ENGLISH EPAPER 📍 ঢাকা 📅 বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ তথ্য অধিদফতর নিবন্ধন নম্বর ০৬
শিরোনাম
Advertisement
শ্রমিকের ন্যায্য দাবিকে সহিংসতায় ঠেলছে কারা?
✎ নিজস্ব প্রতিবেদক
⏲ প্রকাশিত: বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬, ৬:০৫ পিএম আপডেট: ০৪.১১.২০২৬ ৬:১৪ পিএম
সংগৃহীত ছবি
X

সংগৃহীত ছবি

উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে বর্তমান মজুরিতে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন তৈরি পোশাকশ্রমিকরা। এ অবস্থায় মজুরি বৃদ্ধির দাবি জানিয়ে আন্দোলনে নেমেছেন তারা। শ্রমিকদের দাবির প্রতি সহমত জানিয়ে সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করলেও আন্দোলন অব্যাহত রয়েছে। তবে শ্রমিকদের এই ন্যায্য আন্দোলনে রাজনৈতিক ইন্ধন ও তৃতীয় পক্ষের অনুপ্রবেশের অভিযোগ উঠেছে।

সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী-এমপি এবং দলটির সমর্থক কয়েকজন ব্যবসায়ীর সংশ্লিষ্টতার তথ্য উঠে এসেছে বলে জানা গেছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের আন্দোলনে নামানো এবং পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চলছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠনের সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি কিছু শিল্প মালিকও শ্রমিক আন্দোলনে ইন্ধন দিচ্ছেন বলে সরকারের কাছে তথ্য-প্রমাণ রয়েছে। গতকাল সোমবার সচিবালয়ে পোশাকশিল্প মালিকদের সঙ্গে বৈঠক শেষে তিনি বলেন, অস্থিরতা সৃষ্টিতে জড়িত শিল্প মালিক, শ্রমিক সংগঠন ও নেতাদের চিহ্নিত করা হয়েছে। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কারখানা বন্ধ রাখা মালিকদের তালিকাও চাওয়া হয়েছে।

গোয়েন্দা তালিকায় যেসব প্রতিষ্ঠান ও মালিকের নাম

সরকারের একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানের বেক্সিমকো গ্রুপ, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশির সেপাল গ্রুপ, সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুস সালাম মুর্শেদীর এনভয় গ্রুপ, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের রেনেসাঁ গ্রুপ (ইন্টারস্টফ অ্যাপারেল), সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর হামিদ গ্রুপ (হামিদ সোয়েটার্স লিমিটেড) এবং সাবেক স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলামের ফেবিয়ান গ্রুপের (ফেবিয়ান গার্মেন্টস লিমিটেড) নাম এসেছে বলে জানা গেছে।

এ ছাড়া আওয়ামী লীগপন্থি ব্যবসায়ীদের মধ্যে তুসুকা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়জুর রহমান বাদল, ওয়েল গ্রুপের আব্দুস সালাম, নিপা গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. খসরু চৌধুরী, অ্যাক্সিস নিটওয়্যার্স লিমিটেডের মালিক ও সাবেক এমপি জাহিদ আহমেদ টুলু এবং স্মার্ট গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমানের প্রতিষ্ঠানের নাম রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলকের নির্দেশনায় আইসিটি ইন্ডাস্ট্রিজে অর্থ সহায়তার মাধ্যমে কয়েকজন আওয়ামী লীগপন্থির আন্দোলনে সম্পৃক্ততার অভিযোগও পাওয়া গেছে।

গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, তালিকাভুক্ত কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের মালিক পলাতক অবস্থায় ফোনে নির্দেশনা দিচ্ছেন, আবার কারও কারও প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা শ্রমিকদের উসকানি দিচ্ছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আন্দোলনে রাজনৈতিক নেতাকর্মীর উপস্থিতির অভিযোগ

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি ও ভিডিওতে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের আন্দোলনে অংশ নেওয়ার দৃশ্য দেখা গেছে বলে দাবি করেছে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সাজিবুল ইসলাম নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে শ্রমিক আন্দোলনের বিভিন্ন ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করেছেন। এসব পোস্টে ৩০ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরির দাবিতে আন্দোলনের পাশাপাশি বিভিন্ন কর্মসূচির দৃশ্য তুলে ধরা হয়। এ ঘটনায় কয়েকজন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীকে আটকের খবরও পাওয়া গেছে।

