অশান্ত হয়ে উঠেছে ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। ৭ বছরের মাথায় সুন্দরবন আবারও বন ও জলদস্যুদের দখলে। পুরানো আত্মসমর্পণকারী এবং নতুন ভাবে সংগঠিত দল মিলে অন্তত ১৮টি দস্যু বাহিনী এখন সক্রিয়। এসব দস্যু দল জেলে ও পর্যটকদের অপহরণ করে আদায় করছে লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ। এতে পর্যটক, জেলে, বনজীবী ও ব্যবসায়ীদের মাঝে দেখা দিয়েছে আতঙ্ক।
# গত ২ মাসে দুই শতাধিক জেলেকে অপহরণ করে বিভিন্ন বাহিনী
# ডাকাতদের কাছে জিম্মি থাকা ৫২ জন নারী ও পুরুষকে উদ্ধার
# আতঙ্কে পর্যটক, জেলে ও ব্যবসায়ীরা
# চাঁদার হার ৫০ হাজার ১ লাখ টাকা
# কোস্ট গার্ডের অভিযান অব্যাহত, তবুও থেমে নেই দস্যুতা
# দস্যুদের হাতে রয়েছে দেশি-বিদেশি আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র
# স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চান দস্যুরা
গোটা সুন্দরবন দস্যুদের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও পূর্ব বন বিভাগের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জ এলাকায় এদের আধিপত্য বেশি বলে জানা গেছে।
২০১৮ সালে আত্মসমর্পণ ও পুনর্বাসনের মধ্য দিয়ে দস্যুমুক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল সুন্দরবনকে। কিন্তু ২০২৪ সালের ০৫ অগাস্টের পর থেকে ধীরে ধীরে পাল্টে যেতে থাকে সেই পেক্ষাপট। ফের দস্যুদের রাজত্বে পরিণত হয় সুন্দরবন। এ অবস্থায় বনে যেতে ভয় পাচ্ছেন জেলেরা। তবে, নতুন করে দস্যুদের উত্থানের পর থেকেই তাদের নির্মূলে কোস্ট গার্ড পশ্চিম জোনের সদস্যরা অব্যাহত রেখেছে তাদের অভিযান। তারপরও থেমে নেই দস্যুতা।
আত্মসমর্পণের প্রেক্ষাপট
এক সময় বন ও জল দস্যুদের বেপরোয়া তাণ্ডবে ভয়ের রাজত্বে পরিণত হয়েছিল সুন্দরবন। নিজেদের আধিপত্য বিস্তার ও অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে বাহিনীর প্রধানসহ বহু দস্যু নিহত হয়েছে। এছাড়া, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানেও মারা পড়েছেন অনেকে।
অন্যদিকে, দস্যুদের হাতেও হত্যা, নির্যাতনের শিকার হয়েছেন অসংখ্য বনজীবী। ২০১৬ থেকে ২০১৮ সালে ধাপে ধাপে ৩২টি দস্যু বাহিনীর ৩২৮ জন সদস্য আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদসহ আত্মসমর্পণ করেন। স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যান আত্মসর্ম্পণকারী দস্যুরা।
পুনরায় যে কারণে ফেরা দস্যুতায়
২০২৪ সালের ০৫ অগাস্টে সরকার পরিবর্তনের পর তারা সরকারি সহায়তা থেকে অনেকটা বঞ্চিত। স্বাভাবিক জীবনে ফিরেও বয়ে বেড়াতে হচ্ছে তাদের দস্যু নামের সেই পুরানো অপবাদ। এমনকি নিজ এলাকার বাইরে কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে সেখানেও তাদের সম্পৃক্ততা দেখিয়ে মিথ্যা মামলা এবং প্রশাসনিক হয়রানি করা হয়। প্রতিশ্রতি পেলে আবারও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে চান তারা।
অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়
এক বছর ধরে অস্বাভাবিক বেড়েছে দস্যুদের উৎপাত। এ পর্যন্ত কমপক্ষে তিন শতাধিক জেলে অপহরণ ও নির্যাতনের শিকার হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে অনেকেই গোপনে মোবাইল বিকাশ এবং দস্যুদের সোর্সের মাধ্যমে মুক্তিপণের টাকা পরিশোধ করে ফিরে এসেছেন। পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে দস্যুদের পদচারণা বেশি। বনের মরাভোলা, আলীবান্দা, ধনচেবাড়িয়া, দুধমুখী, শ্যালা, নারকেলবাড়িয়া, তেঁতুলবাড়িয়া, টিয়ারচর, পশুর, আন্দারমানিক, শিবসাসহ বিভিন্ন এলাকায় বাহিনীগুলোর অবস্থান বলে জানা গেছে।
গডফাদারদের রয়েছে টোকেন বাণিজ্য
