১৯৯৭ সালে তৈরি পোশাকশিল্পে উদ্যোক্তা হিসেবে আমার পথচলা শুরু। গত ২৯ বছরে এই শিল্পের উত্থান, সাফল্য, সংকট ও পরিবর্তিত বাস্তবতা কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। দেখেছি কীভাবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান, নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং শিল্পায়নে এই খাতের অবদান অনস্বীকার্য। কিন্তু আজ প্রশ্ন উঠছে—যে শিল্প আমাদের অর্থনীতিকে এতদূর এগিয়ে নিয়েছে, আমরা কি তার ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় যথেষ্ট প্রস্তুত?
একসময় বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের প্রধান প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা ছিল তুলনামূলক কম মজুরি, সহজ উৎপাদনব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্কসুবিধা। কিন্তু বিশ্ববাজারের বাস্তবতা দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এখন প্রতিযোগিতা শুধু কম দামে পোশাক সরবরাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; প্রযুক্তি, উৎপাদনশীলতা, গুণগত মান, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, শ্রমিকের অধিকার এবং দ্রুত সরবরাহের সক্ষমতা ক্রমেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
অথচ আমাদের অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান এখনো প্রচলিত উৎপাদনব্যবস্থা ও কম মূল্যের পণ্যের ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে গ্যাস-বিদ্যুতের অনিশ্চয়তা, ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের মূল্য কমানোর চাপ এবং প্রশাসনিক জটিলতা শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে দুর্বল করছে।
আজ অনেক কারখানায় অর্ডার আছে, উৎপাদন চলছে, রপ্তানিও হচ্ছে; কিন্তু সব ব্যয় পরিশোধের পর প্রত্যাশিত মুনাফা থাকছে না। ফলে উদ্যোক্তাদের একটি অংশ ব্যবসা সম্প্রসারণ তো দূরের কথা, বিদ্যমান প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতেই হিমশিম খাচ্ছেন।
এখানেই আমাদের উপলব্ধি করা প্রয়োজন—রপ্তানি বাড়লেই শিল্পের প্রকৃত উন্নতি হয় না; সেই রপ্তানি কতটা লাভজনক, কর্মসংস্থান কতটা নিরাপদ এবং বিনিয়োগ কতটা টেকসই, সেটিই মূল বিবেচ্য।
তবে বর্তমান সংকটের জন্য শুধু সরকার, ব্যাংক কিংবা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের দায়ী করলে চলবে না। আমাদের উদ্যোক্তাদেরও আত্মসমালোচনা করা জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে যথাযথ বাজার বিশ্লেষণ ছাড়া অতিরিক্ত বিনিয়োগ, ব্যাংকঋণের ওপর অতিনির্ভরতা, অর্ডার পাওয়ার প্রতিযোগিতায় অযৌক্তিকভাবে কম মূল্য গ্রহণ এবং দুর্বল আর্থিক ব্যবস্থাপনা শিল্পকে ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
দীর্ঘদিন আমরা উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে যতটা মনোযোগ দিয়েছি, নিজস্ব ডিজাইন, গবেষণা, প্রযুক্তি, দক্ষ মানবসম্পদ এবং উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদনে ততটা গুরুত্ব দিতে পারিনি। অথচ শুধু কারখানার সংখ্যা বৃদ্ধি শিল্পায়নের সাফল্য নয়; লাভজনক, দক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাই প্রকৃত শিল্পায়ন।
অন্যদিকে সরকারের নীতিগত ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি পোশাক কারখানা প্রতিষ্ঠা, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা অর্জন এবং দক্ষ শ্রমিক গড়ে তুলতে দীর্ঘ সময় ও বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন। অথচ ঘন ঘন নীতিমালা পরিবর্তন, কর ও শুল্কসংক্রান্ত জটিলতা, জ্বালানির অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা সেই বিনিয়োগকে ঝুঁকির মুখে ফেলে।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে শুধু রাজস্ব আদায়ের উৎস হিসেবে দেখলে চলবে না। একটি কারখানার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে অসংখ্য শ্রমিকের জীবিকা, তাঁদের পরিবারের ভবিষ্যৎ, ব্যাংকের বিনিয়োগ এবং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা।
তাই পোশাকশিল্পের জন্য অন্তত দশ বছরের একটি স্থিতিশীল, বাস্তবসম্মত ও বিনিয়োগবান্ধব নীতিকাঠামো প্রয়োজন। বিশেষ করে সাময়িক আর্থিক সংকটে থাকা কিন্তু পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থায় ঋণ পুনর্গঠন এবং কার্যকরী মূলধনের সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি।
পোশাকশিল্পের সাফল্যের পেছনে শ্রমিকদের অবদানও অনস্বীকার্য। তাঁদের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক নিরাপত্তা ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করা আমাদের নৈতিক ও অর্থনৈতিক দায়িত্ব। একই সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার বাস্তবতাও বিবেচনায় রাখতে হবে।
শ্রমিক ও মালিককে পরস্পরের প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখার পরিবর্তে সহযোগী হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কারণ শ্রমিকের অধিকার উপেক্ষা করে যেমন টেকসই শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব নয়, তেমনি শিল্পের আর্থিক সক্ষমতা ধ্বংস করে দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান রক্ষা করাও সম্ভব নয়।
