডলার (৭১০ মিলিয়ন ডলার) প্রয়োজন হবে বলে ইউএনএইচসিআরের পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
এসআর