সড়কের বেহাল দশা ও গাড়ি উল্টে যাওয়ায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ে ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এ যানজট স্থায়ী ছিল। গত দুদিনের টানা বৃষ্টি, সড়কে কাদা-পানি জমে থাকা এবং বড় বড় খানাখন্দ তৈরি হওয়ায় মহাসড়ক বেহাল অবস্থায় পরিণত হয়।
এছাড়া রাতভর সড়কের পাশে জ্বালানি তেলের পাম্পগুলোতে এলোমেলো পার্কিং করে গাড়ির দীর্ঘ সারি এবং মহাসড়কের তিনটি পয়েন্টে গাড়ি উল্টে যাওয়ায় কাঁচপুর থেকে মেঘনা টোল প্লাজা পর্যন্ত এই যানজটের সৃষ্টি হয়। ফলে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দুই লেনের যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, বৃহস্পতিবার সকালে মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে ধীরগতিতে যান চলাচল করে। পরে দুপুরের দিকে যানজট আরও তীব্র আকার ধারণ করে। গত দুদিনের বৃষ্টির ফলে সড়কের অনেক স্থানে খানাখন্দ তৈরি হয়ে সেখানে পানি জমে থাকে। কোথাও কোথাও সড়কের কার্পেটিং উঠে গিয়ে গভীর গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। সড়কের দুই পাশের কাঁচা রাস্তায়ও বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। ফলে একসঙ্গে একাধিক গাড়ি চলাচল করতে পারছে না। বিশেষ করে ভারী যানবাহন, যাত্রীবাহী বাস ও পণ্যবাহী ট্রাক ধীরগতিতে চলাচল করায় পুরো মহাসড়কজুড়ে দীর্ঘ সারির সৃষ্টি হয়। কাঁচপুর সেতুর নিচ দিয়ে ইউ-টার্ন নিয়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যানবাহন প্রবেশ করতে না পারায় চাপ গিয়ে পড়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে। ওই সড়কে সংস্কার কাজ চলায় যানবাহন ধীরগতিতে চলছে। এদিকে মহাসড়কের মদনপুর ও জাঙ্গাল এলাকা থেকে মেঘনা টোল প্লাজা পর্যন্ত তিনটি গাড়ি রাস্তার ওপর উল্টে গিয়ে বিকল হয়ে পড়ে। এতে রাস্তার দুই পাশে চলাচলরত যানবাহন ধীরগতিতে চলতে থাকে।
অন্যদিকে, মহাসড়ক ঘেঁষে অবস্থিত বিভিন্ন তেলের পাম্পে জ্বালানি সংগ্রহের জন্য এলোমেলোভাবে গাড়ি পার্কিং করায় যানজট আরও বৃদ্ধি পায়। ফলে কাঁচপুর, শিমরাইল, মদনপুর ও ভূলতা সংযোগ এলাকা পেরিয়ে এই যানজট মেঘনা টোল প্লাজা পর্যন্ত বিস্তৃত হয়।
সোনারগাঁওয়ের দড়িকান্দি থেকে বাসে করে যাত্রাবাড়ী যাচ্ছিলেন ব্যবসায়ী শাহরিয়ার হাসান। তিনি বলেন, “প্রায় ৪০ মিনিট ধরে কেওডালায় আটকে আছি। গাড়ি নড়ছে না। গন্তব্যে পৌঁছাতে কতক্ষণ লাগবে বলা যাচ্ছে না।”
মোকাররম মামুন নামের এক গণমাধ্যমকর্মী দীর্ঘ ৪০ মিনিট ধরে মদনপুরে যানজটে আটকে আছেন। তিনি বলেন, “সকাল থেকেই এই অবস্থা। ভেবেছিলাম দুপুরে সড়ক ফাঁকা হবে, কিন্তু তা হয়নি।”
যানজটে আটকে পড়া যাত্রীদের অভিযোগ, কয়েক কিলোমিটারের পথ পাড়ি দিতে সময় লাগছে কয়েক ঘণ্টা। অনেকে অফিস, জরুরি কাজ কিংবা গন্তব্যে সময়মতো পৌঁছাতে না পেরে দুর্ভোগে পড়েছেন। বিশেষ করে নারী, শিশু ও অসুস্থ যাত্রীরা বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন।
ঢাকাগামী বাসের যাত্রী মতিন সরোয়ার বলেন, “যেখানে আধা ঘণ্টার রাস্তা, সেখানে তিন ঘণ্টা ধরে বসে আছি। গাড়ি একটু এগোয়, আবার ১০-১৫ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকে। বৃষ্টির কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।”
ট্রাকচালক মোস্তাফা জানান, “সড়কে এত গর্ত ও কাদা যে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এক পাশ দিয়ে গাড়ি গেলে অন্য পাশ থেমে থাকতে হচ্ছে। এতে পেছনে শত শত গাড়ি আটকে যাচ্ছে।”
স্থানীয় বাসিন্দা ও চালকরা বলেন, সাময়িকভাবে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করে যানজট কিছুটা কমানো গেলেও মূল সমস্যা সড়কের বেহাল অবস্থা। তাই দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত অংশ সংস্কার, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা এবং ভারী যান চলাচলে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ না আনলে এই ভোগান্তি আরও দীর্ঘস্থায়ী হবে।
শিমরাইল হাইওয়ে পুলিশ ক্যাম্পের ট্রাফিক ইনচার্জ জুলহাস উদ্দিন বলেন, বৃষ্টির কারণে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কাদা ও পানিতে তলিয়ে আছে। সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় খানাখন্দের সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে একবারে একটি করে গাড়ি পার হতে পারছে। কাঁচপুর সেতুর নিচ দিয়ে সিলেট মহাসড়কে গাড়ি প্রবেশ করতে না পারায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া সড়কের তিনটি স্থানে গাড়ি বিকল হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে আমাদের একাধিক টিম কাজ করছে। বিকল গাড়িগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যানজট নিরসনে পুলিশ সদস্যরা মাঠে কাজ করছেন এবং বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে সড়কের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দ্রুত সংস্কার না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
কাঁচপুর হাইওয়ে পুলিশ থানার ইনচার্জ বিষ্ণুপদ জানান, পাম্পে তেল নেওয়ার জন্য এলোমেলোভাবে গাড়ি রাখার কারণেই এই যানজট সৃষ্টি হয়েছে। এটি রাত থেকেই শুরু হয়। মহাসড়কের যানজট স্বাভাবিক করতে সকাল থেকে হাইওয়ে পুলিশ কাজ করছে।
এমএইচ/আরএন