বিশ্ববাজারের পরিবর্তিত পরিস্থিতিও আমাদের জন্য বড় সতর্কবার্তা। ভিয়েতনাম, ভারত, চীনসহ বিভিন্ন প্রতিযোগী দেশ প্রযুক্তি, দক্ষতা, উৎপাদনশীলতা ও পণ্যের বৈচিত্র্যে বিনিয়োগ করছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারাও এখন শুধু কম দাম নয়; পরিবেশগত মান, শ্রমিকের অধিকার, সরবরাহব্যবস্থার স্বচ্ছতা এবং সময়মতো পণ্য সরবরাহের সক্ষমতাকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ-পরবর্তী বাণিজ্যসুবিধা নিয়ে অনিশ্চয়তা। ফলে প্রচলিত শুল্কসুবিধা ও তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয়ের ওপর নির্ভর করে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করা যথেষ্ট নয়।
আমাদের উচ্চমূল্যের পোশাক, ম্যান-মেড ফাইবার, টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, নিজস্ব ডিজাইন, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন এবং বাংলাদেশি ব্র্যান্ড গড়ে তোলার দিকে এগোতে হবে। পাশাপাশি প্রযুক্তি ও অটোমেশনের প্রসারে শ্রমিকদের পুনঃপ্রশিক্ষণ এবং নতুন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
আমার বিবেচনায়, বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে সরকার, উদ্যোক্তা, শ্রমিক প্রতিনিধি, ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি। সেখানে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, প্রতিযোগিতামূলক অর্থায়ন, দক্ষ বন্দর ও কাস্টমস ব্যবস্থাপনা, নতুন রপ্তানিবাজার সৃষ্টি, প্রযুক্তিগত আধুনিকায়ন এবং শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্রেতাদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। উৎপাদন ব্যয় ও শ্রমিক কল্যাণের মানদণ্ড বাড়ানোর দাবি জানিয়ে পণ্যের ন্যায্য মূল্য দিতে অনীহা প্রকাশ করা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই ব্যবসায়িক সম্পর্কের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ক্রেতা ও উৎপাদক উভয়ের স্বার্থেই ন্যায্য মূল্য, বাস্তবসম্মত সরবরাহ সময় এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক সম্পর্ক নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এখানে আরও একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের পোশাকশিল্পকে শুধু রপ্তানিনির্ভর একটি ব্যবসায়িক খাত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। এটি দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। একটি কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে শুধু একজন উদ্যোক্তার বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া নয়; এর সঙ্গে অসংখ্য শ্রমিকের জীবিকা, তাঁদের পরিবারের ভবিষ্যৎ, ব্যাংকের ঋণ এবং স্থানীয় অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তাই শিল্পের সংকট মোকাবিলাকে কোনো বিশেষ ব্যবসায়ীগোষ্ঠীর দাবি হিসেবে নয়, বরং জাতীয় অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। তবে শিল্প রক্ষার নামে অনিয়ম, অদক্ষতা কিংবা ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিকে প্রশ্রয় দেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়। প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, সুশাসন এবং প্রকৃত সমস্যাগ্রস্ত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য কার্যকর সহায়তা।
১৯৯৭ সাল থেকে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিজ্ঞতায় আমার উপলব্ধি—বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু তুলনামূলক কম উৎপাদন ব্যয় নয়; বরং আমাদের উদ্যোক্তাদের সাহস, শ্রমিকদের পরিশ্রম এবং প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা।
এই শক্তিকে সঠিক নীতি, আধুনিক প্রযুক্তি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও আন্তর্জাতিক বাজারের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে সমন্বয় করতে পারলে ভবিষ্যতেও বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হবে।
কিন্তু অতীতের সাফল্য নিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভোগার সুযোগ নেই। সময় এসেছে অর্জনের পাশাপাশি নিজেদের ভুলগুলো স্বীকার করার, পুরোনো ব্যবসায়িক ধারণা পরিবর্তন করার এবং সরকার, উদ্যোক্তা ও শ্রমিকদের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে নতুন পথচলা শুরু করার।
আমরা শুধু রপ্তানির পরিমাণ বাড়াতে চাই না; চাই এমন একটি শক্তিশালী ও টেকসই পোশাকশিল্প, যেখানে উদ্যোক্তার বিনিয়োগ নিরাপদ থাকবে, শ্রমিক মর্যাদার সঙ্গে বাঁচবেন এবং দেশের অর্থনীতি আরও সমৃদ্ধ হবে।
কারণ একটি শিল্পের প্রকৃত সাফল্য শুধু কত বিলিয়ন ডলার রপ্তানি হলো, তা দিয়ে বিচার করা যায় না; সেই শিল্প কত মানুষের জীবন বদলাতে পেরেছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কতটা স্থায়ী অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করেছে, সেটিই সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি।
লেখক: এম. জি. আর. নাসির মজুমদার, সিআইপি
উদ্যোক্তা, সমাজকর্মী ও নীতি বিশ্লেষক।
১৯৯৭ সাল থেকে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তা।