শ্রমিক নেতা ও বিজিএমইএ নেতাদের দাবি, শুরুতে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে আন্দোলন হলেও পরে এতে তৃতীয় পক্ষ ঢুকে পড়েছে। কোথাও কোথাও শ্রমিকদের জোর করে রাস্তায় নামানো হচ্ছে। শ্রমিক নেতা ও বাংলাদেশ গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য পরিষদের চেয়ারম্যান মো. তৌহিদুর রহমান বলেন, শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলন একটি পক্ষ ছিনতাই করেছে। প্রকৃত শ্রমিকরা সহিংসতার সঙ্গে জড়িত নন। শ্রমিকদের উসকানিতে পা না দিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে কাজে ফেরার আহ্বান জানান তিনি।
বিজিএমইএর পরিচালক ও নতুন মজুরি বোর্ডের মালিকপক্ষের প্রতিনিধি এবিএম সামছুদ্দিন বলেন, কোনো গার্মেন্টস মালিকের আন্দোলনে ইন্ধন দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কারখানাকে বিজিএমইএর সব ধরনের সেবা দেওয়া বন্ধ করা হবে। হাইকোর্ট থেকে বোর্ডের চেয়ারম্যানের নাম চূড়ান্ত হওয়ার পর দ্রুত বৈঠক শুরু করে নভেম্বরের মধ্যেই মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত করার আশা প্রকাশ করেন তিনি।

তবে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেন, গোয়েন্দা প্রতিবেদনে কয়েকজন মালিকের নাম আসার কথা সরকার বললেও সংগঠনটি এখনো কোনো তালিকা পায়নি। শিল্প-কারখানায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়ে তিনি বলেন, সহিংসতার কারণে সোমবার ৬৭৯টি কারখানা বন্ধ রাখতে হয়েছে।

দ্রুত মজুরি কাঠামো চূড়ান্তের আশ্বাস

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সরকার কোনো শিল্প-কারখানা বন্ধ হোক বা উৎপাদন ব্যাহত হোক তা চায় না। শ্রমিকদের ন্যায্য স্বার্থ রক্ষা এবং শিল্পের স্বাভাবিক উৎপাদন বজায় রাখা জরুরি। সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রধানমন্ত্রীর শ্রম ও কর্মসংস্থানবিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেছেন, শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিল্পের উৎপাদন ব্যয়, সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক বাজারের প্রতিযোগিতাও বিবেচনায় নিতে হবে। শ্রমিক আন্দোলনকে পুঁজি করে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের অস্থিতিশীলতা তৈরির পরিকল্পনা সফল হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

অন্যদিকে মজুরি বোর্ডের শ্রমিক প্রতিনিধি বাবুল আখতার জানিয়েছেন, আগামী জানুয়ারি থেকে শ্রমিকরা যাতে বাড়তি মজুরি পান, সেভাবেই বোর্ডে কাজ করা হবে। একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণে আটক শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের মুক্তি এবং হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানান তিনি।

বন্ধ ৬৭৯ পোশাক কারখানা

বিজিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, সোমবার দেশের পাঁচটি শিল্পাঞ্চলের ২ হাজার ১৩৪টি পোশাক কারখানার মধ্যে ৬৭৯টি বন্ধ ছিল। এতে কাজ না করেই বাড়ি ফিরতে বাধ্য হন ১৬ লাখ ৮০ হাজার ৫৭২ জন শ্রমিক।

এর মধ্যে গাজীপুর ও ময়মনসিংহের ৮৩৬টি কারখানার মধ্যে ৩৮২টি এবং সাভার-আশুলিয়া ও জিরানীর ৪৪১টির মধ্যে ২২৩টি কারখানায় উৎপাদন বন্ধ ছিল। রাজধানীর মিরপুরে ৩২০টি কারখানার মধ্যে বন্ধ ছিল ৬৫টি। তবে নারায়ণগঞ্জের ১৯৭টি এবং চট্টগ্রামের ৩১৪টি পোশাক কারখানায় শ্রমিক অসন্তোষের প্রভাব পড়েনি।

সব মিলিয়ে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি বৃদ্ধির দাবি, রাজনৈতিক ইন্ধনের অভিযোগ এবং সহিংসতায় দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই শিল্প খাতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। দ্রুত মজুরি কাঠামো চূড়ান্ত করার পাশাপাশি শ্রমিকদের স্বার্থ ও শিল্পের স্বাভাবিক উৎপাদন নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

এসএস 

Advertisement
Loading...
Loading...
আরো দেখুন
সম্পাদক: ইকবাল সোবহান চৌধুরী
অবজারভার লিমিটেডের পক্ষে সম্পাদক কর্তৃক গ্লোব প্রিন্টার্স, ২৪/এ, নিউ ইস্কাটন রোড, রমনা, ঢাকা থেকে প্রকাশিত।
সম্পাদকীয়, বার্তা ও বাণিজ্যিক কার্যালয়:আজিজ ভবন (৩য় তলা), ৯৩, মতিঝিল বাণিজ্যিক এলাকা (সি/এ), ঢাকা-১০০০।

ফোন: পিএবিএক্স- ৪১০৫৩০০১-০৬; বিজ্ঞাপন: ৪১০৫৩০১২; ০১৭৯৩৩১৭৮২৯, ০১৫৫০৭০৭২৯১
E-mail: [email protected], [email protected]. [email protected], [email protected], [email protected], ‍[email protected], Online-email: [email protected]

🔝