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমান সময়েও বনসংলগ্ন এলাকার কিছু প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি দস্যুদের গডফাদার, মধ্যস্ততাকারী এবং সোর্স হিসেবে কাজ করছেন। তারা গোপানে জিম্মি জেলেদের পরিবার ও তাদের মহাজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করে মুক্তিপণের টাকা (চাঁদা) আদায় করে দস্যু বাহিনীর কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। সোর্সের মাধ্যমে বিভিন্ন বাহিনীর সংকেত সম্বলিত টোকেন দেওয়া হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। এই টোকেন জেলের নৌকায় থাকলে নিরাপদে মাছ ধরা যায়।
অনিশ্চয়তায় জেলে-ব্যবসায়ীরা
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শরণখোলার সাধারণ জেলে ও সম্প্রতি মুক্তিপণ দিয়ে ফিরে আসা কয়েকজন জেলের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখন সুন্দরবনে যেতে তাদের ভয় লাগে। কখন দস্যুরা এসে হানা দেয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে শরণখোলার একাধিক মৎস্য ব্যবসায়ী জানান, দস্যুদের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলা নিরাপদ না। কারণ বনের পাশের জেলেপল্লী ও মৎস্য আড়তের আশপাশে দস্যুদের সোর্সরা ঘোরাফেরা করে। এই ভয়ে দস্যুদের বিরুদ্ধে জেলে বা মহাজন কেউই মুখ খুলতে সাহস পান না। সব সময় একটা আতঙ্ক তাড়া করছে তাদের। বনে জেলেদের পাঠালেই নৌকা প্রতি ২০-৩০ হাজার টাকা চাঁদা দিতে হয়। আর কোনো জেলে অপহরণ হলে তার মুক্তিপণ হিসেবে দিতে হয় ৫০ হাজার থেকে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এক লাখ টাকা পর্যন্ত।
আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও বনবিভাগের তৎপরতা
কোস্ট গার্ড মোংলা পশ্চিম জোনের স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট কমান্ডার আবরার হাসান ডেইলি অবজারভারকে বলেন, '২০২৪ সালের ০৫ অগাস্টের পর থেকে নতুন করে সুন্দরবনে দস্যুদের উৎপাত শুরু হয়। এরপর থেকে নিয়মিত অভিযানের পাশপাশি আমাদের বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এবং দস্যুদের অবস্থান শনাক্তকরণে গোয়েন্দা বিভাগ কাজ করছে।
সর্বশেষ, জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত সুন্দরবনে ডাকাত ও জলদস্যুবিরোধী অভিযানে মোট ৩৮টি আগ্নেয়াস্ত্র, দুটি হাত বোমা, ৭৪ দেশীয় অস্ত্র, অস্ত্র তৈরির বিপুল সরঞ্জামাদি, ৪৪৮ রাউন্ড কার্তুজ এবং ডাকাতদের কাছে জিম্মি থাকা ৫২ জন নারী ও পুরুষকে উদ্ধার করা হয়। ৪৯ জন ডাকাতকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
তবে বনদস্যুরা যদি পুনরায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায় তাহলে তাদের সব ধরনের সহযোগীতা করারও আশ্বাস দিয়েছেন কোস্ট গার্ডের এই কর্মকর্তা।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগ বাগেরহাটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করীম চৌধুরী ডেইলি অবজারভারকে বলেন, 'বনজীবীদের নিরাপত্তায় বনরক্ষীদের টহল জোরদার করা হয়েছে। দস্যুদের অবস্থান শনাক্তের চেষ্টা করছি আমরা। দস্যু দমনে সম্মিলিত অভিযান পরিচালনার বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ চলছে।'
বিশেষজ্ঞের মত
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবশে বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর আব্দুল্লাহ হারুন চৌধুরী ডেইলি অবজারভারকে বলেন, 'দস্যুদের পুনরায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে হলে দুটি বিষয় জরুরি, প্রথমত তাদের টেকসই কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা এবং দ্বিতীয়ত তাদের সামাজিক মর্যাদা প্রদান করা। অন্যথায় পূর্বের মতো আবারও বন ও জলদস্যুদের রাজত্বে পরিণত হবে সুন্দরবন।'
এমএ