একসময় গ্রামবাংলার ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল মাটির ঘর। আধুনিকতার ছোঁয়ায় টিন ও পাকা ভবনের বিস্তার ঘটায় সেই ঐতিহ্য এখন প্রায় বিলুপ্তির পথে। টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে এখনো হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার পূর্বপুরুষের স্মৃতি ধরে রাখতে কিংবা স্বাচ্ছন্দ্যের কারণে মাটির ঘরে বসবাস করছে।
সখীপুর উপজেলার গজারিয়া ইউনিয়নের পাথারপুর গ্রামের আনোয়ারা খাতুন (৭৫) প্রায় তিন দশকের বেশি সময় ধরে স্বামীর তৈরি মাটির ঘরেই বসবাস করছেন। তাঁর স্বামী মৃত আমির উদ্দীন প্রায় ২০ বছর আগে মারা গেলেও সেই ঘরই আজ তাঁর সুখ-দুঃখের সঙ্গী। আনোয়ারা খাতুন বলেন, জীবনের অধিকাংশ সময়ই তিনি এই মাটির ঘরে কাটিয়েছেন। তাই ঘরটি তাঁর কাছে শুধু বসবাসের স্থান নয়, স্মৃতিরও আশ্রয়।
একই চিত্র দেখা গেছে হতেয়া রাজাবাড়ী ইউনিয়নের হতেয়া গ্রামে। মৃত রমিজ উদ্দিনের স্ত্রী আনোয়ারা বেগম (৭০) সারা জীবন মাটির ঘরেই কাটিয়েছেন। স্বামী মারা যাওয়ার পরও তিনি সেই ঘরেই বসবাস করছেন। তাঁর জ্যেষ্ঠ কন্যা নাজমা আক্তার বলেন, “মাটির ঘরটিই আমার মায়ের আনন্দ-বেদনার সঙ্গী।”
সরেজমিনে উপজেলার বহুরিয়া ইউনিয়নের করুটিয়াপাড়া, গজারিয়া ইউনিয়নের পাথারপুর, হতেয়া রাজাবাড়ী ইউনিয়নের হতেয়া, দাঁড়িয়াপুর ইউনিয়নের মৌশাসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, আগের তুলনায় মাটির ঘরের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। কোথাও কোথাও পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে এসব ঘর। আবার কিছু পরিবার পূর্বপুরুষের স্মৃতি রক্ষার্থে মাটির ঘর সংরক্ষণ করে রেখেছে। কেউ কেউ এখনো সেই ঘরেই বসবাস করছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় গ্রামাঞ্চলের অধিকাংশ পরিবারের বসবাস ছিল মাটির ঘরে। এসব ঘর ছিল মজবুত, টেকসই এবং গ্রীষ্মকালে শীতল। মাটির সঙ্গে তুষ ও চুন মিশিয়ে কাঠের খুঁটির ওপর নিখুঁতভাবে তৈরি করা হতো এসব ঘর। কোথাও কোথাও দুইতলা মাটির ঘরও ছিল, যেখানে কাঠের সিঁড়ি ব্যবহার করা হতো। গ্রামাঞ্চলে এসব ঘর ‘কোঠা ঘর’ নামেও পরিচিত ছিল।
পাথারপুর গ্রামের কৃষক লাল মিয়া বলেন, “আমাদের বাড়িতে বাপ-দাদার আমল থেকেই মাটির ঘর ছিল। এখন আমরা টিনের ঘরে থাকি, তবে আমার মা এখনো মাটির ঘরেই থাকেন। বাপ-দাদার স্মৃতি রক্ষার্থে ঘরটি ভাঙিনি।”
হতেয়া গ্রামের বাসিন্দা নিয়ামুল হক বলেন, “ছোটবেলা থেকেই দেখেছি বাবা মাটির ঘরেই থাকতেন। তীব্র গরমেও মাটির ঘর অনেক শীতল থাকে।”
দাঁড়িয়াপুর ইউনিয়নের ছোট মৌশা গ্রামের কৃষক মো. শহিদুল ইসলাম বলেন, “আমার জন্মের পর থেকেই বাবা-মাকে মাটির ঘরে থাকতে দেখেছি। ঈদের আগে মা-বাবা পুরো ঘর নতুন করে লেপে দিতেন। সেই সময়ের মাটির ঘরের সৌন্দর্য আমাদের ঈদের আনন্দ আরও বাড়িয়ে দিত।”
সখীপুর সরকারি কলেজের ভূগোল বিভাগের প্রভাষক মোছা. নাছিমা আক্তার বলেন, “মাটির ঘর আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একসময় টিন বা দালানকোঠার প্রচলন না থাকায় মানুষ মাটির ঘরেই বসবাস করত। বর্তমানে এ ধরনের ঘর অনেক কমে গেলেও গ্রামের বিভিন্ন স্থানে এখনো কিছু মানুষ মাটির ঘরে বসবাস করছেন। এসব ঘরকে ঘিরে মানুষের জীবনের অসংখ্য সুখ-দুঃখের স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে।”